Uttaran

Uttaran

Share

I love capturing my thoughts within the frame of words. Alongside writing, this page also features performances of music and dance.

No matter how gentle the strokes of my pen may be, their underlying aim is to awaken a subtle resonance within your hearts.

22/04/2026

লাল মাটির পারুল
-বোধিসত্ত্ব মাইতি

রাঢ় বাংলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া অজয় আর কোপাইয়ের মাঝে যেখানে লাল মাটির ধুলো ওড়ে, সেখানে লুকিয়ে আছে এক গভীর রহস্য। বীরভূমের রুক্ষ খোয়াই আর পলাশের জঙ্গলে ঘেরা এক প্রান্তিক গ্রাম। সেখানে এক রহস্যময়ী নারী ঘুরে বেড়ায়, যাকে গ্রামবাসী চেনে 'খেপা পারুল' নামে। কেউ তাকে বলে ডাইনি, কেউ বলে পাগলী। কিন্তু সেই পাগলীর একতারার সুরেই কি লুকিয়ে আছে এই জনপদের কোনো প্রাচীন অপরাধের রক্তিম ইতিহাস? নাকি সে নিজেই এই মাটির শেষ রক্ষাকর্তা?

*প্রথম খণ্ড:
লাল ধুলোর আগমন:
চৈত্র মাসের দুপুর। লু-হাওয়ায় বীরভূমের লাল মাটি যেন আগুনের মতো তপ্ত। শহর থেকে আসা ইতিহাসের গবেষক উত্তরণ যখন খোয়াইয়ের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলল, তখন চারদিকে কেবল খাঁ খাঁ রোদ আর নির্জনতা। পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে তার; ঠিক তখনই বাতাসের বিপরীত দিক থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত খমকের আওয়াজ। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল এক মূর্তি। আলুথালু জটাধারী চুল, কপালে বড় রক্তচন্দনের তিলক, পরনে গেরুয়া আর কালোর মিশেলে এক জীর্ণ বসন। হাতে একতারা নিয়ে সেই নারী আপনমনে গেয়ে উঠল—
*"মাটির তলায় সোনার খনি,
উপরে হাঁটে কানা,
যার ধন তার খবর নাই,
পরকে দিলি আনা!"
উত্তরণ থমকে দাঁড়াল। মেয়েটি তার দিকে না তাকিয়েই হেসে উঠল—এক বীভৎস অথচ মরমী সেই হাসি। সে-ই খেপা পারুল। উত্তরণ তাকে জলের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে হাত বাড়িয়ে দিগন্তের এক ভাঙা মন্দিরের দিকে ইশারা করল। উত্তরণ বুঝতে পারল না, এই নারী তাকে পথ দেখাচ্ছে নাকি কোনো মরণফাঁদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় খণ্ড:
মরমী ধাঁধা ও ছদ্মবেশ:
গ্রামে উত্তরণের আশ্রয় হলো স্থানীয় গাইড সনাতনের বাড়িতে। সনাতন তাকে সাবধান করে দিল— "ও পারুলের ছায়া মাড়াবেন না বাবু। ও ডাইনি। গভীর রাতে ওকে অজয়ের চরে প্রদীপ জ্বালাতে দেখা যায়। লোকে বলে ও মৃতদের সাথে কথা বলে।" কিন্তু উত্তরণের কাছে পারুল এক জীবন্ত রহস্য। সে লক্ষ্য করল, গ্রামের প্রতাপশালী মোড়ল মশাই পারুলকে গ্রাম থেকে তাড়ানোর জন্য মরিয়া। মোড়ল মশাইয়ের চোখে এক ধরণের চোরা আতঙ্ক। কেন এক পাগলীকে নিয়ে এত ভয়? উত্তরণ তার গবেষণার সূত্রে জানতে পারল, ঠিক তিরিশ বছর আগে এই গ্রামে এক বড় জমিদার খুন হয়েছিলেন, যার লাশের হদিস আজও মেলেনি। আর ঠিক সেই সময় থেকেই পারুল 'খেপা' হয়ে এই মাটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তৃতীয় খণ্ড:
রক্ষাকর্তার রুদ্ররূপ:
গল্পের মোড় ঘুরল যখন এক বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থা গ্রামে এসে পৌঁছাল। তারা উন্নয়নের নামে খোয়াইয়ের লাল মাটি খুঁড়ে পাথর আর খনিজ উত্তোলনের পরিকল্পনা করেছে। মোড়ল মশাই নিজের আখের গোছাতে তাদের হাতে গ্রামের জমি তুলে দিচ্ছে। উত্তরণ যখন এই ষড়যন্ত্রের প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে বিপদে পড়ল, ঠিক তখন সামনে এসে দাঁড়াল সেই 'পাগলী'। রাতের অন্ধকারে যখন দানবীয় ক্রেনগুলো মাটির বুক চিরে শেকড় উপড়ে ফেলার আয়োজন করছিল, ঠিক তখন খোয়াইয়ের বুক চিরে বেজে উঠল পারুলের সেই খমক। মশাল হাতে পারুল রুখে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো উন্মাদনা নেই, আছে এক অমোঘ তেজ। সে চিৎকার করে বলল— "এই মাটি আমার মায়ের কোল, একে ছোঁয়ার সাধ্য কার আছে?"

চতুর্থ খণ্ড:
পলাশ যখন রক্তে রাঙা:
(পারুলের অতীত)
উত্তরণ লক্ষ্য করল, পারুল যখনই বুনো পলাশ ফুলের দিকে তাকায়, তার চোখের মণি স্থির হয়ে যায়। বীরভূমের লাল মাটিতে আজ থেকে ঠিক তিরিশ বছর আগে পারুল ছিল অজয় নদের ধারের এক সহজ-সরল বাউল কন্যা। তার বাবা নবীন বাউল ছিলেন এই অঞ্চলের প্রাণের সুর। আর পারুলের ছিল এক অপার্থিব কণ্ঠ। সেই কণ্ঠের মায়ায় পড়েছিলেন গ্রামেরই এক তরুণ আদর্শবাদী জমিদার পুত্র, ইন্দ্রজিৎ। কিন্তু সেই প্রেম আর আদর্শের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াল ধূর্ত নায়েব—যিনি আজকের এই প্রতাপশালী মোড়ল মশাই। এক অমাবস্যার রাতে মোড়ল মশাইয়ের গুণ্ডারা ইন্দ্রজিৎকে হত্যা করে আর নবীন বাউলকে পিটিয়ে মারে। মরণাপন্ন ইন্দ্রজিৎ শেষ মুহূর্তে পারুলের হাতে গুঁজে দিয়েছিল একটা ছোট পিতলের কৌটা আর তার প্রিয় একতারাটি। সেই রাতের পর থেকেই পারুল 'খেপা'র জীবন বেছে নিল—যাতে সবার আড়ালে থেকে সে পাহারা দিতে পারে সেই জায়গাকে, যেখানে ইন্দ্রজিতের শেষ চিহ্ন মিশে আছে।

পঞ্চম খণ্ড:
সম্পর্কের বিবর্তন, সুরের সেতু:
প্রথমদিকে উত্তরণের কাছে পারুল ছিল কেবলই একজন 'পাগলী'। কিন্তু উত্তরণ যখন গ্রামের মন্দিরে আক্রান্ত হয়, সেই রাতে অন্ধকার খোয়াইয়ের গোলকধাঁধা থেকে পারুলই তাকে উদ্ধার করে তার গোপন ডেরায় নিয়ে আসে। উত্তরণ বুঝতে পারল, এই তথাকথিত 'খেপা' নারীটি আসলে এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী, যে একাই একটি মৃত ইতিহাসকে বয়ে বেড়াচ্ছে। উত্তরণ আর কেবল গবেষক রইল না, সে হয়ে উঠল পারুলের সেই স্তব্ধ হয়ে যাওয়া গল্পের কান। তাদের সম্পর্ক এক অলিখিত চুক্তিতে পরিণত হয়—উত্তরণ হয়ে ওঠে পারুলের 'যুক্তি' আর পারুল হয়ে ওঠে উত্তরণের 'অনুভূতি'।

ষষ্ঠ খণ্ড:
মুখোশ উন্মোচন ও লাল মাটির বিচার:
উত্তরণ বুঝতে পেরেছিল, মোড়ল মশাইকে কেবল আইন দিয়ে হারানো যাবে না। পারুলের দেওয়া সেই পিতলের কৌটাটি ছিল আসলে একটি 'টাইম ক্যাপসুল'। তার ভেতরে ছিল তিরিশ বছর আগে ইন্দ্রজিতের লেখা একটি ডায়েরির পাতা এবং একটি বিশেষ নকশা। উত্তরণ কৌশলে গ্রামে রটিয়ে দিল যে সে মাটির নিচে 'গুপ্তধনের' সন্ধান পেয়েছে। এই খবর শুনে মোড়ল মশাই বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি ভয় পেলেন যে, গুপ্তধন খুঁজতে গিয়ে যদি সেই পুরনো হাড়গোড় বেরিয়ে পড়ে, তবে তার সব শেষ।

সপ্তম খণ্ড:
খোয়াইয়ের বিচার (ক্লাইম্যাক্স):
এক অমাবস্যার রাতে মোড়ল মশাই তার বিশ্বস্ত লোকজনকে নিয়ে চুপিচুপি সেই শ্মশান সংলগ্ন খোয়াইয়ের নির্জন অংশে পৌঁছালেন প্রমাণ সরাতে। ঠিক যখন মোড়ল মশাইয়ের কোদালের আঘাতে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে এল একটি মরচে ধরা কঙ্কাল আর ইন্দ্রজিতের সেই বিশেষ আংটি, ঠিক তখনই চারপাশ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। অন্ধকার চিরে ভেসে এল পারুলের সেই পরিচিত খমকের শব্দ। উত্তরণ জনসমক্ষে মোড়ল মশাইয়ের অপরাধ তুলে ধরল। মোড়ল মশাই রিভলবার বের করলে পারুল তার হাতের একতারাটি ছুঁড়ে মেরে তাকে নিরস্ত্র করল। মোড়ল মশাইকে গ্রেফতার করা হলো। ভোরের আলোয় দেখা গেল পারুলের চোখে এক ফোঁটা জল—যা তিরিশ বছর পর প্রথমবার তার চোখ দিয়ে পড়ল।

অষ্টম খণ্ড:
ভস্মে মাখা ইতিহাস:
মোড়ল মশাইয়ের পতনের পর পারুল উত্তরণকে নিয়ে গেল অজয় নদের ধারের সেই প্রাচীন 'সতীদাহ চাতালে'। পারুল জানাল, ইন্দ্রজিৎ তার ডায়েরিতে লিখেছিল এক বিশাল 'লোক-সংগীতের ভাণ্ডার' সম্পর্কে, যা সে গ্রামেরই এক মন্দিরের গোপন প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে রেখেছিল। ঠিক এই সময়ে প্রবেশ করলো কালা বাউল। সে বীরভূমের এক প্রাচীন তন্ত্রাশ্রমের সাধক। কালা বাউলের আসার পর থেকে পারুল আবার যেন কিছুটা কুঁকড়ে যেতে লাগল। উত্তরণ বুঝতে পারল, এই তান্ত্রিকের লক্ষ্য মোড়ল মশাইয়ের চেয়েও ভয়ংকর।

নবম খণ্ড: একতারার তারে বিষ: (কালা বাউল বনাম পারুল)
বীরভূমের আকাশে কালবৈশাখীর ঘন মেঘ। শ্মশানতলায় মুখোমুখি দাঁড়াল পারুল আর কালা বাউল। কালা বাউল সেই পিতলের কৌটাটি দাবি করল। সে বিষাক্ত তান্ত্রিক ধুনো আর মন্ত্রের ছাই ছিটিয়ে পারুলকে অবশ করার চেষ্টা করল। উত্তরণ দূর থেকে চিৎকার করে পারুলকে মনে করিয়ে দিল ইন্দ্রজিতের সেই কথা—*"সুর যার শুদ্ধ, মাটি তার অজেয়!"
পারুল তার ভাঙা খমকটায় প্রচণ্ড এক চটি দিয়ে তান্ত্রিক মারণ-মন্ত্রকে তুচ্ছ করে দিল। কালা বাউল অন্ধকারের মধ্যে মিশে গেল ঠিকই, কিন্তু লড়াই শেষ হলো না।

দশম খণ্ড:
মাটির হৃদপিণ্ড ও গোপন প্রকোষ্ঠ:
উত্তরণ বুঝতে পারল, পারুলের গাওয়া গানগুলো আসলে এক ধরণের 'অডিও-ম্যাপ'। ভাঙা শিব মন্দিরের মূর্তির কারুকাজ আর ইন্দ্রজিতের আংটির নকশা মিলিয়ে উত্তরণ পাথরের দেয়ালের গোপন ছিদ্র খুঁজে পেল। মেঝের একটা বিশাল পাথরের চাঁই সরে গিয়ে সিঁড়ি নেমে গেল অনেক নিচে। সেখানে সোনা-দানা নয়, বরং কয়েক হাজার প্রাচীন তালের পাতার পুঁথি, বিরল বাদ্যযন্ত্র এবং বীরভূমের বিলুপ্তপ্রায় সব গানের স্বরলিপি সাজানো রয়েছে। এটি ছিল ইন্দ্রজিতের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ। কিন্তু হঠাৎ ওপর থেকে শোনা গেল কালা বাউলের অট্টহাসি—সে তাদের ভেতরে আটকে দিয়েছে।

একাদশ খণ্ড:
বিষাক্ত ধোঁয়া ও সুরের অগ্নিপরীক্ষা:
কালা বাউল ওপরের ঘুলঘুলি দিয়ে বিষাক্ত ধোঁয়া পাঠাতে শুরু করল। উত্তরণ আর পারুল ভেতরে আটকা পড়ল। কালা বাউল হুমকি দিল যে সে পুরো মন্দির উড়িয়ে দেবে। উত্তরণ তখনো আধো-অন্ধকারে দেয়ালের গায়ে থাকা নকশাগুলো পর্যবেক্ষণ করে এক গোপন জলপথ খুঁজে পেল, যা সরাসরি অজয় নদের সাথে যুক্ত। সে পারুলকে নিয়ে পুঁথিগুলো ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে ভরে সেই সুড়ঙ্গের জলাধারে ঝাঁপ দেওয়ার পরিকল্পনা করল।

দ্বাদশ খণ্ড:
অজয়ের গর্ভে মুক্তি:
ঠিক যখন ওপরে এক প্রচণ্ড ডিনামাইট বিস্ফোরণ হলো, তার আগেই উত্তরণ আর পারুল সুড়ঙ্গের ভেতরে শরীর ভাসিয়ে দিয়েছে। বিস্ফোরণে মন্দির ধুলোয় মিশে গেল, কালা বাউল ভাবল তারা মারা গেছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা নিজেদের আবিষ্কার করল অজয় নদের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে। চরে উঠে উত্তরণ দেখল, পুঁথিগুলো অক্ষত আছে। পারুল হাসল— কালা বাউলকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য এটি ছিল ইন্দ্রজিতের এক মাস্টারস্ট্রোক।

ত্রয়োদশ খণ্ড:
সুর-কবচ ও শেষ প্রতিরোধ:
নদীর তীরে কালা বাউলের শেষ প্রতিরোধের মুখে দাঁড়িয়ে পারুল তার ভেজা একতারাটি রোদে শুকিয়ে এক অদ্ভুত 'রক্ষাকবচ' সুর ধরল। গ্রামের শত শত মানুষ এবার লাঠিসোটা নিয়ে পারুলের সমর্থনে এসে দাঁড়াল। কালা বাউল বুঝতে পারল, এই জনপদ আর ভয়ার্ত নয়। উত্তরণ গোপন বাউল আখড়ায় সেই জ্ঞানভাণ্ডার সুরক্ষিত করল। আজ থেকে বীরভূমের মাটি বিশ্বাসঘাতকতা করে না।

চতুর্দশ খণ্ড:
গোপন আখড়ার নকশা:
অজয়ের পাড়ে রূপোর চাবিটা হাতে নিয়ে উত্তরণ আর পারুল পা বাড়াল 'কুসুমডিহি'র জঙ্গলের দিকে। পারুল জানাল, আসল সম্পদ মানুষের ডেরায় থাকে। জঙ্গলের ভেতর তারা দেখা পেল এক বৃদ্ধ বাউল রক্ষী সাধু বাবার। তিনি তাদের নিয়ে গেলেন এক প্রাচীন বটগাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মাটির কুঁড়েঘরের সামনে। উত্তরণ রূপোর চাবি দিয়ে সেই গোপন কুঠুরি খুলল। সেখানে রক্ষিত আছে বীরভূমের প্রাচীন তান্ত্রিক দর্শনের পুঁথি আর সুরের অমোঘ ভাণ্ডার।

পঞ্চদশ খণ্ড:
লাল মাটির স্বরলিপি:
(আন্তর্জাতিক লড়াই)
উত্তরণ এই আবিষ্কারকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে লন্ডনের এক সেমিনারে ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে পারুলের গান শোনাল। কালা বাউলের পেছনে থাকা কর্পোরেট লবি হ্যাক করার চেষ্টা করলেও, পারুলের 'সনিক পাসওয়ার্ড' কেউ ভাঙতে পারল না। ইউনেস্কো বীরভূমের এই গোপন আখড়াকে 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' হিসেবে ঘোষণা করল।

ষোড়শ খণ্ড:
রক্তিম পলাশ ও শেষ যুদ্ধ:
কালা বাউল শেষবার আক্রমণ করল জঙ্গলবেষ্টিত সেই আখড়া। সাধু বাবা নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে উত্তরণকে রক্ষা করলেন। পারুল রণ-শিঙা বাজিয়ে প্রকৃতির শক্তিকে আহ্বান করল। গ্রামবাসীরা কালা বাউলকে তাড়া করে বনের গভীরে পাঠিয়ে দিল। কালা বাউল সেই জঙ্গল থেকে আর কোনোদিন বেরোতে পারল না।

সপ্তদশ খণ্ড:
বিশ্বপথের যাত্রী:
উত্তরণ লন্ডনের আমন্ত্রণে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। পারুল তাকে একমুঠো লাল মাটি উপহার দিল। উত্তরণ বুঝতে পারল, সে কেবল গবেষক নয়, সে বীরভূমের ইতিহাসের প্রহরী। সে কথা দিল, শীঘ্রই সে ফিরে আসবে বিশ্বজয় করে।

অষ্টাদশ খণ্ড:
সাত সমুদ্র ও লাল মাটির গর্জন:
লন্ডনের রয়্যাল হলে উত্তরণ যখন পারুলের সুরের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিল, তখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সে প্রমাণ করল যে, বাউল দর্শন আসলে এক উন্নত ধ্বনিবিজ্ঞান যা মানুষের স্নায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কর্পোরেট সংস্থাটি আন্তর্জাতিক আদালতের লড়াইয়ে পরাজিত হলো।

ঊনবিংশ খণ্ড:
মাটির টান না শেকড়ের টান?:
লন্ডনের বিলাসবহুল চাকরির অফার ছেড়ে উত্তরণ গ্রামে ফিরে এল। পারুল তাকে মনে করিয়ে দিল যে প্রচারের চেয়ে চর্চা বেশি জরুরি। উত্তরণ তার অফার লেটার ছিঁড়ে অজয়ের জলে ভাসিয়ে দিয়ে ঠিক করল, সে এই গ্রামেই গড়ে তুলবে 'শেকড় বিশ্ববিদ্যালয়'। বীরভূম থেকেই হবে আগামী দিনের সুরের বিপ্লব।

বিংশ খণ্ড:
নতুন প্রাণের স্পন্দন (উপসংহার):
অজয়ের চরে গোধূলির আলো। উত্তরণ আর পারুলের গড়ে তোলা 'মাটির আখড়া' এখন গানে গানে মুখরিত। শহর থেকে এক নতুন তরুণ গবেষক এল সেই সুর শিখতে। উত্তরণ বুঝল, ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে। এই আখড়া কখনো জনশূন্য হবে না। আকাশে সিঁদুরে মেঘের ছায়ায় পারুল গেয়ে উঠল সেই মহাকাব্যিক জয়গান—
*"মানুষ মরে যায় রে খোকা, সুর মরে না।"*
**— সমাপ্ত —**
Copyright © 2026 by kolomebodhisatwa. All rights reserved.

22/04/2026

দুই গ্রামের ইগো ও একটি গোল
-বোধিসত্ত্ব মাইতি

১. রণপ্রস্তুতি ও খেলোয়াড় কেনাবেচা:
আষাঢ়ের আকাশ মেঘলা থাকলেও উত্তাপে ফুটছে দুই গ্রাম— চণ্ডীপুর আর মহেশপুর। উপলক্ষ বার্ষিক 'ম্যাড ফুটবল কাপ'। গতবার মহেশপুরের হারু মিস্ত্রির করা এক বিতর্কিত অফসাইড গোল নিয়ে দুই গ্রামের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। চণ্ডীপুরের মোড়ল গোবিন্দবাবু শপথ করেছেন, "দরকার হলে জমি বন্ধক দেব, কিন্তু এবার ট্রফি চণ্ডীপুরেই আসবে।"
সাতদিন আগে থেকেই শুরু হলো 'অপারেশন প্লেয়ার'। চণ্ডীপুর হায়ার করে আনল নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার 'ওবাফেমি'কে, যাকে গ্রামের লোক নাম দিল 'বলাই'। অন্যদিকে মহেশপুর কলকাতা লিগের এক ক্ষ্যাপা গোলকিপারকে নিয়ে এল, যার হাত নাকি জালের থেকেও বড়। গ্রামের চায়ের দোকানে এখন শুধুই যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি। মহেশপুরের গজু কামার বলে দিল, "ওদের বলাইকে যদি আমাদের মনা ডিফেন্ডার একবার জাঁতাকলে ফেলে, তবে বল নয়, বলাই মাঠের বাইরে যাবে!"

২. মাঠ যখন কুরুক্ষেত্র:
খেলার দিন মাঠের চারধারে তিল ধারণের জায়গা নেই। একপাশে চণ্ডীপুরের ঢাক, অন্যপাশে মহেশপুরের ধামসা। চণ্ডীপুরের সমর্থকরা মাঠের পাশে একটা বড় হাড়িকাঠ পুঁতে রেখেছে— প্রতীকীভাবে মহেশপুরকে বলি দেওয়ার জন্য।
খেলার ২০ মিনিটের মাথায় মহেশপুরের স্ট্রাইকার একটা বাঁকানো শটে গোল দিল। মহেশপুরের গ্যালারিতে তখন অকাল দীপাবলি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক দু-মিনিট আগে, চণ্ডীপুরের সেই নাইজেরিয়ান 'বলাই' মাঠের কাদা অগ্রাহ্য করে চারজনকে ড্রিবল করে এমন এক শট মারল যে গোলকিপারসহ বল জালে জড়িয়ে গেল। মাঠ ১-১! চণ্ডীপুরের মোড়ল গোবিন্দবাবু উত্তেজনায় নিজের ধুতি সামলাতে না পেরে হারু মিস্ত্রিকে জড়িয়ে ধরলেন, পরক্ষণেই হুঁশ ফেরায় মুখ ঝামটা দিয়ে সরে এলেন।

৩. টাইব্রেকার ও রেফারির প্রাণসংশয়:
নির্ধারিত সময়ের পর শুরু হলো স্নায়ুচাপের টাইব্রেকার। কিন্তু বিধি বাম! শট মারলেই গোল হয়, গোল ঠেকানোর কোনো নামগন্ধ নেই। সাডেন ডেথেও যখন স্কোর ১০-১০, তখন রেফারি পঞ্চাননবাবু কাঁপতে কাঁপতে পকেট থেকে একটা পুরনো দশ টাকার কয়েন বের করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, "আলো কমে আসছে, এখন টস হবে।"
এই কথা শোনা মাত্রই দুই গ্রামের খেলোয়াড়রা রেফারির গলা টিপে ধরার উপক্রম করল। "পয়সা দিয়ে ফুটবল হয় নাকি? আমাদের ইগো কি ওই দশ টাকার কয়েনে ঝুলছে?" চারিদিকে তুমুল চেঁচামেচি শুরু হলো। কেউ বলল রেফারি ঘুস খেয়েছে, কেউ বলল টসের কয়েনটাই জাল!

৪. অন্ধকারের সার্কাস:
সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু জেদ কমেনি। আয়োজকরা ঠিক করলেন আরও ১০ মিনিট খেলা হবে। লাইট কোথায়? গ্রামের লোক যে যার সাইকেল নিয়ে এল। গোটা দশেক সাইকেলের ডিনামো আর মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটে মাঠে এক অদ্ভুত মায়া পরিবেশ তৈরি হলো।
অন্ধকারে বল দেখা যায় না, শুধু পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। চণ্ডীপুরের বলাই অন্ধের মতো পা চালিয়ে বলের বদলে মহেশপুরের এক ডিফেন্ডারের হাঁটুতে লাথি মারল। সে ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল, "ওরে বাবা রে, মরে গেলাম!" কিন্তু বলাই ভাবল সে বুঝি গোল করে ফেলেছে, তাই অন্ধকারের মধ্যেই নাচতে শুরু করল। ওদিকে মহেশপুরের গোলকিপার একটা বড় ব্যাঙকে বল ভেবে ঝাঁপ দিয়ে কাদায় মাখামাখি হয়ে রইল।

৫. সমাধান না কি নতুন যুদ্ধ?:
১০ মিনিট শেষ হলো, গোল হলো না। দুই গ্রামের লোক যখন মাঠের মাঝখানে লাঠালাঠির প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই প্রবীণ শিক্ষক অবিনাশবাবু মাঠে নামলেন। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "শোনো ছেলেরা, ট্রফিটা নিয়ে তোরা কাড়াকাড়ি করছিস, কিন্তু আসল ট্রফি তো তোদের লড়াইটা। এক কাজ কর, এই ট্রফিটা করাত দিয়ে কেটে দু-ভাগ করে নিয়ে যা।"
সবাই থমকে গেল। মহেশপুরের মোড়ল বললেন, "না না, কাটার দরকার নেই। কাপটা আজ আমাদের গ্রামে থাকুক, কাল থেকে চণ্ডীপুরে। আর আগামী রবিবার বড় রি-ম্যাচ হবে। সেদিনই ফয়সালা হবে আসল রাজা কে!" ইগো শেষ হলো না, কেবল এক সপ্তাহের জন্য মুলতবি রইল।

৬. রণকৌশল ও 'গুপ্তচর' বিভাগ:
পরের রবিবারের রি-ম্যাচকে কেন্দ্র করে দুই গ্রাম এখন যেন আলাদা রাষ্ট্র। গোবিন্দ মোড়ল উঠোনে ব্ল্যাকবোর্ড বসিয়ে 'বলাই'কে নিয়ে মিটিং করছেন। সমস্যা হলো বলাই বাংলা বোঝে না, আর মোড়ল ইংরেজি জানেন না। মোড়ল বলছেন, "বলাই রে, তুই খালি গোলপোস্ট লক্ষ্য করে মারবি।" বলাই মাথা নেড়ে বলছে, "ইয়েস বস!" ওদিকে খবর এল মহেশপুর নাকি এক তান্ত্রিক ধরে এনেছে, যে গোলপোস্ট 'বন্ধি' করে দেবে! মোড়ল গর্জে উঠলেন, "ওরা তান্ত্রিক আনলে আমরা বিজ্ঞান মঞ্চের লোক আনব! যুক্তি দিয়ে গোল হবে, কোনো ভেলকিতে নয়!"

৭. ডায়েট এবং 'মারণ' ফন্দি:
খেলোয়াড়দের ফিট রাখতে মহেশপুর কাঁচা ছোলার জল আর মুরগির ঝোলের ডায়েট চার্ট বানাল। তবে চণ্ডীপুর এক কাঠি ওপরে গেল। তারা মহেশপুরের মেইন স্ট্রাইকার মনাইকে 'সামাজিক' উপায়ে ঘায়েল করার ফন্দি আঁটল। মনাইয়ের দুর্বলতা হলো 'তেলেভাজা'। চণ্ডীপুরের এক লোক ছদ্মবেশে গিয়ে মনাইকে আগের রাতে এক ঠোঙা গরম চপ-পেঁয়াজি খাইয়ে এল। উদ্দেশ্য একটাই— পেট গরম করে ওকে মাঠের বাইরে রাখা।

৮. সেই মাহেন্দ্রক্ষণ:
রি-ম্যাচের দিন পঞ্চায়েত থেকে দুটো বড় হ্যালোজেন লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেফারি পঞ্চাননবাবু এবার আর ধুতি নয়, ট্রাকসুট পরে এসেছেন যাতে গন্ডগোল হলে দ্রুত পালাতে পারেন। খেলার শুরুতেই চণ্ডীপুরের বলাই বল নিয়ে দৌড় দিল। কিন্তু গোলপোস্টের সামনে আসতেই দেখা গেল আসল নাটক— মহেশপুরের গোলকিপার হাঁটু গেড়ে বসে মন্ত্র পড়ছে! বলাই ঘাবড়ে গিয়ে বল মারল পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে। গ্যালারি থেকে চিৎকার উঠল— "তান্ত্রিকের জোর!"

৯. গোল নয়, যেন বিশ্বযুদ্ধ:
দ্বিতীয়ার্ধে স্কোর ০-০। মনাই (যে আগের রাতে চপ খেয়েছিল) বারবার মাঠের ধারে গিয়ে জল খাচ্ছে। হঠাৎ তার মধ্যে দৈব শক্তি এল। সে মাঝমাঠ থেকে একাই দৌড় শুরু করল। চণ্ডীপুরের তিনজনকে কাটিয়ে বক্সের ভেতরে ঢুকতেই তার পেটে মোচড় দিয়ে উঠল। ব্যথায় কুঁকড়ে সে যখন মাটিতে পড়ল, তার পা থেকে ছিটকে যাওয়া বলটা বলাইয়ের গায়ে লেগে রিবাউন্ড হয়ে সোজা ঢুকে গেল মহেশপুরের জালে! চণ্ডীপুর উল্লাসে ফেটে পড়ল, কিন্তু মহেশপুর দাবি করল— "এটা অফসাইড!"

১০. চরম নাটক ও অভাবনীয় ফয়সালা:
রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দেবেন, তখনই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। হ্যালোজেন লাইট ফেটে চারিদিক অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে চণ্ডীপুরের মোড়ল আর মহেশপুরের হারু মিস্ত্রি কাদা মাখা অবস্থায় কুস্তি করতে করতে একে অপরকে জাপটে ধরলেন। মোড়ল হঠাৎ থমকে গিয়ে বললেন, "হারু, তোর গায়ে সেই মাঘ মাসের পিকনিকের সরষের তেলের গন্ধ পাচ্ছি রে!" হারু মিস্ত্রিও থমকে গেলেন। পুরনো বন্ধুত্বের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বললেন, "গোবিন্দ, একটা কাপ নিয়ে কি আমরা সত্যিই মারামারি করে মরব?"

১১. উপসংহার: ফুটবলের জয়:
বৃষ্টি থামলে দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। দুই মোড়ল কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সিদ্ধান্ত হলো, ট্রফিটা কোনো গ্রামের আলমারিতে থাকবে না। এটা দিয়ে গ্রামের মোড়ে একটা নতুন 'ফুটবল অ্যাকাডেমি' খোলা হবে, যেখানে দুই গ্রামের ছেলেরা একসাথে খেলবে। বলাই কাদার মধ্যে বসে মনাইকে বলছে, "নেক্সট টাইম ডোন্ট ইট টু মাচ চপ!" মনাই হেসে বলাইকে জড়িয়ে ধরল। দুই গ্রামের ইগো শেষ পর্যন্ত এক গোল কাদার নিচে চাপা পড়ে গেল, আর জয়ী হলো স্রেফ ফুটবল।
**সমাপ্ত**
Copyright © 2026 by kolomebodhisatwa. All rights reserved.

22/04/2026

অহংকারের নদী ও মিলনের সেতু
-বোধিসত্ত্ব মাইতি

১: রূপসা তীরের দুই প্রাণ:-
রূপসা নদী এ অঞ্চলের ধমনী। বছরের অন্য সময় সে শান্ত, স্নিগ্ধ—যেন কোনো অভিমানী কিশোরীর মতো কুলকুল ধ্বনিতে বয়ে চলে। কিন্তু বর্ষায় তার রূপ বদলে যায়, উন্মত্ত যৌবনা হয়ে দুই কূল গ্রাস করতে চায়। এই নদীর পূর্ব তীরে নীলপুর আর পশ্চিম তীরে লালপুর।
নীলপুরের জমিদারি প্রতাপনারায়ণ সিংহের। তাঁর নামের মতোই প্রতাপ তাঁর চলনে-বলনে। অন্যদিকে লালপুরের ভৈরব চৌধুরী ছিলেন কিছুটা মিতভাষী কিন্তু আত্মসম্মানে অটল। এই দুই জমিদারের বংশগত বন্ধুত্ব ছিল রূপসা নদীর জলের মতোই গভীর। প্রতি সন্ধ্যায় নদীর মাঝখানে নৌকায় বসে দুই বন্ধুর তামাক টানা আর আগামীর পরিকল্পনা করা ছিল এক নিয়মিত দৃশ্য। গ্রামের সাধারণ মানুষ বলত, "নদী আমাদের আলাদা করেছে ঠিকই, কিন্তু কর্তাদের হুকুম আমাদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।" জমিদারি শাসন থাকলেও প্রজার দুঃখে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়তেন। নীলপুরের চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় লালপুরের কুমোরেরা হাঁড়ি আনত, আবার লালপুরের দুর্গাপূজায় নীলপুরের ঢাকীরা কাঠি দিত।
২: শৈশবের সখ্য ও যৌবনের আভা:-
জমিদারবাড়ির অন্দরে মৃণালিনী বেড়ে উঠছিল যেন এক বাগানবিলাসীর যত্নে রাখা শ্বেতপদ্ম। তার গায়ের রং যেন শরতের মেঘের সাথে মেশানো রোদের আভা। অন্যদিকে ভৈরব চৌধুরীর অন্দরমহলে রাজশেখর তখন অশ্বচালনা আর তলোয়ার খেলায় মত্ত। শৈশবে তারা যখন একসাথে রূপসা নদীর ঘাটে জল ছিটিয়ে খেলত, তখন কেউ ভাবেনি এই খেলার পরিণাম একদিন কত ভয়ংকর হতে পারে।
যৌবনের দোলা যখন দুজনের মনে লাগল, তখন এক অদৃশ্য আড়াল তৈরি হলো। মৃণালিনী এখন আর আগের মতো দৌড়ে রাজশেখরের সামনে আসে না, বরং জানালার শিক ধরে আড়াল থেকে দেখে—কালো ঘোড়ায় চেপে ধুলো উড়িয়ে রাজশেখর যখন জমিদারির সীমানায় টহল দেয়। রাজশেখরও অনুভব করেন, সেই ছোট্ট মৃণাল এখন আর কিশোরী নেই। তার চোখের চাউনিতে এমন এক মায়া জন্মেছে, যা কোনো তলোয়ারের ধার দিয়েও কাটা সম্ভব নয়। এটিই ছিল সেই অব্যক্ত প্রেমের শুরু, যা ভাষায় প্রকাশ না পেলেও হৃদয়ের গভীরে শিকড় গজিয়েছিল।
৩: কালিন্দী দিঘির সেই মায়াবী সন্ধ্যা:-
বসন্তের বাতাস তখন পাগল করে তুলেছে গ্রামের শিমুল আর পলাশ গাছগুলোকে। কালিন্দী দিঘির চারপাশ তখন ঘন আম্রকুঞ্জে ঘেরা। মৃণালিনী সেদিন সখীদের এড়িয়ে একাই গিয়েছিল ঘাটে। কলসটি জলে ডোবাতেই হঠাৎ এক দমকা হাওয়া উঠল। সেই বাতাসের ঝাপটায় মৃণালিনীর মাথা থেকে রেশমি ওড়নাটি খসে পড়ল এবং পবনের টানে তা দিঘির ওপার এর রাস্তার দিকে উড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে রাজশেখর সেখান দিয়ে ফিরছিলেন। হাওয়ায় ভাসমান সেই হালকা নীল ওড়নাটি তাঁর হাতে এসে থমকে গেল। তিনি ঘোড়া থামিয়ে ওড়নাটি হাতে নিয়ে ঘাটের দিকে তাকালেন। দেখলেন, ভেজা হাতে দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক অপূর্ব সুন্দরী মানবী—যার চোখে ভয় আর বিস্ময়ের মিশ্রণ। রাজশেখর ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। ওড়নাটি মৃণালিনীর দিকে বাড়িয়ে দিতেই দুজনের আঙুলের ছোঁয়া লাগল এক মুহূর্তের জন্য। সেই স্পর্শে যেন সহস্র ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল দুজনের শরীরে। রূপসা নদীতে যেমন জোয়ার আসে, তেমনি এক বিশাল প্রেমের ঢেউ আছড়ে পড়ল কালিন্দী দিঘির শান্ত জলে। কেউ কোনো কথা বলল না, শুধু চার চোখের চাহনি জানিয়ে দিল—জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধন শুরু হয়ে গেছে।
৪: গোপন অভিসার ও বাঁশির সুর:-
বসন্তের রাতগুলো নীলপুর আর লালপুরের সীমানায় এক মায়াবী কুহক তৈরি করত। কালিন্দী দিঘির সেই সন্ধ্যার পর রাজশেখর আর মৃণালিনীর পৃথিবীটা বদলে গিয়েছিল। দিনের আলোয় তাঁরা একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে থাকলেও, রাতের অন্ধকারে তাঁদের হৃদয় এক বিন্দুতে এসে মিলত।
রূপসা নদীর যে বাঁকে জঙ্গলটা একটু বেশি ঘন, সেখানে ছিল একটি জীর্ণ বারোয়ারিতলা। গভীর রাতে যখন সারা গ্রাম নিঝুম হতো, রাজশেখর সেখানে এসে বাঁশিতে মল্লার বা পিলু রাগিণী তুলতেন। সেই সুর বাতাসের পিঠে চড়ে নীলপুরের জমিদার বাড়ির খড়খড়ি দেওয়া জানালার ফাঁক দিয়ে মৃণালিনীর কানে গিয়ে পৌঁছাত। মৃণালিনী মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘর ছাড়ত। শয়নকক্ষের পেছনের বাগান দিয়ে বের হয়ে সে পৌঁছে যেত সেই নিভৃত অরণ্যে।
রাজশেখর বাঁশি থামিয়ে মৃণালিনীর হাত ধরতেন। সেই স্পর্শে কোনো কামনার চেয়ে বেশি থাকত পরম নির্ভরতা। রাজশেখর ফিসফিস করে বলতেন, "মৃণাল, এই যে রূপসা নদী আমাদের দুই গ্রামকে আলাদা করেছে, এটি কি আমাদের মনের মাঝেও সীমানা টানতে পারে?" মৃণালিনী তাঁর কাঁধে মাথা রেখে উত্তর দিত, "নদীকে তো সেতু দিয়ে বাঁধা যায় রাজশেখর, কিন্তু মানুষের তৈরি এই আভিজাত্য আর বংশের অহংকারকে কী দিয়ে বাঁধবে? আমার ভয় হয়, এই সুখের প্রদীপ একদিন ঝড়ে নিভে না যায়!" রাজশেখর তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলতেন, "যদি ঝড় আসে, তবে আমি নিজের বুক দিয়ে তোমায় আগলে রাখব।"
৫: আভিজাত্যের বজ্রপাত:-
কিন্তু সুখের প্রদীপটি সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী হলো না। একদিন অমাবস্যার রাতে, যখন কুয়াশায় চরাচর ঢাকা, তখন প্রতাপনারায়ণের এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত পাহারাদার রঘুনাথ ওত পেতে ছিল জঙ্গলের ধারে। সে নিজের চোখে দেখল নীলপুরের জমিদার দুহিতাকে লালপুরের জমিদার পুত্রের সাথে অতি নিভৃতে। পরদিন ভোর হতেই সেই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল দুই জমিদার বাড়িতে।
প্রতাপনারায়ণ যখন খবরটি শুনলেন, তাঁর হাতের রুপোর গড়গড়াটি মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তাঁর চোখ দুটি আগুনের গোলার মতো লাল হয়ে উঠল। দীর্ঘদিনের বন্ধু ভৈরব চৌধুরীর ওপর তাঁর ঘৃণা জন্মাল—তিনি ভাবলেন এটি হয়তো ভৈরব চৌধুরীর কোনো সুপরিকল্পিত চাল। অন্যদিকে ভৈরব চৌধুরীও রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি ভাবলেন নীলপুর তাঁর ছেলেকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে।
যে দুই জমিদার একসময় এক থালায় খাবার খেতেন, তাঁরা একে অপরের ছায়া মাড়াতেও অস্বীকার করলেন। প্রতাপনারায়ণ তাঁর লাঠিয়াল বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন, "লালপুরের কোনো কাকপক্ষীও যেন নীলপুরের আকাশে না ওড়ে।" ভৈরব চৌধুরীও পাল্টা হুঙ্কার দিলেন, "নীলপুরের মেয়ে আমাদের বংশের কুলাঙ্গারকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে, আমি এর প্রতিশোধ নেবই।" বন্ধুত্ব নিমিষেই এক ভয়ংকর বংশগত শত্রুতায় রূপ নিল।
৬: রূপসা নদীর রক্তচক্ষু:-
শুরু হলো এক অলিখিত যুদ্ধ। নীলপুর আর লালপুরের মধ্যবর্তী রূপসা নদী, যা আগে মিলনের গান শোনাত, এখন তা হয়ে উঠল এক অভিশপ্ত সীমানা। নদীর ঘাটে ঘাটে দুই পক্ষের লাঠিয়াল বাহিনী মোতায়েন হলো। জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ করে দিল, কারণ জল পার হলেই ওপার থেকে বল্লম আসত।
মৃণালিনীকে অন্দরমহলের এক অন্ধকার কক্ষে বন্দি করা হলো। দিনরাত পাহারায় রাখা হলো দাসীদের। তাঁর কান্না শোনার মতো কেউ ছিল না। প্রতাপনারায়ণ ঘোষণা করলেন, "বংশমর্যাদা রক্ষা করতে যদি মেয়েকে বিষ দিয়ে মারতে হয়, আমি তাও করব, তবুও লালপুরের ঘরে তাকে পাঠাব না।"
অন্যদিকে রাজশেখরকে কড়া পাহারায় রাখা হলো লালপুরের কেল্লা সদৃশ অন্দরমহলে। কিন্তু রাজশেখরের রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। তিনি জানালার শিক ধরে রূপসা নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তিনি দেখতে পেতেন ওপারে নীলপুরের মশালগুলো জ্বলছে। তাঁর কানে আর বাঁশির সুর আসত না, আসত শুধু যুদ্ধের দামামা আর লাঠিয়ালদের চিৎকার। রাজশেখর মনে মনে সংকল্প করলেন, যে আভিজাত্যের দেয়াল তাঁদের আলাদা করেছে, সেই দেয়াল তিনি নিজের হাতে চূর্ণ করবেন। হয় মিলন, নয় মৃত্যু—তৃতীয় কোনো পথ তাঁর সামনে খোলা নেই।
৭: এক ঝোড়ো রাতের শপথ:-
আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি আজ কোনো এক প্রলয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। নীলপুরের অন্দরে মৃণালিনী তখন পাথরের মূর্তির মতো বসে ছিলেন। তাঁর বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে অন্য এক জমিদারের সাথে, যাকে তিনি কোনোদিন দেখেননি। বাইরের ঝোড়ো হাওয়া আর জানালার কপাটের আছড়ে পড়ার শব্দে তাঁর হৃদপিণ্ড যেন থমকে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার ভেদ করে রাজশেখর তাঁর ঘোড়া নিয়ে নীলপুরের সীমানায় পৌঁছালেন। লাঠিয়ালদের কড়া পাহারা এড়িয়ে, জীবন বাজি রেখে তিনি প্রাচীর টপকালেন। মৃণালিনীর ঘরের জানালায় টোকা পড়তেই তিনি চমকে উঠলেন। দেখলেন, বৃষ্টিতে ভেজা রাজশেখর তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজশেখর নিচু গলায় বললেন, "মৃণাল, আজ হয় আমাদের শেষ রাত, না হয় এক নতুন জীবনের শুরু। তুমি কি আমার সাথে আসবে?"
মৃণালিনী এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। আভিজাত্যের সব গয়না খুলে ফেলে তিনি শুধু একবস্ত্রে রাজশেখরের হাত ধরলেন। অন্ধকারে ঘোড়ার খুরের শব্দ বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে গেল। পাহারাদাররা যখন টের পেল, তখন রূপসা নদীর তীরে এক ছায়ামূর্তি ঘোড়া ছুটিয়ে অন্ধকারের গহিনে মিলিয়ে গেছে।
৮: সিঁথির সিন্দুর ও ত্যাজ্য ঘোষণা:-
শ্মশান সংলগ্ন সেই প্রাচীন পরিত্যক্ত কালী মন্দির। জরাজীর্ণ দেয়াল আর শ্যাওলার গন্ধে ভরা সেই স্থানে তখন এক ম্লান প্রদীপ জ্বলছিল। রাজশেখর মৃণালিনীকে নিয়ে বিগ্রহের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বৃষ্টির গর্জন আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে চারপাশটা ছিল বিভীষিকাময়। কিন্তু রাজশেখরের চোখে ছিল প্রদীপের শিখার মতো স্থির সংকল্প।
বিগ্রহের পায়ে রাখা সিন্দুরের কৌটোটি রাজশেখর তুলে নিলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল না, বরং এক পরম শান্তিতে তাঁর মুখ ভরে গিয়েছিল। মৃণালিনীর ললাটে যখন তিনি সিন্দুরের গাঢ় রক্তিম রেখা টেনে দিলেন, তখন বাইরে এক প্রবল বিদ্যুৎ চমকে উঠল—যেন আকাশ স্বয়ং তাঁদের এই পরিণয়কে স্বীকৃতি দিল।
পরদিন সকালে যখন খবর পৌঁছাল, দুই জমিদার বাড়িতে যেন ভূমিকম্প হলো। প্রতাপনারায়ণ আর ভৈরব চৌধুরী—উভয়েই রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। তাঁরা মিলিতভাবে ঘোষণা করলেন, "যারা বংশের নাম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, তাদের এই গ্রামে আর কোনো স্থান নেই।" তাঁদের ত্যাজ্য করা হলো। রাজশেখর ও মৃণালিনী গ্রাম ছাড়লেন, কিন্তু তাঁদের পেছনে রয়ে গেল দুই জমিদারের আমৃত্যু ঘৃণা আর একরাশ দীর্ঘশ্বাস।
৯: অচেনা নগরে জীবনযুদ্ধ:-
গ্রামের রাজার হালে থাকা রাজশেখর আর বিলাসিতায় বড় হওয়া মৃণালিনী যখন দূর এক অচেনা নগরের প্রান্তে পৌঁছালেন, তখন তাঁদের সম্বল ছিল শুধু একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। রাজপ্রাসাদের আরামদায়ক শয্যার বদলে জুটল খড়ের বিছানা। রাজশেখর কোনোদিন কায়িক শ্রম করেননি, কিন্তু ভালোবাসার টানে তিনি কুঠার তুলে নিলেন। নগরের প্রান্তে কাঠের গোলায় তিনি দিনমজুরের কাজ নিলেন।
মৃণালিনীও তাঁর রেশমি শাড়ি ছেড়ে সাধারণ সুতির কাপড় পরলেন। যে হাতে শুধু সোনার চুড়ি শোভা পেত, সেই হাতে এখন রান্নার কালি আর ধোঁয়া। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তাঁদের প্রেমের প্রদীপটি কোনোদিন ম্লান হতে দেননি তাঁরা। রাজশেখর যখন সন্ধেবেলা ক্লান্ত হয়ে ফিরতেন, মৃণালিনী তাঁর ঘাম মুছিয়ে দিয়ে বলতেন, "জমিদারি আমাদের কেড়ে নিলেও, আমাদের মন কেউ কেড়ে নিতে পারেনি রাজশেখর।" এই কঠিন জীবনযুদ্ধ তাঁদের সম্পর্ককে পাথরের মতো শক্ত করে তুলল।
১০: তৃষার আগমন ও বসন্তের হাওয়া:-
অচেনা নগরের সেই ছোট কুটিরে পাঁচটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। অভাব ছিল, কিন্তু দারিদ্র্য তাঁদের প্রেমে কোনোদিন কালো ছায়া ফেলতে পারেনি। ঠিক এমন সময় তাঁদের জীবনে এল এক পরম আশীর্বাদ—তৃষা। তার আগমনে কুটিরের কোণে কোণে যেন এক অলৌকিক আলো ছড়িয়ে পড়ল। তৃষার গায়ের রং মৃণালিনীর মতো উজ্জ্বল, আর তার চোখের দীপ্তি যেন রাজশেখরের প্রতিচ্ছবি।
মৃণালিনী যখন তৃষাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় বসতেন, তখন তাঁর মনে পড়ত নীলপুরের সেই বিশাল রাজপ্রাসাদ আর তাঁর মায়ের কথা। রাজশেখর এখন কাঠের কাজ আর দিনমজুরি করে যা উপার্জন করেন, তাতে কোনোমতে ডাল-ভাত জোটে। কিন্তু তৃষার এক চিলতে হাসিতে রাজশেখরের সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে যেত। তিনি তাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরতেন আর নীলপুর-লালপুরের রূপসা নদীর গল্প শোনাতেন। তৃষা মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন করত, "বাবা, আমার ঠাকুরদারা কি রাজপুত্রদের মতো দেখতে?" রাজশেখর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিতেন, "হ্যাঁ মা, কিন্তু তাঁদের মন পাথরের চেয়েও শক্ত।"
১১: তৃষ্ণার্ত দাদু ও এক ঘটি জল:-
জ্যৈষ্ঠের এক প্রখর দুপুরে প্রকৃতি যখন আগুনের হলকা ছাড়ছে, তখন জমিদার প্রতাপনারায়ণ সিংহের পালকি সেই অচেনা গ্রামের পথ দিয়ে যাচ্ছিল। জমিদারি সেরেস্তার কোনো এক কাজে তিনি বের হয়েছিলেন। বয়স হয়েছে, শরীরে আগের মতো তেজ নেই, কিন্তু মেজাজ এখনো সেই আগের মতোই কঠোর। রোদের তাপে তাঁর কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছিল। পাহারাদাররা আশেপাশের কোনো পুকুর বা কুয়ো থেকে জল জোগাড় করতে পারল না।
তৃষ্ণায় কাতর প্রতাপনারায়ণ পালকি থেকে নামলেন। দেখলেন, অদূরে এক অশ্বত্থ গাছের তলায় একটি ছোট্ট মেয়ে মাটির পুতুল নিয়ে একা একা খেলছে। তিনি ক্ষীণ স্বরে ডাকলেন, "দাদুভাই, একটু জল খাওয়াতে পারো? বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।"
তৃষা তার মায়াবী বড় বড় চোখ তুলে তাকাল। সে মানুষটির আভিজাত্য বা পরিচয় বুঝল না, শুধু তাঁর তৃষ্ণার্ত মুখটা দেখে হাত ধরে টেনে নিয়ে এল নিজেদের কুটিরে। ভেতরে চিৎকার করে বলল, "মা! মা! বাইরে একজন ঠাকুরদা এসেছেন, জল দাও!" মৃণালিনী জলের ঘটি নিয়ে বারান্দায় আসতেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সামনে তাঁর বাবা! সেই তেজস্বী প্রতাপনারায়ণ আজ জলহীন তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো দাঁড়িয়ে। বাবার চোখে চোখ পড়তেই মৃণালিনীর হাত থেকে ঘটিটি মেঝেতে পড়ে গেল। তিনি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন এবং অমনি আড়ালে দৌড়ে পালালেন। প্রতাপনারায়ণ জল পান করলেন, তৃপ্ত হলেন। কিন্তু তাঁর মনে খটকা লাগল—এই ছোট্ট মেয়েটির চোখের চাউনি কেন এত চেনা? তিনি দীর্ঘক্ষণ তৃষার কপালে হাত দিয়ে বসে রইলেন। তাঁর চোখের এক ফোঁটা জল সেদিন মাটির মেঝেতে মিশে গেল।
১২: আমগাছ তলার বন্ধুত্ব:-
ঘটনার কিছুদিন পর। লালপুরের জমিদার ভৈরব চৌধুরীও কোনো এক কারণে সেই এলাকা দিয়ে ফিরছিলেন। তিনি বেশ ক্লান্ত হয়ে এক বিশাল আমগাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেখানে তৃষা একা একা খেলছিল। ভৈরব চৌধুরীর মতো রাশভারী মানুষ, যিনি গত পাঁচ বছর হাসতে ভুলে গিয়েছিলেন, সেই শিশুটিকে দেখে তাঁর মনটা কেমন যেন আর্দ্র হয়ে উঠল।
তিনি ডাকলেন, "তোমার নাম কী খুকি?"
তৃষা খিলখিল করে হেসে উত্তর দিল, "আমি তৃষা। আমার বাড়িতে যাবে? মা খুব ভালো পায়েস বানায়, খাবে?"
ভৈরব চৌধুরী অবাক হলেন—এই বয়সে কোনো অজানা মানুষের সাথে এত সহজভাবে কেউ কথা বলতে পারে! তিনি তৃষার পাশে বসে তার গল্প শুনতে লাগলেন। তৃষা তাকে ফুল, লতা আর তার বাবার তৈরি কাঠের ঘোড়ার কথা শোনাল। ভৈরব চৌধুরী হাসলেন—যা তিনি বছরের পর বছর করেননি। মৃণালিনী তৃষাকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দেখলেন, তাঁর রাগী শ্বশুরমশাই তৃষার সাথে হাসাহাসি করছেন! তৃষা মাকে দেখে বলল, "এই দেখো মা, আমার নতুন বন্ধু! এঁর সাথে গল্প করো।"
মৃণালিনী সাহস সঞ্চয় করে সামনে গিয়ে শ্বশুরমশাইকে প্রণাম করলেন। ভৈরব চৌধুরী তৃষার মুখের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন; দেখলেন ঠিক যেন রাজশেখরের ছোটবেলার প্রতিচ্ছবি! তাঁর আভিজাত্যের বরফ যেন এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, রক্তের টানকে কোনো মানচিত্র বা সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না।
১৩: অহংকারের বিসর্জন:-
সেই ঘটনার পর থেকে প্রতাপনারায়ণ আর ভৈরব চৌধুরী—উভয় জমিদারের মনেই এক প্রবল অস্থিরতা শুরু হলো। আভিজাত্যের যে বর্ম তাঁরা পরে ছিলেন, এক শিশুর নিষ্পাপ স্পর্শে তাতে ফাটল ধরেছে। রাতে ঘুমাতে গেলে প্রতাপনারায়ণের কানে বাজত তৃষার সেই ডাক—'ঠাকুরদা'। অন্যদিকে ভৈরব চৌধুরী রাজশেখরের সেই ছোটবেলার মুখটি তৃষার মাঝে দেখে নিজের কঠোরতাকে ঘৃণা করতে শুরু করলেন।
একদিন রূপসা নদীর সেই পুরনো ঘাটে, যেখানে একসময় দুই বন্ধু তামাক টানতেন, সেখানে দুজনে মুখোমুখি হলেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর তাঁদের চোখাচোখি হলো। কোনো লাঠিয়াল নেই, কোনো হুঙ্কার নেই। প্রতাপনারায়ণ ধীর গলায় বললেন, "ভৈরব, আমরা কি সত্যিই জিতেছি? আমাদের অহংকার কি আমাদের সন্তানদের চেয়ে বড় হয়ে গেল?" ভৈরব চৌধুরী চোখের জল মুছলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, যে আভিজাত্য তাঁদের একা করে দিয়েছে, সেই আভিজাত্য আসলে এক মিথ্যে বোঝা। দুই বৃদ্ধ বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। নদীর ঢেউয়ের শব্দে সেদিন কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী শত্রতার শেষ মুহূর্তের হাহাকার।
১৪: মিলনের মহোৎসব:-
পুরো অঞ্চল জুড়ে এক সাজসাজ রব পড়ে গেল। নীলপুর আর লালপুরের মানুষ অবাক হয়ে দেখল, দুই জমিদারের হাতি আর ঘোড়া একসাথে এক অচেনা গ্রামের দিকে রওনা দিচ্ছে। পালকি সাজানো হয়েছে সবথেকে দামি রেশমি কাপড়ে।
যখন রাজশেখর আর মৃণালিনীর কুটিরের সামনে দুই জমিদারের লটবহর এসে থামল, তখন সারা গ্রাম ভেঙে পড়ল। রাজশেখর অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর বাবা আর শ্বশুরমশাই দাঁড়িয়ে আছেন—চোখে জল, হাতে আশীর্বাদের নির্মল উপহার। প্রতাপনারায়ণ রাজশেখরের হাত ধরে বললেন, "আমাদের ক্ষমা করে দাও বাবা। ঘর শূন্য করে রাখা সাজে না।" মৃণালিনী তাঁর বাবাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
তৃষাকে মাঝখানে রেখে পালকি চড়ে যখন তারা গ্রামের সীমানায় ফিরল, তখন রূপসা নদীর দুই তীরে হাজার হাজার মশাল জ্বলে উঠল। নীলপুর আর লালপুরের মানুষ একে অপরকে আবির মাখিয়ে কোলাকুলি করল। পাঁচ বছর পর আবার সেই প্রাচীন কালী মন্দিরের চত্বরে ভোজের আয়োজন হলো। যাত্রা গানের সুর নদীর বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল।
১৫: এক নতুন ভোরের সূর্য:-
সেদিন ছিল পূর্ণিমা। রূপসা নদীর বুকে চাঁদের আলো পড়ে ঝিকমিক করছিল। রাজশেখর আর মৃণালিনী মন্দিরের ঘাটে একা বসে ছিলেন। পাশে তৃষা তখন দাদুদের সাথে গল্পে মত্ত। রাজশেখর মৃণালিনীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "মনে পড়ে মৃণাল, তুমি বলেছিলে আভিজাত্যের দেয়াল ভাঙা যায় না? আজ দেখো, সেই দেয়ালই আমাদের মিলনের সেতু হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
মৃণালিনী আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসলেন। তিনি বুঝলেন, আভিজাত্য বা অর্থ নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হলো ভালোবাসা আর ক্ষমা। আজ নীলপুর আর লালপুর আলাদা কোনো গ্রাম নয়, বরং এক অখণ্ড জনপদ। কালিন্দী দিঘির জল থেকে শুরু করে রূপসা নদীর ঢেউ—সবই যেন আজ এক সুরে গাইছে মিলনের গান। তৃষার খিলখিল হাসি যেন সেই গানের ধ্রুবপদ হয়ে নতুন এক পৃথিবীর জানান দিচ্ছিল, যেখানে কোনো সীমানা নেই, আছে শুধু হৃদয়ের টান।
**— সমাপ্ত —**
Copyright © 2026 by kolomebodhisatwa. All rights reserved.

Want your business to be the top-listed Media Company in Contai?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address


Contai