Ashis Khan
৪০ টি দেশ আর ২৯২ টি শহর ভ্রমণ করে কুড়িয়ে আনা গল্পগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করার ক্ষুদ্র এক প্রয়াস
ইতালির লেক কোমোর মনোমুগ্ধকর ভিউ
15/04/2024
হাজারো "এয়ারফল্গসফ্যানদের" ভীড়ে একজন সত্যিকারের লেভারকুসেন ফ্যান
টবিয়াসের সাথে আমার পরিচয় বছর পাঁচেক আগে। শুরুতে কাজের সূত্রে কলিগ, তারপর সময়ের সাথে সাথে বন্ধুত্ব। জার্মানিতে আমার অন্যদেশের বন্ধুদের কাছে আমার আরেক নাম 'পডকাস্ট'। কারণটা কি জিজ্ঞেস করলে আমার বুলগেরিয়ান বন্ধু রাডো এক গাল হেসে আমাকে দেখিয়ে অন্যদের বলবে- এ জগতের এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে আশিস ঘন্টার পর ঘন্টা অনবরত গল্প করতে পারবো না। আমার নাকি একজন কথা বলার সঙ্গি হলেই হয়। হোক সেটা ছেলে বা মেয়ে, হোক সে যে কোনো দেশের, যে কোনো জাতি বা বর্ণের। এ জন্যই আমি এক রানিং পডকাস্ট। দেশে গেলে প্রতি সপ্তাহেই হোয়াটসঅ্যাপে রাডোর ম্যাসেজ- "জার্মানি কবে ফিরছো? কতোদিন তোমার পডকাস্ট শুনি না। "
কাজের সূত্রে সপ্তাহের অনেকটা সময়ই আমাকে কাটাতে হয় গাড়িতে ভ্রমণ করে। পৃথিবীর একমাত্র স্পিডলিমিটহীন হাইওয়েত জার্মান আওটোবানে বেপরোয়া গতিতে ছুটে চলা গাড়িদের পাশ কাটিয়ে আরো তীব্র গতিতে ছুটে চলা গাড়ির স্টিয়ারিংএ টবিয়াস আর তার পাশের সিটে বসে চলে আমাদের পডকাস্ট। কোলনের পাশে ছোট এক শহরে জন্ম নেয়া টবিয়াসের সাথে ডুসেলডর্ফ-কোলন গামি রোডে প্রতি সপ্তাহে অন্তত কয়েকবার যাওয়া আসা হয় আমাদের। এ পথে গাড়ি নিয়ে গেলে প্রতিবারেরই যখন 'বায়ারিনা' স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে আমরা যাই তখনই যেন চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে টবিয়াসের। অথচ এর কিছুক্ষণ আগেই হাইওয়ের পাশে টবিয়াসের নিজের হোমটাউন যখন ক্রস করেছি তখন তা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ভ্রু-আক্ষেপ নেই।
জার্মানদের আবেগ এমনিতেই নাকি একটু কম। এজন্যই টবিয়াসকে যখন জিজ্ঞেস করি ছোটবেলা থেকে যে টাউনে বেড়ে উঠেছো সেখান দিয়ে গেলে কোনো রকম অনুভূতি কাজ করে না?
-"না। একদমই না।" আমাকে অবাক করে দিয়ে টবিয়াসের সোজাসাপ্টা উত্তর। এটাই হলো অনেকটা স্টিরিওটিপিক্যাল জার্মান এটিচিউড। মনে যা, মুখেও তা। মিথ্যা সুগারকোটিং আর ভনিতার কোনো জায়গা নেই এখানে। আমি আমার বাড়ি ছেড়েছি পাঁচ/ছ বছর আগে। আর এ পথে প্রায় প্রতিদিন কয়েকবার ড্রাইভ করি আমি। আমার শহরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় এখন কিছুই মনে হয় না আর। টবিয়াসের সরল ব্যাখ্যা।
তবে জীবনের একটা বড় অংশ এই বায়ারিনাতে কাটিয়েও, প্রায় প্রতি সপ্তাহে একবার করে এসেও যখন টবিয়াসের বারবার বিশেষ কিছু ফিল হয় তখন আমার কোনো এক ফুটবল ভক্তের সেই বিখ্যাত উক্তির কথা মনে হয়- " ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি আমার ফুটবল ক্লাবের অপর নাম নাকি জীবন। বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি একথা সম্পূর্ণ ভুল। আমার ফুটবল ক্লাব আমার জীবনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।"
তাই বলে সব জার্মানদের জীবন মানেই কিন্তু ফুটবল না। আমার বেশ কিছু জার্মান বন্ধুদের কাছে এ জগতের সবচেয়ে অর্থহীন ব্যপার হলো এই ফুটবল ফ্যানদের উন্মাদনা। একবার এক জার্মান বন্ধুর সাথে সারা রাত একটানা বারো ঘন্টার বেশি জব করে আমি যখন বিছানায় এসে শুয়েছি, সেই বন্ধুকে সরাসরি সেখান থেকে শালকের ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে চলে যেতে দেখেছি। টবিয়াস ঠিক এরকমই একজন লেভারকুসেন ফ্যান।
গত পাঁচ বছরে নানা বিষয় নিয়ে কথা হলেও টবিয়াসের সাথে আমার বেশিরভাগই ফুটবল নিয়েই কথা হয়। টবিয়াসের ফুটবল জ্ঞান অবিশ্বাস্য রকম গভীর। জার্মান ফুটবলের যতো খুটিনাটি আর নারি-নক্ষত্র সব তার জানা। চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ, বুন্দেস লিগা আর জার্মান কাপ ডিএফবি পোকাল থেকে শুরু করে জার্মান ফোর্থ ডিভিশন পর্যন্ত কোন ক্লাবের কি অবস্থা বা কোন প্লেয়ার কি করছে সবই যেন টবিয়াসের নখদর্পনে। সেই সাথে জার্মান আর ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের ইতিহাস তো আছেই। কোন ক্লাব কবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো, কবে রেলিগেটেড হয়েছিলো, ম্যারাডোনা কবে জার্মানিতে খেলতে এসেছিলো কোন কিছুই অজানা নেই তার।
জার্মানিতে তো সবাই হয় বায়ার্ন মিউনিখ, নয়তো বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের ফ্যান। এই রুহর রিজিউনে আর পুরো জার্মানিতে শালকের ফ্যানও তো কম না। যেখানে এফসি কোলোনের মতো ক্লাবও দুবার বুন্দেসলিগা জিতেছে সেখানে ইতিহাসে কখনোই বড় কিছু না জেতা লেভারকুসেনের তুমি এতো বড় ফ্যান কিভাবে? পাঁচ বছর আগে যখন এ প্রশ্ন করেছিলাম জবাবে টবিয়াস আমাকে বলেছিলো " আমি তো কোনো এয়ারফলগস ফ্যান না। আমি ট্রু ফ্যান।"
'এয়ারফল্গসফ্যান' এই কথাটা জার্মান ফুটবলে অনেক বেশি প্রচলিত। যার ইংরেজি অনুবাদ হয় সাকসেস ফ্যান। বড় বড় ক্লাবের বেশিরভাগ ফ্যানরাই আসলেই এয়ারফল্গসফ্যান। যে ক্লাব যতো বেশি সফল তাদের সুখের সময়ের ততো বেশি ফ্যান। সত্যিকারের ফুটবল ফ্যান হলো টবিয়াসের মতো ফ্যানরা। ক্লাবের জন্য ফ্যানদের ডেডিকেশন কেমন হয় তা এই ছেলেকে দেখে আমি কিছুটা বুঝতে পেরেছি৷ সারা বছর স্টেডিয়ামে বসে নিজের ক্লাবের ম্যাচ দেখতে এ ছেলে জার্মানির এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়ায়। এ সিজনের ইউরোপা লিগে লেভারকুসেনের এওয়ে ম্যাচ দেখে সারারাত গাড়ি চালিয়ে বেলজিয়াম থেকে জার্মানি এসে আবার দুপুরে কাজে যোগ দিয়েছে। এরকম ফুটবল ফ্যানরা আছে বলেই এখনো সব ফুটবল ক্লাবের ফিফটি পার্সেন্ট মালিকানা আর কর্তৃত্ব সাংগঠনিকভাবে ফ্যানদের হাতে রাখতে জার্মান ফুটবলে বলবত আছে এখনো ফিফটি প্লাস ওয়ান রুল।
একশো কুড়ি বছরের ক্লাবের ইতিহাসে কখনো সেরকম কিছু না জিতেও লেভারকুসেনের প্রতি টবিয়াসের এরকম সমর্থন। সিজনটা কেমন যাচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে টবিয়াসের উত্তর প্রতিটা ম্যাচই যেন স্বপ্নের মতো। এইতো কিছুদিন আগে বুন্দেসলিগায় বায়ার্নের সাথে লেভারকুসেনের পয়েন্টের ব্যবধান যখন দশ তখন টবিয়াসকে বলেছিলাম বুন্দেসলিগা জয়ে অগ্রিম অভিনন্দন। জবাবে টবিয়াস বলেছিলো - "না। এখনো বলা যাচ্ছে না। অনেক কিছুই হতে পারে। আমি কোনো কিছু জিংক্স করতে চাই না।"
টবিয়াসদের একশো বিশ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বায়ার্ন মিউনিখের বারো বছর পর রাজত্ব শেষ করে বায়ার লেভারকুসেন আজ পাঁচ ম্যাচ হাতে রেখেই বুন্দেসলিগার শিরোপা জিতেছে। জাবি আলোনসোর হাত ধরে এখনো পর্যন্ত ইউরোপের টপ ফাইভ লিগের একমাত্র অপরাজিত দল লেভারকুসেনের জার্মান কাপ জেতাও অনেকটা সময়ের ব্যপার এখন। আছে ইউরোপা লিগ জিতে ট্রেবল জয়ের সমূহ সম্ভাবনাও।
এরকম ট্রেবল জয়ের সম্ভাবনা লেভারকুসেন অবশ্য আরো একবার জাগিয়েছিলো ২০০১/০২ সিজনে। টবিয়াসের মুখে অসংখ্যবার শুনেছি বাইশ বছর আগের সেই লেভারকুসেন ট্র্যাজেডির কথা। মাইকেল বালাকের অপ্রতিরোধ্য লেভারকুসেন সেবার এপ্রিল মাসের শেষে বুন্দেস লিগা, জার্মান কাপ আর চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার নিশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে ছিলো। বুন্দেসলিগায় তিন ম্যাচ বাকি থাকতে সেবার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডর্টমুন্ডের থেকে পাঁচ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলো লেভারকুসেন। জার্মান কাপের ফাইনালে প্রতিপক্ষ অফ ফর্মে থাকা শালকে। ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় থাকা লেভারকুসেন ফ্যানদের হতাশ করে বুন্দেসলিগায় নিজেদের পরের দুই ম্যাচে টেবিলের নিচের সারির দল ব্রেমেন আর রেলিগেশন জোনে থাকা নুরেনবার্গের সাথে হেরে ডর্টমুন্ডের কাছে খোয়া গেলো প্রথমবার বুন্দেসলিগা জয়ের সুযোগ। পরের সপ্তায় প্রথন হাফে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শালকের কাছে জার্মান কাপের ফাইনালে ৪-২ গোলে পরাজয়।
তবে লেভারকুসেন ফ্যানদের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তখন বাকি। গ্লাসগোতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে কোনঠাসা বানিয়ে যখন সমানতালে লড়ে যাচ্ছিলো লেভারকুসেন তখনই জিনেদিন জিদানের অবিশ্বাস্য ভলিতে করা সেই গোলে আবারো স্বপ্নভঙ্গ।
সে বছর কোরিয়া-জাপানে অনুষ্ঠিত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে মাইকেল বালাকসহ দুর্দান্ত এই লেভারকুসেন টিমের পাঁচ জন প্লেয়ার জার্মান ন্যাশনাল টিমের হয়ে খেলেছিলো। ফলাফল ব্রাজিলের কাছে ফাইনালে হেরে রানারআপ।
ইতিহাস শুধু প্রথমদেরই মনে রাখে, দ্বিতীয়দের না। এ কথা লেভারকুসেন ফ্যানদের চেয়ে ভালো বোধহয় আর কেউ বেশি জানে না। 'এতো কাছে অথচ কতো দূরে' অনূভুতি হওয়া হৃদয়ভাঙ্গা সে সিজন শেষে লেভারকুসেন ফ্যানদের কাটা গায়ে নুনের ছিটা হয়ে ক্লাবের সেরা প্লেয়ার আর কিংবদন্তি বালাক লেভারকুসেন ছেড়ে নাম লেখান বায়ার্ন মিউনিখে।
লেভারকুসেন ফ্যানদের সেই দুঃস্বপ্নের ২০০১-০২ সিজনের দুঃখ ভোলাতেই বোধহয় জাবি আলোনসো আর এই ২০২৩-২৪ সিজনের আগমন। লেভারকুসেনের ইতিহাস সৃষ্টি করার প্রথম ধাপ সম্পন্ন হওয়ায় বন্ধু টবিয়াসের জন্য সত্যি আমি অনেক আনন্দিত। বায়ারিনা স্টেডিয়াম থেকে তাদের বাধভাঙ্গা ফুর্তি আর উজ্জাপনের সেলফি আর ভিডিও টবিয়াস অলরেডি আমার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছে। আমি মন থেকে কামনা করি যেন লেভারকুসেন এবার ট্রেবল জিতে লাখো-কোটি এয়ারফল্গসফ্যানদের ভীড়ে টবিয়াসেদের মতো ট্রু ফুটবল ফ্যানদের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলে।
বুখোম, জার্মানি
১৪ এপ্রিল ২০২৪
#পান্থজনের_কচড়া
27/01/2024
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর লাইব্রেরি তথা বুকশপ বলা হয় পোর্তোর এই লিভ্রেরিয়া লেলোকে। পোর্তোতে কাজ করার সুবাধে এই বুকশপে নিয়মিত যাতায়াত ছিলো এক ব্রিটিশ শিক্ষিকার। এই বুকশপের ডিজাইন আর বিশালতায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি পোর্তোর এক রেস্টুরেন্টে বসে লেখা শুরু করেন এক উপন্যাস। সেই ব্রিটিশ শিক্ষিকার নাম জে কে রাওলিং আর তাঁর লেখা সেই উপন্যাস আজ পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস সিরিজ যার নাম 'হ্যারি পটার।'
লিভ্রেরিয়া লেলো
পোর্তো, পর্তুগাল
01/11/2023
সিন্ডারেলার হারানো জুতোটা অবশেষে খুঁজে পেলাম রুপকথার মতোই জার্মানির ছোট্ট সুন্দর শহর মন্টাবাউর এসে। মুগ্ধতা নিয়ে বিশাল আকৃতির এই জুতায় জার্মান ভাষায় লেখা নানা কথাগুলো পড়ছিলাম। তার মধ্যে যে কথাটি সবচেয়ে ভাবিয়েছে তার বাংলা অনুবাদটা হয় অনেকটা এরকম-
"পায়ের জোরে নয়, আমরা বরঞ্চ সামনে এগিয়ে যাই আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনার কারণে।"
11/09/2023
আপনার ছবি কে তুলে দেয়?
#পান্থজনের_কড়চা
আমার ট্রিপগুলো সাধারণত সলো ট্রিপ হয় বা একা একাই বেশিরভাগ ঘুরতে যাই একথা বলার পর যে প্রশ্নটি আমাকে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করা হয় তা হলো- "তাহলে আপনার ছবি তুলে দেয় কে?"
সলো ট্রিপের শত চ্যালেঞ্জ আর হাজার প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে আমাদের মাথায় প্রথম চলে আসে ছবি তুলে দেয়ার লোকের প্রসঙ্গটি। কারণ আমরা যে বাঙ্গালি। ট্রিপে গিয়ে ছবি তোলার জন্য আমাদের অবশ্যই অন্তত একজন লোক লাগবেই। তা না হলে কিসের ট্যুর? ট্যুরে গিয়ে নানা স্পটে নানা ঢং এ যদি ছবি তুলে সোস্যাল মিডিয়াতে না জানান দিতে পারি তাহলে এই ট্যুর দিয়ে লাভ কি? আজ থেকে সাতশো বছর আগে সোস্যাল মিডয়ার কোনো বালাই ছিলো না বলেই হয়তো সলো ট্রিপে বেড়িয়ে অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে এসেছিলেন মরক্কোর এক তরুণ। আসলে সোস্যাল মিডিয়া কেন, ক্যামেরারই কোনো অস্তিত্ব না থাকার পরো তাহলে কিসের জন্য এতোকিছু করেছিলেন ইবনে বতুতা? আধুনিক যুগের ফেসবুকার আর ইন্সটাগ্রামারদের কাছে তাঁর ট্রিপ তো কোনো ট্রিপের মর্যাদাই পাবে না। আহা রে!
এখন আপনি আমাকে বলতেই পারেন- এতো যে ছবি তোলা আর সোস্যাল মিডিয়া নিয়ে চটাং চটাং কথা বলছেন, নিজে তো ট্রিপে গিয়ে প্লেনে উঠার চেকিং এর ছবি থেকে শুরু করে কি খাচ্ছেন আর কোথায় ঘুমাচ্ছেন তার ছবিও প্রতি মুহূর্তে সোস্যাল মিডিয়ার আপলোড দেয়া বাকি রাখেন না। জবাবে বলবো- ভাইরে। ঠিক ধরেছেন। আমি তো কোনো সাধু পুরুষ না। আমিও আপনার মতোই সোস্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা একজন এভারেজ বাঙ্গালি।
আমার এক ইন্ডিয়ান বান্ধবী একবার বলেছিলো বাংলাদেশিদের মতো নার্সিসিস্ট লোকজন নাকি সে আর দ্বিতীয়টি দেখেনি। তাঁর কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করার মতো যথেষ্ট কোনো যুক্তি আমি তখন খুঁজে পাইনি। বরঞ্চ দিনদিন তাঁর এই কথার যথার্থতা যেন আমার কাছে আরো বেশি করে জোড়ালো হচ্ছে। আমরা নার্সিসিস্ট বা আত্মপ্রেমি জাতি বলেই ঘুরতে যাওয়ার আগে কোথায় থাকবো, কি দেখবো তা ভাবার আগে আমাদের ছবি তুলে দেয়ার লোক খুঁজি।
সুইজারল্যান্ডের ইন্টারলাকেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট হার্ডার কুল্ম নামের এক পাহাড়। এ পাহাড়ে সবাই উঠে মূলত দুপাশের লেক থুন আর লেক ব্রিঞ্জের মনোমুগ্ধকর ভিউ আর সামনে টপ অব ইউরোপ খ্যাত ইয়ংফ্রাউ পর্বতসহ সুইস আল্পসের আচানক দৃশ্য দেখার জন্য। তবে হার্ডার কুল্ম পাহাড়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট এই পাহাড়ের ক্লিফে কৃত্রিমভাবে বানানো ত্রিকোণাকার এক ভিউ পয়েন্ট যেখানে দাঁড়িয়ে পিছনের আর আশেপাশের এই ভিউ নিয়ে ছবি না তুললে পুরো ইন্টারলাকেন ট্যুরই বৃথা। হাজার হাজার পর্যটকের বহু আকাঙ্খিত যে ইন্সটাগ্রাম স্পট সেখানে কি আর বললেই ছবি তুলার জন্য দাঁড়িয়ে পড়া যায়? এ জন্য দাঁড়াতে হয় লম্বা লাইনে। এটা অবশ্য ইউরোপের সব ছবি তোলার হটস্পটের কমন প্রসিডিওর। লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে ছবি তোলা। তো আত্মপ্রেমি এক বাংলাদেশি হিসাবে সেই ছবি তোলার লাইনে লম্বা সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় ক্ষুধার্ত হয়ে উঠা আমি ক্ষানিকক্ষণের জন্য নিজের খোমার ছবি তোলার বাসনা থেকে বিরতি নিয়ে পাহাড়ের পিছনের দিকে নিরিবিলি এক জায়গায় গিয়ে কাঁধের ব্যাগ থেকে হালকা খাবার বের করে যেই খেতে যাবো তখনি পাশ থেকে এক বিশাল কুকুরের ঘেউঘেউ আওয়াজ। গলায় লিশ দিয়ে কোথাও বাঁধা কুকুর মশাই যে এই হার্ডার কুল্মে বেড়াতে আসা কোনো পর্যটকের শখের পোষা জন্তু তা বুঝতে আর বাকি রইলো না। শিকলে বাঁধা হলেও আমার হাতের খাবার দেখেই কিনা এই শখের কুকুর আমাকে যে বিড়ম্বনায় ফেললো তা নতুন বুট জুতা নিয়ে নতুনদার পড়া সেই কুকুর বিড়ম্বনার যে বোধকরি কোনো দিক দিয়ে কম না। কুকুরের উত্তেজনা আর ঘেউঘেউ ক্রমশ বাড়ার সাথে সাথে আত্মপ্রেমি আমি যখন নিজের আত্মসংবরণ নিয়ে শঙ্কিত, তখনই পাশ থেকে কেউ ইংরেজিতে বললো- "ওর চোখের দিকে তাকিও না। দেখবে আপনা আপনিই থেমে যাবে।"
ইন্টারলাকেনের এই পাহাড়ে সবাই যেখানে আমার মতো ছবি তোলার লাইনে দাঁড়িয়ে সেখানে দেখলাম সুদর্শন এক ইন্ডিয়ান যুবক হার্ডার কুল্মের পিছনের দিকের এই নির্জন স্থানে ঘাসের মধ্যে শুয়ে আছে। হাতে তাঁর বিয়ায়ের বোতল। আমি অবাক হয়ে বললাম- "তুমি এখানে কি করছো? সবাই তো সামনের ঐদিকে।" বিয়ারের বোতলে চুমুক দিতে দিতে সে যুবক যে উত্তর দিলো তাতে আমার নিজের আত্মপ্রেম যেন আরো বেশি করে ধরা দিলো- "আমার বন্ধুরা সামনের দিকে আছে। আমি এখানে উপভোগ করছি। এ পাশের ভিউটাও মন্দ না। কিন্তু ছবি তোলার স্পট নেই দেখে এদিকে কেউ সেরকম একটা আসে না।"
তারপর ওই যুবকের সাথে নানা গোশগল্প আর হাল্কা লাঞ্চ দিয়ে পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে নিজের খোমার ক্ষুধা মিটাতে যখন আবার হার্ডার কুল্মের সেই ছবি তোলা লাইনে দাঁড়াতে ফিরে যাচ্ছি তখন আমার মনে একটাই প্রশ্ন- আমি কি আসলেই উপভোগ করার জন্য ভ্রমণে এসেছি না ফটো তোলার জন্য। এই যে ভ্রমণ করা মানে যে শুধু সুন্দর সুন্দর স্পটে ছবি তুলা এই জিনিসটা আমি সবচেয়ে বেশি আমাদের বাংলাদেশিদের মধ্যেই দেখেছি। শুধু মনমতো ছবি তোলা হয়নি দেখে আরো বেশি ছবি তুলতে হবে এই কারণে অনেক বাংলাদেশি গ্রুপ ট্যুরে গিয়ে বেশ কয়েকবার শেষ বাস বা ট্রেইন মিস করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে আমার। কিছু করার নেই। প্রয়োজনে দশগুণ টাকা খরচ করে ট্যাক্সি ভাড়া করে যাবো তবু স্পটে মনমতো একখানা খোমার ফটো আমাদের লাগবেই। তা না হলে এই ট্যুরের অর্থ কি? মানে কি?
আমরা বাংলাদেশিরা একটা দর্শনীয় স্থানে গিয়ে আগে খুঁজি কোন এংগেল থেকে ছবি নিলে ভালো হবে। অথচ বেশির ভাগ ইউরোপিয়ান আর আমেরিকান ট্যুরিস্টদের দেখি একটা জায়গায় গিয়ে চুপচাপ বসে দুচোখ ভরে সেই জায়গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনুভব করতে। ঘন্টার পর ঘন্টা সে জায়গাটা ফিল করার পর ফিরে যাওয়ার সময় ইচ্ছা হলে দুই একটা ছবি নেয় তারা। সেটিও আবার গ্রুপ ফটো। সিংগেল কোনো ফটো না। ইন্সটাগ্রাম আর টিকটক মডেল হলে অবশ্য ভিন্ন কথা। পৃথিবীর সব জায়গা আর সব দেশের ইন্সটাগ্রাম মডেলরা আবার ছবি তোলা আর তোলানোতে একদম প্রফেশনাল লেভেলের এক্সপার্ট। হেলসিংকিতে গিয়ে পরিচিত হওয়া এক ফিনিশ বন্ধু কৌতুক করে বলছিলো- "কয়েক মাস ফটোগ্রাফি কোর্স করেও আমি ফটোগ্রাফির কিছুই শিখতে পারলাম না। আর আমার গার্লফ্রেন্ড শুধু ইন্সটাগ্রামে ফটো দিতে দিতে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদেরো ছাড়িয়ে গেছে আজকাল।"
ইন্সটাগ্রাম মডেল এসব তরুণীদের কথা বাদ দিলে ইউরোপ, আমেরিকা আর পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের সবচেয়ে কম ব্যাস্ত হতে দেখেছি ফটো তোলা নিয়ে। রোমের কলোসিয়ামের গিয়ে হাজার বছরের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে তারা যখন বলে ওয়াও, আমরা হয়তো তখন কলোসিয়াম কোন পাশ থেকে ছবি ভালো আসবে তার অনুসন্ধানে ব্যাস্ত। বিষয়টা যখন ভাবি তখন নিজের কাছেই নিজেকে খুব লেইম লাগে। এইতো সেদিন বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় গিয়ে যখন ছবি তুলছিলাম পিছন থেকে এক আইরিশ ভদ্রলোক বললো- "এটাই আজকাল তোমাদের ট্যুরিস্টি থিং।" আমার সাথে একই হোটেলে ওঠা এ ভদ্রলোকের বয়স সত্তুরের কম হবে বলে মনে হয় না। এই বয়সে তিনি ওয়ার্ল্ড ট্যুরে বের হয়েছেন। বুলগেরিয়া থেকে তুর্কি হয়ে যাবেন ইন্ডিয়াতে, এরপর নেপালের হিমালয়ে। সলো ট্রিপে। এই বয়সেও একা একা। আমিও সলো ট্রিপে বের হয়েছি। তবে হয়তো শুধু ফটো তুলতে। আর সেই আইরিশ বৃদ্ধ বের হয়েছেন সত্যিকারের ট্রিপে পৃথিবীটা কে শুধু দুচোখ দিয়ে দেখতে।
আমার খুব প্রিয় একটা চাইনিজ প্রবাদ হলো- "হাজার বার শোনার চেয়ে একবার দুচোখে দেখা ভালো।" আমি তো নিজেকে মনে মনে সব সময় এই কথা বলেই অনুপ্রাণিত করি যে এই সুন্দর পৃথিবীটা দেখার জন্যই আমি ভ্রমণ করি। হোক সেটা কোনো ম্যাপ অথবা হঠাৎ দেখা হওয়া কোনো নতুন দেশের বন্ধু। আমি যেন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলতে পারি- "হ্যাঁ। আমি তো ওখানে গিয়েছিলাম তোমার দেশে। দুচোখে দেখে এসেছি তোমার দেশের অপার বিস্ময়।" চরম নার্সিসিস্ট এক বাংলদেশি বলেই হয়তো আমার বিবেক আমার এই মোটিভেশানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে- "না। তুই তো নতুন নতুন দেশে যাস ইন্সটাগ্রাম আর ফেসবুকে ফটো আপলোডের জন্য। দুচোখ দিয়ে পৃথিবী দেখার জন্য না।"
ধূমপায়ীরা মুখে সিগারেট গুজে এটাই আমার শেষ সিগারেট বলার পরো একজীবনেও যেরকম কখনোই শেষ সিগারেটের সন্ধান পায় না, সেরকমই কখনো পারবো না জেনেও আমিও স্বপ্ন দেখি কোনো একটা ট্যুরে গিয়ে আমিও কোনো ফটো আর ভিডিও নিবো না। ক্যামেরার লেন্সে নয় শুধু দুচোখের মনি দিয়ে উপভোগ করবো এ পৃথিবীর সৌন্দর্য। নার্সিসিস্ট এক বাংলাদেশি ট্রাভেলার থেকে আমিও হবো এক সত্যিকারের ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার।
এবার রোমানিয়ার ট্রান্সিলভেনিয়াতে গিয়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে আমাকে সত্যিকারের ট্রাভেলার হতে হয়েছে। ফোনের মেমোরি ফুল হয়ে যাওয়ায় পকেটে ফোন ঢুকিয়ে দুচোখ দিয়ে দেখেছি কার্পেথিয়ান আল্পসের কোল ঘেষে শত শত রাঙ্গা বাড়িঘর দিয়ে সাজানো ট্রান্সিলভেনিয়ার রুপকথার মতো শহরগুলো। পুরো রোমানিয়া ট্রিপে ওই মুহূর্তগুলোই যেন আমার কাছে হাইলাইটস হয়ে আছে।
বাই দ্য ওয়ে- যে প্রশ্ন দিয়ে এ লেখা শুরু করেছিলাম তার উত্তর না দিয়েই মাঝে কতো কথা বলা হয়ে গেলো। এজন্যই আমি লিখি না। এতো গল্প জমা হয়ে আছে। লিখতে বসলে সব যেন বানের জলের মতো কিবোর্ডের ডগায় চলে আসে। যে প্রশ্নের জন্য আমরা বাংলাদেশিরা সলো ট্রিপে যাই না তা হলো আমাদের ছবি কে তুলে দিবে।
আমি সলো ট্রিপে যাওয়ার পরো আমার এতো এতো ছবি কে তুলে দেয়? কিছুদিন আগের বাল্টিক আর ফিনল্যান্ডের ট্রিপের পর উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের একটা কোওট উল্লেখ করেছিলাম- "There are no strangers here; Only friends you haven’t yet met."
হোক সে কোনো লোকাল, ইন্সটাগ্রাম মডেল, আমার মতো নার্সিসিস্ট ট্রাভেলার কিংবা ফটো না তোলা রিয়েল ট্রাভেলার, মানুষের সাথে মিশতে পারলে বুঝা যায় ইয়েটসের এ কথাটা কতোটা সত্যি। পুরো পৃথিবী যখন আপনার বন্ধু হয়ে যাবে তখন ছবি তুলে দেয়ার মানুষ পেতে কি খুব একটা বেগ পেতে হবে?
বুখোম, জার্মানি
১১ সেপ্টেম্বর ২০২২
08/06/2023
ইউরোপে আমার আর কোন ফুটবল দল রইলো না।
ছবিটা সাড়ে চার বছর আগের। ক্যাম্প ন্যু তে বার্সেলোনা বনাম এইবারের লা লিগা ম্যাচে। আমার চোখের সামনে মেসি সেদিন তাঁর ঐতিহাসিক ৪০০তম লা লিগা গোল করেছিলেন। আর গ্যালারিতে হাজার দর্শকদের সাথে আমিও গেয়েছিলাম- "মেসি, মেসি, মেসি।"
একজন ফুটবল ফ্যান হিসাবে সেটাই সম্ভবত আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত। অনেক আশা ছিলো আবারো সেরকম কোনো মুহূর্ত ফিরে পাবো। ক্যাম্প ন্যুতে বসে আবারো বিশ্বকাপ জয়ী মেসির খেলা দেখবো।
গত দুবছর ধরে পিএসজির মতো একটা দলের খেলা দেখার নামে মানসিক টর্চার সহ্য করে গেছি শুধু মেসিকে ভালোবাসি বলে। মেসি পিএসজি ছাড়ায় অনেক আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু তখনো বুঝিনি ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে মেসিকে আর দেখতে পারবো না। পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তেই ফুটবল সবচেয়ে জনপ্রিয় আর আবেগময় খেলা হলেও দিনের শেষে ফুটবল বলতে মানুষ ইউরোপের ফুটবলকেই বুঝে।
মেসির জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মাঝেই তবু ন্যু ক্যাম্পে মেসি মেসি বলে চিৎকার করতে থাকা দর্শকদের দেখে সান্তনা খুঁজি। জীবনে তবু তো একটা আফসোস রইলো না। ইতিহাসের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিতে বুদ হয়ে থাকা ন্যু ক্যাম্পের হাজার হাজার মানুষদের মিছিলে একদিন আমিও যে ছিলাম!
আড়াইশো বছরের পুরোনো যে ফোয়ারার পানি পান করলেই ফিরে আসতে হবে এখানে. Sarajevo, Bosnia and Herzegovina- Bangla Travel Vlog.
জাদুর জলপরী সাইরেন আর ইউলিসিসের নগরী ইটালির সরেন্টো।
🇺🇸 নিউইয়র্কে গিয়ে কাল হো না হোর স্মৃতি খুঁজে ফেরা। আমেরিকার যে জায়গায় গিয়ে ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ।
Klicken Sie hier, um Ihren Gesponserten Eintrag zu erhalten.
Kategorie
Adresse
Dortmund