Shahnawaz Ali Raihan
Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Shahnawaz Ali Raihan, Politician, Kaliachak, Malda.
একটি মূক-বধির জাতি ও তার অগুনতি ডিজিটাল নেতারা
এবার আর পাড়ার ভিডিও বা ছায়াবানী, বিচিত্রা কোনও সিনেমা হলে না। বিছানায় শুয়ে বা বালিশে হেলান দিয়েই মনে হচ্ছে হরিশচন্দ্রপুরের রাস্তাঘাট,অলিগলি ধরে আমরা সবাই ফিরে গেছি নব্বইয়ের দশকে! কখনও দেখছি হাতিমতাই সিনেমার জিতেন্দ্রকে, কখনও ফুল আউর কাঁটের দুই বাইকে পা রাখা অজয় দেবগন বা কখনও একদম সত্তরের দশকের শোলের ঠাকুর - গব্বর- জয় - ভীরু সবাইকে! শুনছি জোহরান থেকে ইকরা -- এমনকি মোদীও, তাঁদের পরবর্তী নির্বাচনের প্রচার পদ্ধতি শিখতে হরিশচন্দ্রপুরের দিকে নজর রেখেছেন (অথচ ভোট এখানে এখনো কম করে চার মাস দেরি!)। এমন চলতে থাকলে ভাবুন একবার, পাঁচ বছর পরের চিত্রটা! কোথাও ক্যামেরার সামনে টাকা গোণা, কোথাও বডিগার্ডদের নিয়ে হাঁটা, কোথাও গাড়ির হুডে বসে চুল উড়ানো, কোথাও স্বল্পমূল্যে গান লেখা হয় সাইনবোর্ড, কোথাও ক্যামেরার কাজ -- কুশিদা, সোনাকুল, তুলশিহাটা, ভিঙ্গল জুড়ে একে একে রিল তৈরির বিশেষ বিশেষ দিক নিয়ে তৈরি হচ্ছে রিল হাব। হরিশচন্দ্রপুর রিল ইন্ডাস্ট্রিতে রিলায়েন্সও লগ্নি করতে আগ্রহী। দেশ-বিদেশের নানা নির্বাচনের পূর্বে টিকিট প্রত্যাশীরা আসছে লাইন দিয়ে। হরিশচন্দ্রপুর থেকে চাঁচল জুড়ে রাস্তার ধারে সারি সারি হোটেল, লাইট - ক্যামেরার দোকান, সারি সারি সাইনবোর্ড ' এক ঘন্টার শুটিংয়ের জন্য পান সুলভে ফটোজেনিক বডিগার্ড', জিপ - বাইক ভাড়ার দোকান!
একদিকে আমেরিকা থেকে এসে কেউ গাইছে 'জোহরান মামদানি বলছি আমি, কথা দিয়ে ...', সেই খবর পেয়েই পরদিন এই বুড়ো বয়সে জিপের ছাতে উঠে খুব সাবধানে হয়তো পোজ দিচ্ছে ট্রাম্প, ব্যাকগ্রাউন্ডে গান 'য়ে যুবা নেতা হ্যায়..'! শুটিংয়ের সেটও ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে, একটু ডিজাইন এদিক সেদিক করেই একই শোলার টুকরো দিয়ে কখনো মন্দির - কখনো মসজিদ। বাড়ির বউ থেকে ছোটবাচ্চা, দাদা - দাদি, কাজের লোক, দোকানদার, মাস্টার (স্কুলের হেড-মাস্টারদের রিল বানানোতে আমাদের এলাকা রাজ্যে শীর্ষে) , পুলিশ, বখাটে যুবক, সমাজ সচেতন চায়ের দোকানের নিয়মিত আলোচক -- সবাই মজে রিলে। স্কুলের বাচ্চারাও রিলের রাজনীতিবিদ সাজছে! কোথাও কোনো আলোচনা, পড়াশুনা কিছুই নেই। রিল থেকেই বেরোচ্ছে আগামীর নেতা! রিলেই ফিতে কাটা, রিলেই জলসাতে যাওয়া, রিলেই নামাজ - রোজা, মরা বাড়িতেও রিল বানাতে সোস্যাল মিডিয়া সেক্রেটারিকে নিয়ে যাওয়া, এমনকি 'এক হাতে দান করলে অন্য হাত তা জানবে না' বলা কর্তব্য ছিল যে মাওলানাটার, সে বেচারাও দুনিয়াতে কিছু পাওয়ার আশায় রিলের পার্শ্বচরিত্রে!
এরাই কেউ কেউ সব রিল দেখার শেষের দিকে দুটো ওয়াকফের, একটা গঙ্গা ভাঙনের বা ওবিসির খবরের রিল দেখে কেউ কেউ হতাশ হয়ে ফেসবুকে বিপ্লবী পোস্ট দিল-- 'এই জাতির কিছু হবেনা, ওয়াকফ নিয়ে বলার মত একটা নেতাও সংসদে পাঠাতে পারেনা!' ওদিকে আবার হয়তো পাশের জেলায় কোনো কোটিপতি সাংসদ নিজেই রিল বানানো ভাতিজার সঙ্গে কাজিয়াতে জড়িয়ে -- রিল বানাতে পিছিয়ে পড়া নিজের ছেলেকে বিধানসভার টিকিটের দৌড়ে এগিয়ে দেবে না রিলে আকাশ বাতাস ছেয়ে দেয়া ভাতিজাকেই দেবে, এই নিয়ে সে গৃহযুদ্ধে জেরবার! বেচারা কীভাবে ওয়াকফ নিয়ে পড়াশুনা করবে, গঙ্গাভাঙ্গন নিয়ে সংসদে বলবে? আর্টিকেল ৩০- এর নামই সে কোনদিন শুনেনি, হায়াৎ থাকতে শুনবেও না পণ করে আছে! 'কলকাতার নেতারা পার্লামেন্টে আমাদের নিয়ে কিছু একটা বললেই হল' - এই ভেবে ভাতিজার গাড়ি থেকে নামার ( দরজা খুলার আলাদা লোক) রিল দেখতে দেখতে সেও ঘুমিয়ে পড়েছে। তার সাথে জেলার পুরো কওম ঘুমিয়ে। তাঁদের তকদির ঘুমিয়ে, তাঁদের ইজ্জত ঘুমিয়ে। জেগে শুধু ফেসবুকের গরীবের বন্ধু নেতারা ! জেগে পাঁচ বছরে কোটিপতি হয়ে কিছু টাকা ক্যামেরার সামনে দান করা নানা দলের নেতারা! জেগে কোনো কোনো নেতা - মন্ত্রী - সাংসদের 'আমিও চেষ্টা করছি' মার্কা ফেসবুকে পোস্ট করা দিস্তার পর দিস্তা চিঠিগুলো! জেগে সেগুলোতে ছেলে ভুলানো ঘুম পাওয়া তাঁদের অন্ধ অনুসারীরা!
এই গল্পের পটভূমি কি শুধুই হরিশচন্দ্রপুর না সারা বাংলা? সাচারের এত বছর পরও যে যে গ্রামগুলো, জেলাগুলোতে গোলামী থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষিত, সৎ কোনো নেতৃত্ব জন্ম নেয়নি সে সকল গ্রাম, জেলা নাকি শুধুই হরিশচন্দ্রপুর? আমার এলগরিদমে হয়তো শুধু মালদা - মুর্শিদাবাদ আসছে। কিন্তু আমাদের নিয়তির এলগরিদম বলে বাংলার মুসলিম সমাজের অধিকাংশ জায়গার চিত্র এটা, দলমত নির্বিশেষে। যাঁরা আমাদের নিয়ে ফুটবল খেলে তাঁদের চর্চা তো অনেক হল, আমিও চাই সে চর্চা জারি থাক। কিন্ত সেই দলগুলোর হাতে আমারা-ই নিজেদের সমাজ থেকে কেমন নেতৃত্ব জিতিয়ে পাঠাচ্ছি, নিজেরা তাদের হাতের পুতুল হয়ে থাকছি , কিছু একটা পেলে অল্পতেই গলে যাচ্ছি -- সেই ইহতেসাব কবে হবে? এতটাই দুর্বল, অসহায যে নিজেদের এলাকা থেকেই কেমন নেতা চাই সেটাও বলার জায়গাতেও নেই আমরা? কোনো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ নেই যাদের কথা বাংলার মূলস্রোতের দর্শকরা শুনবে? আজকে হুমায়ূন কবীর, কালকে মোদীর হাত থেকে পুরস্কার নেয়া শিক্ষক আর সারা বছর একগুচ্ছ বিজেপির সুরে কথা বলা কিছু মুসলিম নামের সাংবাদিক -- কিছু গলার রগ বের করে ক্যামেরার সামনে মেকি রাগের উকিল, কিছু ডান, কিছু বাম --- এরাই আমদের প্রতিনিধি বাংলার মূলস্রোতে ? আমাদের আওয়াজ ? আমাদের জনপ্রতিনিধি ? আর কতদিন ?
সাজিয়ে মিথ্যাটাও ভাল করে বলতে পারেনা! অনেকদিন দিল্লিতে থাকার ফলে ইংরেজবাজারের বিজেপি বিধায়িকা বোধহয় ভুলেই গেছেন, কালিয়াচকের লোকজন আসলে কোন ভাষায় কথা বলে! খোট্টা, বাদিয়া, পেঁচি, পলুপুষা বাঙালি যত যা উপভাষার মানুষ আছে-- কারা 'কাইট্টা ফ্যালামু' কথাটা তাঁদের দৈনন্দিন কথপোকথনে ব্যবহার করে? শুধু কালিয়াচক বাদ দিলাম, সুজাপুর - মোথাবাড়ি-বৈষ্ণবনগর, কোথাও কি কাওকে এই ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন?
03/11/2025
যে মহিলারা এই প্রতিবাদটা দেখিয়েছেন, আমি তাঁদের কুর্নিশ জানাই। একটা ভরা লোকালয়ের মাঝে মদের দোকান! পাশেই প্রাইমারি, আপার প্রাইমারি স্কুল। ছোট ছোট বাচ্চারা মদ - ভাট্টির সামনে মাতালদের মাতলামো দেখতে দেখতে স্কুলে যাবে, এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কিছু হতে পারেনা। কালিয়াচক গার্লস স্কুলের অনেক ছাত্রী এই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায়। পাড়ার মহিলাদের সম্ভ্রমও সুরক্ষিত নয়। আমি whatsapp মারফৎ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নিচের রিপোর্টটি সেন্ড করে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেছি। অবিলম্বে বাবুরহাটের মত ব্যস্ত তথা বাচ্চাদের একাধিক স্কুল থাকা লোকালয় থেকে এই মদের দোকান সরাতে হবে। নইলে আগামী দিনে উক্ত এলাকার মা - বোনেরা যদি বৃহত্তর আন্দোলন করে, আমি আমার সাধ্যমত পাশে থাকব ইনশাল্লাহ।
সন্দিগ্ধ সবাই, কিন্তু চিরন্তন সন্দেহের তালিকায় একটাই গোষ্ঠী
আপনি ছোটবেলায় কোন প্রাইমারি স্কুলে চটের বস্তা হাতে নিয়ে ক্লাস করতে গেছিলেন বর্ষায় এক কোমর পানি ভেঙে, গ্রীষ্মে কোন আমবাগানে চুরি করে আম পেড়ে নুনমরিচ মাখিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেয়েছিলেন, শারজায় শেন ওয়ার্নকে সচিনের বেদম প্রহারের রাতে কতটা মজা নিয়ে ক্রিকেট দেখেছিলেন, মন খারাপের দুপুরে সবকিছু থেকে অনেক দূরে দাদা - নানীর কবরের পাশে বসে কত মূহুর্ত একাকী পার করেছেন -- সবকিছুই এই দেশে, এই মাটিতেই, এই গ্রামেই -- এখন আর এসব কোনো গুরুত্ব বহন করেনা। করে শুধু দু'দশক আগের একটা ভোটার লিস্ট আর নির্বাচন কমিশনের তালিকায় স্থান পাওয়া কিছু পরিচয়পত্র! রাষ্ট্রের চোখে সবাই এখন সন্দিগ্ধ, সবাইকে প্রমাণ করতে হবে তাঁর বৈধ হওয়ার। সত্যিই কি সবাই সন্দিগ্ধ ?
কোনও গণতন্ত্রে সংখ্যাগুরুর ধর্ম বা সংস্কৃতি যখন রাষ্ট্রের নৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তখন প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলিও সেই ধর্মগত বা জাতিগত রীতিনীতিতে পরিচালিত হয়। Ethnic Democracy এভাবেই শুরু হয়। বিজেপি আসার আগেও আমাদের নানা সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠান থেকে অফিস আদালতের রীতিনীতিতে সংখ্যাগুরুর সংস্কৃতি প্রভাবশালী। ধরুন, আপনি বললেন প্রদীপ প্রজ্বলন বা নারিকেল ফাটানো তো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর রীতি, চলুন আমরা একটা গাছের চারা লাগিয়ে আজকের উদ্বোধন পালন করি। লোকজন রে রে করে উঠবে। প্রশ্ন করবে, প্রদীপ জ্বালানো তো ভারতীয় সংস্কৃতি, এটাকে ধর্মীয় ভাবছেন কেন? এভাবেই আধিপত্য নির্মাণ হয়, তেলাওয়াত ধর্মীয়ই থেকে যায়, কিন্তু প্রদীপ জ্বালানো সর্বজনীন হয়ে উঠে। অনেকটা ঈদ আর দুর্গাপূজার মত। এভাবেই গণতন্ত্রের পরিসরে এথনো-লিগ্যাল ফিল্টারিং শুরু হয়—যা দেখলে প্রশাসনিক মনে হয়, কিন্তু মূলত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল। এভাবেই 'othering' বা অপরায়ন শুরু হয়। মূলস্রোত আর প্রান্তিকের নির্মাণ হয়। তিনশো কিলোমিটার দূরের এক সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মূর্তি ফোয়ারা মোড়ে শোভা পায়, তাঁকে আপন মনে হয়। কিন্তু নানা জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে সমন্বয়কামী শাসন উপহার দেয়া, নিজদের দেশ ছেড়ে এই দেশকে আপন করে নেয়া, এখানেই কবরে শুয়ে থাকা গৌড় সুলতানদের ' বহিরাগত ' মনে হয়! তাঁদের নামে জেলায় একটা প্রেক্ষাগৃহ, সভাকক্ষও করা যায়না। সিরাজের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ যাতে কারো কল্পনাতেও না আসে, তাই আগেভাগেই ভাসিয়ে দেয়া হয় বিকল্প নামের তত্ত্ব! চব্বিশ পরগনার তিতুমীরের নামে বাংলাদেশে ট্রেন চলতে পারে, কিন্তু এপারে কিছুই হবেনা, ক্লাস থ্রিতে 'বাঁশেরকেল্লা' পড়েছ (নাকি ফোরে?) এটাই ভেবেই কৃতজ্ঞ থাক -- এগুলো NRC মানসিকতা না ? টোকেন হিসেবে ওই একটা নজরুল বাদে গৌড় সুলতান, মুর্শিদাবাদ নবাব, তিতুমীর প্রায় সবাই NRC হয়ে গিয়ে সেই কবে থেকেই ইতিহাসের ডিটেনশন ক্যাম্পে! পশ্চিমে বর্ণবাদ যেমন গড়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিকতা ও দাসপ্রথার মাধ্যমে—যেখানে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বকে সভ্যতার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ভারতেও তেমনি মুসলিমদের “বিদেশি”, “আক্রমণকারী” বা “অন্য সংস্কৃতি” হিসেবে দেখানোর এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে। দু’ক্ষেত্রেই সমাজ এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, এক সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব বা দেশপ্রেম “স্বাভাবিক”, আর অন্য সম্প্রদায়েরটা “সন্দেহের” বলে গণ্য হয়।
তাই SIR, NRC, CAA এই পরিভাষাগুলো শুনতে নতুন মনে হলেও এগুলোকে সম্ভাব্য করে তুলেছে যেসব মানসিকতা, সেগুলোর কোনকিছুই নতুন না। এসবের শিকড় অনেক পুরানো। জড় খুঁজতে হবে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করা রাজনৈতিক দলগুলি থেকে সুশীল সমাজ -- সবাই কীভাবে স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৪ অবধি সংখ্যাগুরুর ধর্ম বা সংস্কৃতিকে 'মূলস্রোত'- এর সংস্কৃতি বানাতে তৎপর থেকেছে আর মুসলিমদের ' অপর' করে গিয়েছে-- কালের সেই গতিধারার মধ্যে। বিজেপির কাজ এখানেই সহজ হয়ে গিয়েছে। তাই আজকের সময়ে এসে বিজেপি সরকারি মেশিনারিগুলোকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই নাগরিকত্বের ধারনাকে ক্রমশ ‘to belong’ থেকে সরিয়ে ‘to prove’ -এর দিকে যাচ্ছে। নাগরিকত্ব যেন এক অবিরাম প্রমাণের প্রক্রিয়া, এবং মুসলমান নাগরিক সেই প্রমাণের চিরস্থায়ী অভিযুক্ত। কোল্যাটারাল ড্যামেজ হিসেবে, ভোটে আসন বাড়ানোর প্রতিযোগিতা হিসেবে এখানে দলিত, মতুয়া, নমঃশূদ্র অনেকেই টার্গেট হয় ঠিকই, কিন্তু যুগপৎ তাঁদের পরিত্রাণের পথ বাতলে তাঁদেরই ভোট বিজেপির ঝুলিতে আনার রাস্তাও খোলা থাকে। বিজেপি দলিতদের কোনোদিন নিজের ভাববে না, একটা টাকাও তাঁদের জন্য খরচ করবে না, ভাঙনে তাঁদের গ্রামকে গ্রাম উজাড় হলেও বন্যাকে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করবে না, ড্রেজিং করবে না, দিল্লির বিজেপি নেতারা তাঁদের বাড়ি গিয়ে কিনে আনা প্লেটে ভাত খাবার নাটক করবে শুধু। কিন্তু তারপরও দেশে মুসলিম-বিদ্বেষের এমন আবহ টিভি, টকশো, বিতর্ক, সিনেমা, সিলেবাস সবকিছু দিয়ে তৈরি হবে যে, এই নিম্নবর্ণের অনেক হিন্দুরাই দিনের শেষে 'মোদিই পারে মুসলিমদের টাইট দিতে' দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে বিজেপিকে ভোট দেবে! অথচ ভাঙন বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের সেই নিম্নবর্ণের হিন্দু আর মুসলিম উভয়ের শ্রেনী অবস্থান এক, উভয়েই প্রান্তিকতার চরম সীমায় দাঁড়িয়ে, উভয়েই ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা চরমভাবে ব্যবহৃত! চাইলেই এক অপরের হাত ধরে বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারত, সুবিচার চেয়ে এক হতে পারত।
মুসলমানরা এক দ্বৈত ফাঁদে পড়েছেন —ধর্মের কারণে বাদ পড়ার আশঙ্কা, আর দস্তাবেজের কারণে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার ভয়। এই দুই প্রক্রিয়া মিলে একটি “bureaucratised exclusion” তৈরি করেছে—যেখানে বৈষম্য নীতির নয়, প্রশাসনিক নিয়মের ভাষায় ঘটে।
“অযোগ্য ভোটার”, “সন্দেহভাজন নাগরিক” নির্ধারণে ধর্ম, ভাষা ও আঞ্চলিক পরিচয় নিঃশব্দ ভূমিকা রাখছে। এটা যে গভীর সাংস্কৃতিক বিভাজনের মানসিকতা থেকে উদ্ভূত, সেখানে "হাইফেনেটেড" নাগরিকদের অন্য সবার চেয়ে বেশি আনুগত্যর পরীক্ষা সর্বদা দিয়ে যেতে হয়। সে 'বাঙালি-মুসলিম' হোক বা 'মতুয়া-বাঙালি '। তারপরও সবার জন্য বরাদ্দকৃত বিভেদ সমান না। ধর্মের কারণে ওবিসি তালিকা থেকে বাদ পড়ার/ভিনরাজ্যে লিঞ্চ হওয়ায়/ বাংলাদেশি সন্দেহে পুশব্যাক হওয়ার চিরন্তন আশঙ্কা যতটা বাঙালি-মুসলিমদের জন্য প্রকট ও সম্ভাব্য, ততটা অন্যকোনো অমুসলিম প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য না। তাই যাঁরা SIR এর বিরোধিতা করেও এর আদিপাপটিকে ( অর্থাৎ মুসলিম-বিদ্বেষ) এড়িয়ে যাচ্ছেন, তারা বোধহয় সমস্যার গভীরে এখনো ঢুকতে পারেননি ( অথবা ঢুকতে চাননা)। অথচ সমস্যার জড়ে গিয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হলে সেটা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল বাঙালিকে গো-বলয়ের নোংরা রাজনৈতিক কৌশল মোকাবিলায় শক্তিশালী করত। বিজেপি বাংলাকে ঘৃণা করে, মাছ-মাংস খাওয়া বাঙালি হিন্দুকেও করে, মতুয়া থেকে নমশূদ্র সবাইকে ঘৃণা করে। এগুলো ঠিকই। কিন্তু বিজেপি তার অস্তিত্বই ধরে রেখেছে নিজেকে মুসলিমবিদ্বেষের একটা শক্তপোক্ত মঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে। সেটাকে প্রশ্ন না করে, সেটির ভিত আলগা না করে ফ্যাসীবাদকে পরাজিত করা যাবেনা। এই লড়াই শুধু ভোটে জেতার না, নিছক তালিকায় নাম তোলারও না। বরং বিভাজন ও স্বাধীনতার সংকট থেকে সতিসত্যি উত্তরণের লড়াই।
ভুতনির কান্না না শোনালে, কলকাতার হাসিও একদিন নিঃশব্দ হবে
"বাঙলার উপর কলকাতা শহর যেভাবে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব করে থাকে, ভারতের অন্য কোনও শহর তার নিজের অঞ্চলের উপর তেমনভাবে করে না" — প্রখ্যাত কেমব্রিজ ঐতিহাসিক জয়া চ্যাটার্জি তাঁর দেশভাগ নিয়ে সাড়া জাগানো বই Bengal Divided-এ এই অকাট্য সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। উত্তরপ্রদেশে শুধু লখনউ নয়, আছে কানপুর, বেনারস, এলাহাবাদ। কেরালায় রাজধানী ছাড়াও আছে কোচি, কালিকট। বিলেতে লন্ডনের পাশাপাশি ম্যানচেস্টার, বার্মিংহ্যামের মতো শহর আছে। বাংলাদেশেও আছে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কলকাতা যেন এক বিশাল হাঙর—অন্য কোনও শহরকে মাথা তুলতে দেয় না, সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই গিলে ফেলে, পাদপ্রদীপর সব আলো শুষে নেয়। উৎসব থেকে শোক, আনন্দ থেকে কষ্ট—সব অনুভূতিই যেন কেবল এই শহরকে ঘিরেই! আর বাকিরা যেন বানের জলে ভেসে যাওয়া মানুষ মাত্র। যাঁদের বাঁচানোর দায় থেকে সেই শহর, সেই রাজধানী মুক্ত!
এখন যেমন ভেসে যাচ্ছে ভুতনি আর পঞ্চনন্দপুর। হাজার হাজার মানুষ গঙ্গা-ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব, একাধিক শিশু সলিল সমাধি হয়েছে। নদীর ভয়াল গ্রাসে যে গ্রামটা বিলীন হতে বসেছে, মানুষজন নিজের হাতে গড়া ঘরবাড়ি নিজ হাতেই ভেঙে ইট বাঁচাচ্ছে—পরের ছাদের আশায়। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পানি-ভেঙে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে কচিকাঁচার দল। প্রশ্ন একটাই—মালদা-মুর্শিদাবাদের এই বিপর্যয় নিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে বিগত কয়েকদিনে কতটা কভারেজ দেখেছেন? টিভির বিতর্কে কতবার এসেছে গঙ্গা - ভাঙন? এসব নিয়ে প্রথম শ্রেনীর দৈনিকগুলোতে অন্তর্তদন্তমূলক রিপোর্ট বা নদী বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণমূলক লেখা কতটা পড়েছেন?
আমি চাই, জলমগ্ন কলকাতা দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরুক। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যেন আর একটি প্রাণও না ঝরে শহরের ভেজা রাজপথে। কিন্তু একই সঙ্গে চাই কলকাতা আরও মানবিক হোক। গণমাধ্যম- সাহিত্য-সংস্কৃতির জগৎ গ্রামীণ সমাজকে আরও জায়গা দিক। ভাঙন-বিষয়ক উপন্যাস, চলচ্চিত্র,খবরাখবর—সবেতেই সংবেদনশীলতার এই খরা কাটুক। (অভিজিৎ সেনের 'নিম্নগতির নদী' মত এক আধটা বাদ দিলে) সমসাময়িক লেখকদের নদীমাতৃক সমাজকেন্দ্রিক উপন্যাস, ভাঙন-সাহিত্য তেমন মনেই পড়ে না! দক্ষিণ কলকাতার শপিং মল, ক্যাফে, রেস্টুরেন্টের বাইরে যে একটা বড় গ্রাম - মফস্বলের সমাজ থাকে এই রাজ্যে -- সেটা নিউজ এঙ্কর, পোর্টাল এডিটর, চলচিত্র নির্মাতারাও একটু বুঝুক। যাঁদের পূর্বসূরিরা দেশভাগের ট্রমা নিয়ে সিনেমা বানাল ( যার রেশ এখনো চলছে) , উপন্যাস লিখল, তাঁরাই কিনা ভাঙনের যাতনা নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব?
দেশের একপ্রান্তে এতবড় বিপর্যয় চলছে, অথচ কেন্দ্রের কোনও হেলদোল নেই। কেউ প্রশ্ন তুলছে না। অথচ কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রয়োজন হলে, ভোটের আগে ঠিকই দলে দলে লস্কর -ই- নয়ডার সেনাবাহিনী ক্যামেরা আর বুম নিয়ে ঠিকই চলে আসবে মুর্শিদাবাদে জিহাদী খুঁজতে বা মালদায় অনুপ্রবেশকারী ! ঠিক যেমন পশ্চিমের অনেক চ্যানেলগুলো তাদের দর্শকদের বুঝতেই দেয়না ইউক্রেন থেকে গাজার পরিস্থিতি এই মুহূর্তে হাজারগুণ ভয়াবহ। হাজার হাজার ফিলি*স্তিনি শিশুর মৃত্যুকে তারা নিমেষেই ভুলিয়ে দেয় কিছু ইজরা*লি বন্দির প্রতি প্রচারের সব আলো ফেলে। এমনি এমনি তো আর সাধারণ মানুষ পথে নামছে না। পৃথিবীর এক প্রান্তে "Black Lives Matter" , বা অন্য প্রান্তে "Dalit Lives Matter" স্লোগান বাধ্য হয়েই দিচ্ছে। তখনই বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে যখন বুঝছে, শাসকের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যম, জনসংস্কৃতি, সুশীল সমাজ সবাই তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতায় শামিল, কমপ্লিসিট। কোটি কোটি টাকার মালিক এই বিড়ি কোম্পানীগুলো চাইলে কলকাতার যে কোন মিডিয়াকে টক্কর দেওয়া গনমাধ্যমের জন্ম দিতে পারে ( গাজা প্রসঙ্গে আল জাজিরা যেমন প্রতি মুহূর্ত বিবিসি - সিএন এনের দ্বিচারিতা সামনে আনছে), অন্তত একটা ফ্যাক্ট -চেকিং সংস্থা বানাতে পারে ( যার প্রয়োজন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায় দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হলেই) । কিন্ত না, তারা এসব করবে না। রমজানে বা ভোটের আগে ক্যামরার সামনে বস্ত্র বা ত্রাণ বিতরণ করার ফেসবুক লাইভ করেই এদের দায়িত্ব খালাস!
আজ এই গ্রামগুলো যদি শহর হতো, যদি এসবের অধিকাংশ বাসিন্দা গরীব মুসলিম বা নিম্নবর্ণের হিন্দু না হত, কলকাতা বিকল্প নগরনির্মাণের সমুহ প্রচেষ্টাকে এত সফলভাবে ঠেকিয়ে রাখতে না পারত -- তবে মালদা - মুর্শিদাবাদে ভাঙন শুরু হতেই আমরা কেমন তৎপরতা দেখতাম, সমালোচনা - আলোচনায় মুখরিত গনমাধ্যম পেতাম, তার আভাসই মিলছে জলমগ্ন কলকাতাকে ঘিরে বিগত ক’ঘণ্টার শোরগোলে। শেকড় বাঁচলেই গাছ বাঁচে, গ্রাম বাঁচলেই শহর টিকে থাকে। কলকাতা যেমন বাঙালির আবেগের কেন্দ্র, তেমনি বাংলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিও বাঙালির অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আবেগ - অনুভূতি - ঐতিহ্যরও। একদিন যদি গ্রাম ফুরিয়ে যায়, তবে শহরও তার শেকড় হারাবে। আর শেকড়হীন শহর কোনোদিনই বাইরে থেকে আসা ঝড় - ঝাপটার সামনে সম্মিলিতভাবে টিকে থাকতে পারে না। কলকাতার উপর ইতিমধ্যেই বহিঃশত্রুর প্রভূত প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে!
গঙ্গা-ভাঙন ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি
বর্তমান সময়ে আমাদের মালদা -মুর্শিদাবাদের ভাঙন সমস্যা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বুঝতে গেলে ইংরেজি পারফরমেটিভ (Performative) শব্দটার মানে বোঝা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। পারফরমেটিভ মানে হলো – যে কাজ নিজেকে প্রকাশের জন্য করা হয়। নিজেকে প্রকাশ করাই যেখানে কর্ম-সম্পাদনের আসল উদ্দেশ্য। সমস্যার সমাধানের বা বাস্তব কাজের চেয়ে রাজনীতি যেখানে রাজনীতিবিদের মাধ্যমে একটা দেখানো তথা প্রকাশের শিল্পে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ "কাজ"টা এক্ষেত্রে শুধু ফল পাওয়ার জন্য নয়, বরং “দেখানোর” বা “উপস্থিতি জানানোর” মাধ্যম। আমরা Performing Arts পরিভাষাটির সঙ্গে ভালভাবে পরিচিত। এর অর্থ সেই শিল্পরূপ, যেখানে শিল্পী তার দক্ষতা সরাসরি দর্শকের সামনে পরিবেশন করেন। অর্থাৎ এখানে শিল্পকর্মটি কোনো বই বা ছবি নয়, বরং জীবন্ত অভিনয়, নাচ, গান বা সঙ্গীত পরিবেশনা। পারফরমেটিভ রাজনীতিতে নেতা বা নেত্রীর চালচলন যেন নিজেই একটা জীবন্ত অভিনয়।
আমাদের এলাকাগুলো থেকে হাল আমলে Performing Arts এর ময়দানে সেরকম গুনী শিল্পী তেমন উঠে না এলেও, পারফরমেটিভ পলিটিক্সের ময়দানে দক্ষ রাজনীতিবিদ সর্বস্তরের রাজনীতিতে পাইকারি হারে উঠে আসছে। দেখলে মনে হবে যেন, আমরা আবার সেই রাজা - বাদশাদের জামানায় ফিরে গেছি (মিথ আর পরিবারতন্ত্রের রাজনীতিতে মালদা এমনিতেও সর্বদা শীর্ষে)। সে যুগে রাজারা পালকি থেকে নামত, এযুগের নেতারা স্কর্পিও থেকে নামেন। ওদের মাথায় ভৃত্যরা ছাতা ধরত, এদের সামনে তোষামুদেরা কেউ ক্যামরা ধরে, কেউ গাড়ির গেট খুলে, আর সবাই শুধুই পেছন পেছন হাঁটে। হাঁটার উদ্দেশ্যে এখানে গমন, প্রস্থান, আগমণ, সমস্যার সমাধান কিছুই না। তার চেয়েও মহৎ -- রিল বানানো!
গঙ্গা -ভাঙন থামছে না, ঘাটে চলো। খবর দাও সরকারি ইঞ্জিনিয়রদের, ঠিকাদারকে (কানে কানে বলে দাও রিল বানানোর সময় নেতা বা নেত্রী একটু বিরক্তি দেখাবে, বকতেও পারে -- গায়ে মাখবেন না। তলে তলে আপোষের ঐক্য মজবুতই থাকবে, বাঁধের চেয়েও)। অথবা, বছর ঘুরে আরেকটা বছর হতে চলল সাংসদ হওয়া, এখনো গঙ্গা ভাঙনকে জাতীয় বিপর্যয় দাবি করে, পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন নেমে আসা রাষ্ট্রীয় জুলুমকে চ্যালেঞ্জ করে সংসদের আকাশ - বাতাস কাঁপিয়ে খুব একটা বলার সুযোগ হয়নি, এলাকায় জনতার দরবার করার সুযোগ হয়নি -- সমস্যা নেই। ফেসবুক পাবলিককে প্যাডে কিছু চিঠীগুলে খাইয়ে দাও। ওরা তাতেই বুঁদ হয়ে থাক -- দেড় হাজার লাইক, পৌঁনে তিনশ শেয়ার, সঙ্গে ফ্রিতে এক লাখ পার্ফরমেটিভ পলিটিক্স! পরিযায়ী শ্রমিকের হয়ে সংসদে গলা ফাটাতে হলনা, ফ্যাসিবাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হলনা, ইসলামোফোবিয়া আক্রান্ত সমাজটাকে সারিয়ে তুলতে কোনো প্রতিবাদ - আন্দোলন কিছুই না করে শুধু একটা প্যাডে টাইপ করা চিঠি আর সেটার ফেসবুকে আপলোড দিয়েই দায়িত্ব খালাস! সব অসুখের একটাই দাওয়াই - চিঠি লেখ আর সামাজিক মাধ্যমে দাও। সেই চিঠির আসল উদ্দেশ্যই হল পারফরমেটিভ পলিটিক্স। পরবর্তীতে চিঠিটা যদি অমিত শাহ বা জলসম্পদ মন্ত্রকের অফিসে নাও পৌঁছায় -- সমস্যা নেই। লোকে ফেসবুক দেখলেই হল!
বুড়িছোঁয়ার রাজনীতিতে ভরে গেছে পুরোটা। শুধু টাচ্ করে এগিয়ে যাও, যাতে কেউ বলতে না পারে টপিকটা কভার হয়নি! এতটাই তাড়না, মরা বাড়িতে গেলেও ফেসবুকে ছবি, বিয়ে বাড়িতে গেলেও, ধর্মকর্ম করলেও! এখন তো আবার শুনলাম, প্রোফেশনাল সোস্যাল মিডিয়া ম্যানেজার পাওয়া যাচ্ছে। এরা থাকে দলের আইটি বা সোস্যাল মিডিয়া সেলের ব্যানারে কিন্ত দল কম করে, ব্যক্তি রাজনীতি বেশি করে। যত নির্বাচন এগিয়ে আসবে, এদের উৎপাত তত আপনার দৃষ্টিগোচর হবে। আপনি শুধু পোস্টগুলোই দেখবেন, জালওয়া জালওয়া গানের সাথে রিল দেখবেন, কিন্তু সেই পোস্টগুলো যে সমস্যার সমাধান নয় বরং টাকা দিয়ে টিকিট পাওয়ার জন্য পোস্ট, ভোট জেতার দৌড়ে থাকার পেইড প্রমোশন সেটা ধরতে পারবেন না (পুজোর পর আরো এসব বাড়বে!)। সেগুলোই আপনার অবচেতন মনে রয়ে যায়, ইভিএমের বোতাম টিপার সময় অবধি!
পারফরমেটিভ পলিটিক্স আগেও ছিল। জনপরিসর নিজেই এক ধরনের মঞ্চ, যেখানে আদর্শ পন্থা হল রাজনীতিবিদরা জনগণের সামনে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়ার প্রতিযোগিতা করবে নানা সৃজনশীল উপায়ে। সেটা বক্তব্য দিয়ে হোক, বা প্রবন্ধ লিখে, বাদানুবাদ, তর্ক - বিতর্ক করে-- তাঁরা সমাজকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে। জানাবে শুধু বর্ষার সময় আপদকালীন প্রতিরোধ নয়, শুখার মরশুমেও সময় থাকতে কীভাবে নদী ভাঙন সমস্যার জড়ে পৌঁছে সমাধান করবে, আম বা রেশমে সমৃদ্ধ একটা এলাকার কীভাবে শিল্পায়ন , খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ করবে। ঘৃণার রাজনীতি থেকে বাঁচতে স্থানীয় পর্যায়ে নানা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কীভাবে সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করবে। পারফরমেটিভ পলিটিক্স তার সেই ধ্রুপদী চরিত্র হারিয়ে এখন শুধুই ফেসবুকে রিল আর ছবি পোস্টে নেমে এসেছে! একটাই লোক, একটাই নেতা - কিন্তু সেই লোকটাই মাঠের ছেলেদের খেলায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে ব্যাট হাতে নিলে স্লো-মোশনে বিরাট কোহলি, ফুটবলে শট মারলে মেসি, কালো চশমা লাগালে রনবীর কাপুর, গাড়ি থেকে নামলে রজনীকান্ত! একই অঙ্গে এত রূপ, একই প্রোফাইলে এত হিরো? নিজের বুথে গো হারা হারে, রাতে এক দল করে, দিনে আরেক - তাও দেখবেন সেই নেতাটাই দলের বড় বড় পোস্টে। কেন? পারফরমেটিভ পলিটিক্স! কলকাতা থেকে নায়ক - নায়িকারা জেলায় ছবির প্রমোশনে এলে ভাল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করে, অনেক সেলিব্রিটির সঙ্গে সেলফি আছে, রবীন্দ্রনাথের একটাও বই না পড়েই শহরের সবচেয়ে বড় রবীন্দ্র অনুরাগী - সংস্কৃতিপ্রেমী, ভোটের সময় বাইরে থেকে নেতৃত্ব এলে স্টেজ ম্যানেজ করতেও বলিহারি প্রতিভা, ভাঙন হলে একটা গামছা গলায় জড়িয়ে ত্রাণের সামগ্রীসহ নৌকায় ফটোশুটেও সাবলীল-- এরাই তো আজকের পারফরমেটিভ পলিটিক্সের সবচেয়ে বড় পারফর্মার! টিকাদার থেকে ঠিকাদার -- সবকিছু এরাই ম্যানেজ করে!
ভাঙনের সমস্যা শুধু দুর্নীতি নয়। আরো গভীরে, আরো বিস্তৃত। রাজ্য সরকার তো বছরের পর বছর টাকা ঠিকই বরাদ্দ করছে। কিন্তু রাজ্য আর কেন্দ্রর এক্তিয়ারে ফারাক আছে। ফারাক্কা ব্যারেজ এতবড় একটা জনগোষ্ঠীকে বাঘের মুখে ফেলে দায়িত্বপালন থেকে হাত ঝাড়বে, এই গঙ্গার পানিতে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন করে কেন্দ্র বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার মুনাফা লুটবে আর ড্রেজিং করতে একটা টাকাও দিবে না, জমা হওয়া পলি সরানো নিয়ে মাথা ঘামাবে না, বন্যা হলে জাতীয় বিপর্যয়ও ঘোষণা করবে না -- আপনি কি ভাবছেন এসবের সমস্যা নিমেষে মিটে যাবে রাজ্যে সরকার পাল্টে গেলে ? বরং উল্টোটাই হবে। যদিও ভাঙন নিয়ে যারা সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে প্রতিবাদী, তাদের অনেকেই আশ্চর্যজনকভাবে বিজেপিকে একটাও প্রশ্ন করে না! অথচ গঙ্গাভাঙ্গনের সবচেয়ে বড় অপরাধী কেন্দ্রের বিজেপি সরকারই। আসলে এই প্রতিবাদের ভাষাগুলো রাজ্যের ক্ষমতার রাজনীতির চেনাছকের ভাষ্যে রচিত, ভাঙনের প্রকৃত সমাধানের কামনায় না।
সামশেরগঞ্জ থেকে ভুতনি -- এই বন্যার জন্য সবচেয়ে বড় আসামি কেন্দ্রীয় বঞ্চনা। বঞ্চনাও শুধু না, অবহেলা। বাঙালি বলে অবহেলা, মুসলিম বলে অবহেলা, নিচু জাত বলে অবহেলা -- সর্বস্তরের বৈষম্য উত্তর ভারত থেকে বয়ে এসে বিধ্বংসী বন্যা হিসেবে জীবন তছনছ করে দিচ্ছে মালদা - মুর্শিদাবাদের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের। এদের জন্য দিল্লিতে কোনো নেতা নেই, সাংসদ নেই, মন্ত্রী নেই, আওয়াজ নেই, প্রতিরোধ নেই। আছে কিছু বালির বস্তা আর খিচুড়ি! নির্বাচন পরাজয় পরবর্তী প্রবাসের জীবনে এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। পরে বুঝেছি, গৌড়বঙ্গের পারফরমেটিভ পলিটিক্সের সঙ্গে আমার মধ্যবিত্ত ক্ষুদ্র মননের রাজনৈতিক দর্শন বড়োই বেমানান। এখন শুধু এটাই আশা করতে পারি-- ওই শিল্পপতি বা পরিবারতন্ত্রের মধ্যে থেকে হলেও আগামীতে এমন কিছু জনপ্রতিনিধির উদয় হোক যাঁরা আরো একটু মানবিক হবেন, যাঁরা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার অপেক্ষা না করে আগে থেকেই পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেবেন। ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলবেন, বিতর্ক করবেন। এত টাকা-পয়সা, রিল, ছবি, পারফরমেটিভ পলিটিক্স - কিছুই তো কবরে যাবে না, যাবে শুধু নেক আমল।
23/06/2025
১৯৮৭ সালের ৩০ অগাস্ট বর্ধমানের মেমারিতে এক সম্প্রীতি সভায় গৌরকিশোর ঘোষ :
"মুসলীম লীগ ও জিন্নাহর Two Nation Theory-কে কংগ্রেস নেতারা আটকাতে পারেন নি। ভারত ভাগ হয়েছে। সেই থেকে ভারতীয় হিন্দুরা আজও মুসলমানদের প্রতি তাদের রাগ কমাতে পারেনি। অথচ দেশ ভাগের সময় এ দেশে বহু মুসলমান থেকে গিয়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছেন। দেওবন্দের মাওলানারা দেশভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন। সেদিন যে মুসলমানেরা এ দেশে থেকে যান শত প্ররোচনা সত্ত্বেও, তাদেরকে এ দেশের হিন্দু সমাজ আজও ঠিকমত মর্যাদা দিল না। তাই মুসলমান আর পাকিস্তান যে এক নয় সেটি আমরা ভুলে যাই। এটা আমাদের অর্থাৎ হিন্দুদের চালাকী। এ থেকে দূর হওয়া দরকার।"
( সূত্র : বই - "গৌরকিশোর ঘোষ: শতবার্ষিক স্মারকগ্রন্থ", পৃষ্ঠা ১৪৯-৫০, সম্পাদক সন্দ্বীপ পাল, অধ্যায় : 'গৌরকিশোর ঘোষ -- এক আশ্চর্য সুন্দর জ্যোতিষ্ক ' লেখক আব্দুস সামাদ গায়েন)
একটি আবেদন :
হলুদ পাখিগুলোকে জামরুল গাছের ডালে ডাকাডাকি করতে দেখার সেই কৌতুহলী শৈশবকাল থেকেই এই এলাকাগুলোকে চিনি। হাতের তালুর মত। এখানেই জন্মেছি, বড় হয়েছি, এই গঙ্গায় সাঁতার শিখেছি, মাছ ধরেছি। এপারের মোথাবাড়ি হোক কি ওপারের ধুলিয়ান -- কোনোদিন কোনও দাঙ্গা দেখিনি, হিন্দু - মুসলিমকে এক অপরের বাড়ি - ধর্মস্থান আক্রমণ করতেও না। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে, গুজরাটে দাঙ্গা হয়েছে। সারা ভারতের নানা স্থানে সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বলেছে, তারপরও মালদা - মুর্শিদাবাদ শান্তিপূর্ণ থেকেছে। কোনো আদর্শ, কোনো বিষবাষ্প, কোনো বহিরাগত শক্তি গৌড় সুলতান - মুর্শিদাবাদ নবাবদের সময় থেকে চলে আসা এইসব এলাকার সমন্বয়কামী চরিত্রকে খর্ব করতে পারেনি। আমাদের স্কুল এক, আমাদের বাজার এক, মুদির দোকান এক, হাসপাতাল এক, এমনকি আল্লাহ - ঈশ্বর যে নামেই ডাকি সেই সৃষ্টিকর্তাও এক। এইসব মিলিত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার কাঁধে বহন করেই তো আমরা জীবনপুরের পথিক হিসেবে একে অপরের পাশাপাশি হাঁটছিলাম। তবে হঠাৎ এই ভ্ৰাতৃঘাতি হিংসা কেন ? কারণ একটাই - আমাদের দু'জনের মাঝে এক তৃতীয় শক্তি ঢুকে পড়েছে। সে বহিরাগত, তার আপাদমস্তক ঘৃণার চাদরে আবৃত। এই ঘৃনার বুনিয়াদ মুসলিম-বিদ্বেষ । তবে দরকার পড়লে সেটি দলিত থেকে বাঙালি হিন্দু বিরোধী কিছু হতেই বিন্দুমাত্র সময় লাগেনা (যেমনটা দিল্লির এক মাছের বাজারে আমরা সম্প্রতি দেখলাম)।
মালদা-মুর্শিদাবাদের স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম সবার কাছে করজোড়ে অনুরোধ, দয়া করে আপনারা বিজেপি- আরএসএসের ফাঁদে পা দেবেন না। বাংলার হিন্দুত্ববাদীরা বুঝে গেছে সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তারা জীবনেও বাংলায় ক্ষমতায় আসতে পারবেনা। তাই দাঙ্গাকেই নির্বাচন বৈতরণী পারের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাই তাদের নেতারা বাংলার বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। তাদেরই কিছু অনুসারী কখনো মসজিদের সামনে অভব্যতা করছে, তো কখনো ওয়াকফের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে হামলা করছে। এগুলো সবই উস্কানি। তারা আপ্রাণ চায় মুসলিমরা এইসব প্ররোচনায় পা দিক। বিজেপির আইটি সেল থেকে বিজেপির সুরে সুর মেলানো গণমাধ্যম -- সবাই মনে মনে চায়ছে মুসলিমরা দাঙ্গা শুরু করুক। তাই তো এলাকার পরিস্থিতি সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ থাকার পরও ফেক নিউজ, ফেক ছবি,ফেক বয়ান সব ফেককে ব্যবহার করে জলঘোলার চেষ্টা করছে। এখানেই মুসলিমদের পরীক্ষা। সবর, ইলম, হিকমত সবকিছুর। বিশ্বাস করুন, এই পরীক্ষা যদি ভালভাবে পাশ করে যান, ২০২৬-এ বিজেপি কুপোকাত! এই ঘৃণা ছড়ানো টিভি চ্যানেলগুলোকে তখন উচিৎ উত্তর দেয়া হবে। তাছাড়া, মানবিক সম্পর্কের সবকিছু ভোটের অংক দিয়েও হয়না। হাদীসে এসেছে, কোনো মুসলিম দ্বারা অপর কোনো অমুসলিমের অধিকার হরণ হলে কেয়ামতের দিন রাসুল (সা.) নিজেই সেই মুসলিমের বিরুদ্ধে নির্যাতিত অমুসলিমদের পক্ষে দাঁড়াবেন । মজলুম মুসলিম বা অমুসলিম যা-ই হোক, তাঁর বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে।
আপনি হিন্দু হন, মুসলিম হন, জৈন হন, নাস্তিক হন, কংগ্রেস হন, তৃণমূল হন, বাম হন -- এই সংবেদনশীল মুহূর্তে এক থাকুন। মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্য সরকার -- সবাই বিজেপির এই বিভেদকামী রাজনীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে। রাজ্যের পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে দাঙ্গা এড়ানোর। সেন্ট্রাল ফোর্স আসার সুযোগ করে দেওয়া মানেই বিজেপির কোর্টে বল! নাগরিকদের মানবিক ঐক্যের সামনে বিজেপির উস্কানি, প্ররোচনা খড়কুটো বই কিছুই না। শুধু আবেগের উপর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ লাগবে এই যা। আমাদের শৈশবের মালদা - মুর্শিদাবাদ জুড়ে ডালে ডালে ডাকুক শুধুই হলুদ পাখি, কোনো ভাঙ্গা মন্দির বা অস্ত্র হাতে দাপাদাপির গল্প এখানে অচেনাই থাক। -- আপনাদের শাহনওয়াজ আলি রায়হান
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the public figure
Telephone
Website
Address
Kaliachak
Malda
732201