Neel Mahmud
❝NEEL MAHMUD❞ a famous story writer.
❝Love is internal power of a man❞
ফেসবুক স্কল করতে করতে থেমে গেলাম। কিছুক্ষনের জন্য মধ্যরাতে মোবাইলের স্কিনের আলোটা যেন আমার চোখে বিশাল একটা আলো ফেলল। জ্বলজ্বল করছে, শীর্ণ জীর্ণ একটা ছবি।
আমার এই অপলক তাকিয়ে থাকা সুমনার চোখ এড়ায় নি। এক পাশ হয়ে শুয়ে সে মেয়েকে ফিডিং করাচ্ছিল। মেয়ের চোখ সবে লেগে এসেছে। এক হাতে সে মেয়েকে নিয়েছে অন্য হাতে তার মোবাইল।
আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
-কি রে এইভাবে তাকিয়ে আছো কেন মোবাইলের দিকে? আবার ঘামছো ও?কোন প্রাক্তনের ছবি সামনে এলো নাকি?
আমি নিস্পৃহ চোখ দুটো কবে সিক্ত হয়ে উঠেছে তা আমার খেয়াল হয় নি।
সুমনার দিকে তাকাতে তার দুষ্টমি ভরা চেহেরাটা হঠাৎ উৎসুক হয়ে গেল। মেয়েকে হাত থেকে বিছানায় রেখে আমার দিকে এগিয়ে এলো।
গালে আলতো হাত রেখে বলল,
- এই রণ। কি হয়েছে?
সে মোবাইলের তাকিয়ে দেখল, তেমন কিছুই যেন তার চোখে পড়ে নি এমন ভাবে আবার আমার দিকে তাকালো।
যেন তার চোখ জানতে চায়ছে, কি দেখলাম আমি?
আমি তাড়াতাড়ি মোবাইল টা পাশে রেখে শুয়ে পড়লাম।
গলাটা ধরে এসেছে। তারপর ও একটা কাশি দিয়ে বললাম,
-কিছু না, ঘুমিয়ে পড়।
আমার এই টোন টা সুমনার অচেনা। তাই সে কথা বাড়ালো না।
ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। তারপর লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো। একটু পরে ও ভারী নিশ্বাস শুনতে পেলাম। মেয়ের পেটের উপর আলতো করে হাত রাখতেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। সারাদিন ক্লান্ত থাকে ছোট বেবি নিয়ে।
আমার চোখ আবার খুলে গেল। কোণা বেয়ে গরম চোখের পানি কানে ঢুকে পড়ছে। আমি মুছার কোন চেষ্টা করলাম না।
প্রায় এক যুগ পর তাকে দেখলাম। এক ঝলকেই যেন পুরো আজাদপাড়ার জীবন টা সামনে চলে আসছে।
সে যখন আমাদের জীবনে এসেছিল তখন আমি সদ্য সেভেনে উঠেছি। ভাইয়া কলেজে পা দিয়েছিল। রুমানা আপু ক্লাস নাইনে। আর সুমি মাত্র হাটা শিখছে।
আমরা ছোট বেলা থেকে যেমন খুশি তেমন আবদারে বড় না হলেও অভাব আমাদের ছিলো না। দুবেলা ভাত অনায়সে খেয়েছি। ধরা যায় আমরা উচ্চ মধ্যবিত্ত ছিলাম।
সেটা আরো পাকাপোক্ত হলো যেদিন সে এসেছিল আমাদের ঘরে।
নিজেই হাসলাম, যেন আমি কোন প্রিয় মানুষের কথা ভাবছি।
প্রিয় মানুষ?
শব্দ টা নিজেই আওড়ারালাম, কোন জড় বস্তুও যেন প্রিয় মানুষের জায়গা নিতে পারে সেদিন ও আমরা বুঝি নি। যখন সন্ধ্যায় সবাই পড়তে বসেছিলাম আমাদের লম্বা বারান্দায়। ঘরের সামনে বেলি গাছ লাগিয়েছিল রুমানা আপু। সবে বেলি আসা শুরু হয়েছে। কোথায় যেন এক নাগারে ঝি ঝি ডাকে। কিন্তু ভ্যাপসা গরম কারেন্ট চলে গেসে। তীব্র আলো দেওয়া চার্জলাইট টা জ্বলছে, কিছু পোকা এসে জড়ো হয়। কিছুক্ষন পর এইগুলো ডানা ভেঙে পড়ে।
বাবা প্রথম ডাক দিলো,
- এই রণ, এই রানা, এই রুমানা দেখ।
খোলা বই ওভাবেই ফেলে আমরা ছুটলাম। আমাদের কাঠের দরজাটা দিয়ে বাবা ঢুকল তার সদ্য কেন বাইক টা নিয়ে।
বাবা নিয়ে ঢুকল তার প্রথম আর শেষ বাইক টা।
লাল আর কালো রং এর ছিল। প্রথমে লাফিয়ে উঠেছিলাম আমি।
সবে সিনেমায় নায়ক দের বাইক স্টান দেখা শুরু করেছিলাম।
অনেক খুশি হলাম। বাবার খুশি ছিল উপরে পড়ার মত।আমার খাটুনি ছাপ পড়ার বাবার চেহেরায় সেদিন হীরে বসানো আন্টির মতো জ্বলজ্বল করছিল চোখ গুলো। গাল গুলো লালচে হয়ে উঠেছিল। আমি জানি না। আমি বাবাকে এমন ভাবে খুশি হতে আর কখনো দেখেছি।
না আর দেখি নি। কখনো দেখি নি৷ হয়ত আমাদের কারো জম্মের সময় বাবার এমন চেহেরাটা ছিল। জানা নেই।
সেও ছিল বাবার আরেক সন্তান।
বাইক টা আসায় পুরো পাড়া,পুরো আত্মীয় স্বজনের মধ্যে আমাদের লেভেল যেন অনেক উপরে উঠে গেল। যেই আসুক ঘরে আগে বাইক দেখতে আসতো। হাত বুলাতো। পাড়ার ছেলেরা ভীড় জমাতো।
বাবা সকালে যখন অফিসে বের হতো আমাদের মন খারাপ। বাইকের জন্য। বাবা ফিরলে,ভাইয়া নিয়ে বের হতো। জিদ করলে মাঝেমধ্যে আমিও উঠতাম মাঝেমধ্যে।
মোড়ের দোকানের সামনে দাঁড়ালে সবাই সমীহ চোখে তাকাতো।
মেয়েরাও আঁড় চোখে তাকাতো ভাইয়ার দিকে। আমিও খেয়াল করে একটা মুচকি হাসি দিতাম।
লং ড্রাইভ শব্দ গুলো তখন আমাদের কাছে অপরিচিত ছিল।
তবে মাঝেমধ্যে সন্ধ্যা নামার পর মা তার ন্যাপথলিন দিয়ে তুলে রাখা কাজ করা শাড়ি টা পড়তো। একটু ক্রিম মাখতো। পেছনে টেনে চুল বেঁধে একটা পাথরের ক্লিপ লাগাতো। একটা টিপ পরতো। আপুর ড্রায়ার খুলে সবচেয়ে হাল্কা লিপস্টিক টা লাগাতো৷ কি যে সুন্দর লাগতো মাকে।
তখন সন্তানদের সামনে মায়েদের রোমেন্স হতো না। মা ভীষণ রাগী গলায়, ব্যস্ত সুরে আমাদের বলে যেত, মা কোন দরকারি কাজে যাচ্ছে। এসে যেন দেখে সবার বাড়ির কাজ শেষ।
আমারা মাথা নাড়তাম৷ মা ভীষণ লজ্জিত মুখে বাবার পেছনে উঠে বসতো।
আমরা হাসতাম না। তবে কি একটা ঠান্ডা বাতাস যেন চোখে লাগতো। ওটা তে বেলি ফুলের সেই সুভাষ ও থাকতো।
বাবা বার বার বলে,
- ভালো করে ধরে বসো। পড়ে গেলে হাড্ডি-গুড্ডি ভাঙ্গবে। আমাকে ধরে বসো।
মায়ের মুখ লাল হয়ে উঠতো।
অস্থির গলায় বলে উঠতো,
-বেশ পারব।
গলা নামিয়ে বলতো,
-তোমার আর আক্কেল হবে না। বাচ্চাদের সামনে।
বাবা চুপ হয়ে যেত ভীষণ আস্তে আস্তে বাইক চালাতো৷ মোড় পাড় হলে মায়ের হাত বাবার কাঁধে উঠে যেত।
ঘুরে আসতো। আমরা জানতাম না। যখন জেনেছি, তখন কেউ বলে নি আমাদের। যখন বয়স হয়েছে তখন জেনে গেলাম আপনাআপনি।
ভীষণ লোডশেডিং হতো। অনেক সময় চার্জলাইট ও থাকতো না। তখন বাইকের লাইট জ্বালিয়ে বাইরে বসে সবাই ভাত খেতাম। যেন পিননিক চলে।
বাইকটাও মনে হতো হাসছে আমাদের কান্ড দেখে৷
বাইকের কোথায় ও কোন এক্সিডেন্ট হলে কষ্টটা ভীষণ লাগতো।
ভাইয়া একটা সাইড মিরর ভেঙে ফেলেছিল। বাবা ভাইয়াকে স্যান্ডেল দিয়ে কি মাইর দিয়েছিলো।
আমরা সবাই রেগে ছিলাম এমন কি মা ও।
যেন ঘরের সবচেয়ে আদরের দুলালীকে কেউ আঘাত করেছে।
প্রায় আট বছর ছিলো আমাদের সাথে বাইক টা। কত আত্মীয় স্বজনের কাজে লেগেছে। বাবার ভাইয়া আমি রাত দুপুরে ছুটেছি। কত কাজে অকাজে আমাদের ভুলে নিজে আঘাত সয়ে নিয়েছে সেই বাইক টা।
ভাইয়া আর কামিনী আপুর প্রেম টাও ধরা পড়েছিল বাইকের কারণে। ভাবী এখনো মাঝে মধ্যে বলে,
- তোমার ভাইয়া বাইক দেখিয়ে, বাইকে চড়িয়ে তখন আমাকে প্রেমে ফেলেছে আর কি।
মায়ের যখন ক্যান্সার তখন ভাবী যে সেবা মাকে করেছে আমরা অবাক হতাম। হয়ত বাইক টা না থাকলে এমন ভাবী আমরা পেতাম না।
বাইক টার শক্তি কমে আসছিল আজ এই সমস্যা তো কাল এই সমস্যা। এইটার ব্যয় যেন আলাদা একটা বাজেট।
শেষের দুইবছর আমিই ব্যবহার করেছি বাইক টা। চাকরি টা হয়েছে অনেক দূরে। বাইক ছিল বলেই চাকরি টা পাওয়া হয়েছিল।
যেন অন্তরের অন্তর একটা বন্ধু। কত স্মৃতি আছে। গাড়িটা মাঝেমধ্যে বন্ধ হয়ে যেত। তখন বন্ধুরা বলত।
-এই ভাঙ্গারী বিক্রি করে ভালো একটা বাইক নেয়।
আমি শুধু মুচকি হাসতাম। কিন্তু বুকে কি যেন ফুটতো। যেন কোন প্রিয় প্রেমিকা ছেড়ে দিতে বলছে কেউ।
বাবার হঠাৎ স্ট্রোক হয়ে মারা যাওয়া আর মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়াতে পুরো ঘর এলোমেলো হয়ে গেল। রানু আপুর বিয়ে হয়ে গেল৷ ভাইয়ার একা ইনকামে সব। আমার সামান্য কিছু ইনকাম তখনো।
তারপর ও বাইক টা বিক্রি করার কথা কেউ ভাবে নি।
কিন্তু মায়ের শেষ কেমোটার জন্য টানাটানি পড়ে গেল।
না চাইতেও সবাই যেন,
ভাবতেই গলাটা আটকে গেল। টানাটানির সংসারে তখন বাইক টা মস্ত বড় বিলাসিতা।
মাকে জানানো হয় নি। কিন্তু মা হসপিটালে থেকে বুঝেছিল। মা জিজ্ঞেস করেছিল,
-গাড়ি কোথায় রেখেছিস?
আমার না বলা উত্তর মা কি যেন বুঝলো। বলল-
-আমি তো মরেই যাব। গাড়িটাও হলেও তোর বাবার স্মৃতি -
মা শেষ করতে পারে নি।
মা আরো এক বছর বেঁচে ছিলেন। মায়ের রুমে ওয়ারড্রাবের উপর বাবার ছবির পাশে হেলমেট টা ছিলো অনেক গুলো দিন।
আজ অনেক গুলো বছর পর পুরানো সেই বাইক টা পুরানো জিনিস পত্র বিক্রির একটা গ্রুপে দেখলাম।
হয়ত একই মডেলের অনেক গাড়ি আছে। কিন্তু এইটা সেই গাড়ি। সেই বাইক। সে বাইকে বাবার ঘাম। বাবা মায়ের কিছু মূহুর্ত। ভাইয়া ভাবীর প্রেম। আমার দূরের সেই চাকরির সাথী। মায়ের শেষ কেমো। ভেঙ্গে যাওয়া সেই সাইড মিরর বাবার যত্নে লাগিয়েছিলো সুপার গ্লু দিয়ে। দাগ দেখা না যাওয়ার জন্য একটা লাল স্টিকার লাগানো হয়েছিল। সেটা এখনো আছে।
আমি কোথায় ও নিয়ে গেল হারিয়ে আসব সে ভয়ে সুমি সিটের পাশে নেইলপালিশ দিয়ে লিখে দিয়েছিল ''R''.
মোবাইল টা আবার হাতে নিলাম। পোস্ট দাতাকে নক করলাম। আমি এইটা নিতে চাই। যত দাম হোক।
দেখলাম সে সিন করে নি। ভাবলাম ঠিকানাটা দিলে সকালেই গিয়ে নিয়ে নিব।
ভাইয়ার বাংলো বাড়ি এখন।
আমার এপার্টমেন্ট আমাদের দুজনের জন্য দুইটা কার বর্তমানে। বাইক থাকে না সে গ্যারেজে।
রুমানা আপুর ও এখন বাচ্চাদের জন্য ও গাড়ি। সুমির এখনো বিয়ে হয় নি। চাকুরী তে মনোনিবেশ এখন। তার একটা গাড়িতে এখন লাগেই।
ভাবতে লাগলাম বাইক টা নিয়ে এসে সারপ্রাইজ দেওয়া যায়।
এখন রাত চার টা। সুমনা কে ডেকে তুললাম।
ওকে ডাকতেই ধরপড়িয়ে উঠে বসল সে,
-কি কি?
প্রথমেই মেয়েকে চেক করলো৷
- কি হয়েছে?
-কিছু না। কাল সবাইকে বাসায় দাওয়াত দিলে তোমার অসুবিধা হবে?
বেশ অবাক হয়ে বলল,
- আমার কি অসুবিধা হবে?
-না মানে, সব জোগাড় করা, রান্না বান্না একটা ব্যাপার আছে না?
-কেন? কি হয়েছে? কি উপলক্ষে? কিছু আছে কাল? কারো জম্মদিন?
-তেমন কিচ্ছু না। তবে ভীষণ স্পেশাল।
সুমনা অবাক হলেও তেমন কিছু আর জিজ্ঞেস করল না।
হাই তুলে আবার বিছানায় শুয়ে পড়তে পড়তে বলল,
- কাল সকালে ফোন দিবে আর কি। এখন সবাই ঘুমাচ্ছে।
-আচ্ছা।
বলে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম আসছে না।
মোবাইল হাতে নিয়ে আবার নক করলাম সে সেলার কে।
-ভাইয়া আপনার লোকেশন টা দিয়েন। কাল সকালে আসব।
মেসেজ ডেলিভার হয়েছে তবে সিন হচ্ছে না। হওয়ার কথাও না রাত চারটা বাজে।
সকাল ছয়টার দিকে চোখ লেগে এসেছিল একটু পরেই মেসেঞ্জারে টুং করে উঠল। নরমেলি সারাদিন এর্লাম বাজলেও ঘুম ভাঙ্গে না। মেয়ের কান্নাতেও ঘুম ভাঙ্গে না। সুমনা রাগ করে বলে,
-এমন মরার ঘুম কেমনে ঘুমাও?
কিন্তু আজ ঘুম ভেঙে গেল সামান্য মেসেজের শব্দে।
হ্যাঁ, সে সেলারেই রিপ্লে করেছে।
-সরি ভাইয়া এইটা তো আপনি নক দেওয়ার আগেই বুক হয়ে গেল। দশটার নিতে আসবে। দুঃখিত আমি ঘুমিয়ে পড়ার কারণে সেল পোস্ট টা ডিলিট করতে পারি নি।
যে একটা অনুভূতি নিয়ে পুরো জেগে ছিলাম। নরম তুলতুলে সে রাজহাঁসটা এতক্ষন সাঁতার কাটছিল। তার গলার কেউ যেন শক্ত চামড়ার জুতো দিয়ে পা চেপে ধরেছে। গোঁ গোঁ একটা শব্দ বের হয়ে আসছে। যার কোন শব্দ নেই।
দুচোখ বেয়ে আবার যেন গড়িয়ে পড়ছে মায়ের সে লাজুক চেহেরাটা আবেগ হয়ে।
আমি মেসেস দিলাম,
-প্লিজ এইটা আমি নিতে চাই।
-আমার কাছে আরো অনেক মডেলের নতুন পুরাতন গাড়ি আছে৷ আমি এইটা তো দিতে পারছি না।
-আমার এইটায় লাগবে। আপনার লোকেশন টা দেন আমি আসছি।
সে লোকেশন দিল। আবার বলল,
-ভাইয়া আমি ঝামেলায় পড়বো যে। দুজন কে কীভাবে দিই?
-একটু বলে দেখেন। দরকার হলে আমি বুঝাবো।
-আচ্ছা দেখি।
আমি আর দেরি না করে দ্রুত রেডি হয়ে বের হয়ে গেলাম। যে লোকেশন দিয়েছে তা গাড়িতে করে গেলেও তিন থেকে চার ঘন্টা লাগবে।
রেডি হয়েছি দেখে সুমনা বলল,
- এই ছুটির দিনে কই যাচ্ছো?
তাড়াতাড়ি করে বের হতে হতে বললাম,
- আমি কাজে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি আসব। তুমি সবাইকে আসতে বল।
-আরে শোন, আমি বলেছি। তবে ভাবী বলছিল আজ নাকি রিতুর জম্মদিন। ওরা ভেবেছিল কিছু করবে না। এখন সবাইকে যখন করব বলেছি ভাবী বলছিল ওখানে চলে যেতে।
-তাহলে ঠিক আছে। যাও। সবাই যেন থাকে। আমি সারপ্রাইজ নিয়ে আসছি বলো।
-কি সারপ্রাইজ?
-তুমি বুঝবে না।
আজ ড্রাইভার নেই। নিজেই ড্রাইভ করে বের হয়ে গেলাম।
মোবাইলে সেই সেলার ফোন দিচ্ছে। আমি ধরছি না। যদি সে বলে, দিতে পারবে না।
না, আমি কোন না শুনতে চাইছি না। সেখানে পৌঁছালে কিছু একটা করার সুযোগ থাকবে।
টানা তিন ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে পৌঁছালাম সেখানে।
আমাকে দেখে ছেলেটা বুঝতে পারলো, বলল,
-আমি ফোন দিচ্ছিলাম আপনাকে,না আসার -
সে কথাটা শেষ করার আগেই আমি বলে উঠলাম।
-বাইক টা কোথায়?
সে কেমন যেন চোখে বলল, আছে ভাই। তবেই এখনিই উনি নিতে আসবে।
-আপনি উনাকে অন্য গাড়ি দেন।
- ভাই ওটা বড় একটা কোম্পানি। ওরা পুরানো গাড়ি গুলো নিয়ে ভেঙে ফেলে-
আমার পুরানো ক্লায়েন্ট। কীভাবে যে মানা করি?
বুক টা আবার মোচড় দিয়ে উঠল।
- না না। প্লিজ।আমার এই গাড়ি টা লাগবে।
সে আমার কারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-পুরানো বাইকের জন্য এমন করছেন কেন?
আমার চোখের পানি এইবার ছল ছল করছে, এত দূর এসে কি হাত ছাড়া হয়ে যাবে?
অন্য জন ক্রেতাটাও চলে আসল, তাকে অনেক বুঝিয়ে বললাম,
-এইটা আমার বাবার শেষ স্মৃতি।
অনেক বলেন বুঝানোর পর বাইকটাকে দেখলাম।
কেমন যেন সিক্ত হয়ে গেল বুক টা। অনেক চেষ্টার পর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।
বাইক টা সামনে দাঁড়িয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলাম।
কাল থেকে মনে পড়া সব স্মৃতি যেন হুর হুর করে বের হয়ে আসছে।
সেলার ছেলেটা আমাকে ধরে বলল,
-ভাইয়া সামলান নিজেকে। কে নিয়ে যাবে এইটা? আপনি তো গাড়ি এনেছেন।।
-আমিই চালিয়ে নিয়ে যাব। গাড়িটা আমি রেখে যাচ্ছি আমার ড্রাইভার কে আমি পাঠিয়ে দেব।
বাইক টার উপরে উঠে বসতেই যেন ঝাকুনি দিয়ে উঠল।
ঝর ঝর করে ঝড়ে পড়ছে। খুব প্রিয় মানুষ কে বুকে লাগালে যে একটা প্রশান্তি অনুভূতি হয় তা যেন হতে লাগল।যেন জমানো কোন ক্ষতে মলম লাগালো কেউ,প্রথমে জ্বললো তারপর ঠান্ডা হতে শুরু করল৷
সুমনাকে ফোন দিলাম কোথায় ওরা। ও জানালো সে ভাইয়ার বাংলো তে আছে। সবাই ওয়েট করছে ওর জন্য।
সুমনা কে বললাম, আর দশ মিনিট পর সবাইকে নিচে আসতে বলো। ভাইয়া আপু আর সুমিকে।
-কেন?
- আসলে দেখবে।
বাইক টা চালিয়ে যখন ভাইয়ার বাংলোর গেইটে ঢুকলাম বুঝাতে পারব না কি ভালো লাগছিল।
ভাইয়া আপু প্রথমে বুঝত্র পারল না। আমি গিয়ে বাইক থামাতেই বলল,
- কি রে কেন আসতে বলেছিস?
ভেতর থেকে সুমি দৌড় দিল,
- আমাদের সেই বাইক টা?
কথাটায় ভাইয়া আর আপু চমকে উঠে তাকালো। তারা যেন বিশ্বাসেই করতে পারল না এমন চোখে তাকালো। ভাইয়াও চিন্তে পারলো।
ভাইয়ার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।
হাত নেড়ে বুঝাতে চায়ছে, আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম।
- হ্যাঁ আমাদের সেই লাল বাইক টা।
ভাইয়ার চোখে পানি আটকানোর বৃথা চেষ্টা চলছে কিন্তু পারছে না।
রাবেয়া আপু ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরেছে। উড়নার কোণা তখন ভিজে গিয়েছে। সুমির কান্নার শব্দে পরিবেশ টা ভারী হয়ে উঠেছে।
সবাই বের হয়ে এলো। বাচ্চারা বুঝতে পারছে না সবাই এইভাবে কাদঁছে কেন। কিন্তু ভাবী পরম যত্নে হাত বুলালো।
আমি নেমে ভাইয়ার হাতে চাবি দিলাম ভাইয়ার হাত থর থর করে কাঁপছে।
কেউ কোন কথা বলতে পারছে না। শুধু আমার নয় সবার মনেই এতগুলো বছর ধরে গেঁথে আছে আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের বিলাসিতার সেই লাল বাইক টা।
আমাদের লাল বাইকটা
দোলনা বড়ুয়া
-ভাইয়া, পাঞ্জাবীটা কত?
-আপা আপনার জন্য একদাম ৪২০০ টাকা।
-কেন? আমি কে? আমার জন্য দাম কম করবেন!!
-কি যে বলেন আপা। সবার কাছে সমান দাম চাই না।
-ঠিক দাম বলেন।
-আচ্ছা ৫০ টাকা কম দিয়েন।
-দাঁত ক্যালাইয়েন না। ৫০০ টাকায় দিবেন?
-এইটা কোন কথা বললেন আপা? আপনারে লাস্ট বলি। ২৬০০ টাকা দিয়েন। কাপড় দেখছেন? ১০ পিস আনছি কাল। এইটেই লাস্ট। ৩০০০ এর নিচে বেচি নাই একটাও। খাতা দেখেন বিশ্বাস না হলে। ২৫০০ তে কেনা। তার নিচে লসে যাবে।
-লস আপনার করতে হবে না। লাগবে না পাঞ্জাবি।
-আচ্ছা আপা ৮০০ দিয়েন।
-নাহ। ৫০০ ই বেশি বলে ফেলসি।
-আচ্ছা টাকা দেন। এই আবুল মালটা ব্যাগে ঢুকা। ব্যবসা রোজ ই করি। একদিন আপার জন্য ব্যবসা বাদ। আবার আইসেন।
কিছু কিছু মেয়ে দামাদামি করার ক্ষেত্রে এমন অস্বাভাবিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় 🫡🫡
~তাহ-মিনা~
08/06/2023
নারী - শেষ পর্ব
__________
অরন্য ভেবেছিল, সবার সাথে দেখা হতেই দীবার হাতে একটা রামচড় খাবে সে। কিন্তু দীবা অরন্যের দিকে একবার মুখ তুলে তাকায়। কিন্তু আর কোনো কথা না বলে মুখ সরিয়ে নেয়। বেলী বেগম অরন্যের সাথে কোনো কথাই বলেন না। তাদের অভিমান জমেছে। অরন্য বুঝতে পেরে নিজেও চুপ করে থাকে। অরন্য আগে আগে রফিক সাহেবের কেবিনের ভেতর ঢুকে যায়। সে চলে যাওয়ার তিরিশ সেকেন্ডের মাথায় অতসী করিডোরে ঢোকে। তাকে দেখামাত্র দীবা হনহন করে এগিয়ে আসে। ঝাঁঝালো গলায় বলে, 'এই মেয়ে। তোমাকে আমি কতটা সাপোর্ট করছি। আর তুমি এইভাবে আমার ভাইকে নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারলে? তুমি তো সত্যিকার অর্থে খারাপ মেয়ে। তোমাকে সাপোর্ট করাটাই ভুল ছিল আমার। তুমি আমাদের পরিবারটাকে একদম ধ্বংস করে দিছ। তোমার কারণে আজকে আমাদের সবার এই দশা।'
অতসী জবাব দেয়ার আগেই বেলী বেগম ক্রন্দনরত স্বরে বললেন, 'ওরে বলে লাভ কী? দোষ তো আমার ছেলের। আমার পেটটাই তো ভালো না। যদি আমার ছেলে আমাদের চিন্তা করতো, তাইলে ওর কথা শুনতো না। সে কী নিজের ভালো-মন্দ বুঝে না? সে কী বাচ্চা? শিশু?'
দীবা বলল, 'অরন্যের সাথে আমি আর কথা বলব না। আব্বুর এই অবস্থা দেখে ওকে ফোন দিছি। আর না.. ও কে আমি চিনিনা।' একটু থেমে অতসীর দিকে তাকিয়ে যোগ করে, 'ও ওর অতসী নিয়ে থাকুক।'
এতসব শুনে অতসীর রেগে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু অতসী রাগলো না। হাসিমুখে কঠিন করে বলল, 'আপনাদের এসব কথার জবাব দিতে মোটেও ইচ্ছে করছে না।' তারপর গটগট করে হেটে চলে এলো কেবিনে। দীবা রাগে ফুঁসে উঠে বলল, 'দেখছ মা.. দেখছ কতটা বেয়াদব!! এর থেকে প্রিয়া হাজারগুণে ভাল ছিল। এট লিস্ট, আমাদের সঙ্গে বেয়াদবি তো করতো না।'
বেলী বেগম জবাব দিলেন না। তার কান্নার বেগ বাড়তে লাগল।
অসুস্থ রফিক সাহেবকে দেখে অরন্যের প্রথমবারের মতো মনে হলো, সে ভুল করেছে। বিরাট বড় ভুল করেছে। এভাবে কাউকে না জানিয়ে বিদেশ চলে যাওয়া, আবার সেখানে গিয়ে যোগাযোগ না করাটা -- তার জীবনের সবচে বড় ভুল হয়ে আখ্যায়িত হয়ে থাকবে। কীভাবে পারলো সে! অরন্য নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর পেলো না। শুধু তার মনে হলো, তাকে পালটে ফেলার পেছনে অতসীর বিরাট বড় হাত আছে।
অরন্য ইতস্তত করে কাঁপা গলায় ডাকলো, 'বাবা..'
রফিক সাহেব তক্ষুনি চোখ মেললেন। তার চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। অরন্য ছুটে গিয়ে রফিক সাহেবের একটা হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। রফিক সাহেব খুশিতে প্রফুল্লিত হয়ে বললেন, 'ভাবছিলাম, মরনের আগে তোরে আর দেখে যেতে পারব না।'
অরন্য মেকী রাগ দেখায়, 'কীসব বলো বাবা! এসব মরন টরনের নাম মুখে আনবে না তো। প্লিজ!!'
রফিক সাহেব নিরস্ত্র গলা বললেন, 'অনেক বড় পাপ করেছি বাবা। সেই পাপের ফল আজ পাচ্ছি। আমার ব্যবসা বানিজ্য সব শেষ। আমার সংসার, পরিবার সেটাও শেষ। এখন শুধু আমি শেষ হওয়া বাকি। যেই পাপ আমি করেছি, সেটা সবাইকে বলে যেতে চাই। এতে যদি কবরের আজাব একটু কম হয়!'
অরন্য চোখ কপালে তুলে বলল, 'কীসের পাপ?'
'বলছি। তার আগে বাসায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর আমাকে। হাসপাতালে এতসব বলা যায় না।'
অরন্য আগামাথা কিছুই বুঝলো না। তবুও রফিক সাহেবের জোরাজুরিতে তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হলো। সঙ্গে একজন নার্স ও নিলো। যেকোনো প্রয়োজনে যেনো তার সাহায্য পাওয়া যায়। শুধু তাই না, রফিক সাহেব একটা খাম অরন্যের হাতে দিয়ে বললেন, সেটা বিদেশের এক ঠিকানায় পোস্ট করে দিতে। চিঠিটা যেনো দ্রুত সেখানে পৌঁছায়, সে ব্যাপারেও তদারকি করতে। চিঠিটা কার, কোথায় যাবে, কেন যাচ্ছে সেসব নিয়ে অরন্য অনেকবার রফিক সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু রফিক সাহেব মুখ খুলে কিছুই বললেন না। অরন্য যখন চিঠিটা নিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো, ঠিক তখনি অতসী শাড়ির আঁচলে আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে ঠান্ডা স্বরে বলল, 'চিঠিটা দেয়ার কোনো দরকার নেই। আপনি যার কাছে চিঠিটা পৌঁছাতে চাচ্ছেন, সে আর মিনিট দুই-য়ের ভেতর এখানে উপস্থিত থাকবে।'
রফিক সাহেবের বুক ধড়ফড়ানি বেড়ে যায়। তিনি একটা হাত বুকে চেপে বড় বড় চোখ করে বললেন, 'কে তুমি?'
উত্তরে অতসী হেসে বলল, 'সে এসেই বলবে আমি কে!'
এমন সময়ে ঘরের মধ্যে, জহির ইসলাম, প্রিয়া আর প্রিয়ার মা ঢোকে। তাদের কে দেখে অরন্য, বেলী বেগম, রফিক সাহেব প্রচুর চমকে যান। দীবা অস্বস্তি নিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে বারবার। শুধু অপ্রস্তুত হয় না অতসী। সে পূর্বের ন্যায় শান্ত, শীতল গলায় বলে, 'তোমরাও এসে গেছ! কে খবর দিলো?'
দীবা উসখুস করে বলল, 'আমি..আমি দিছি খবর। প্রিয়াকে বলছি যে তোমরা আসছো। যদি প্রিয়া তোমাদের সাথে দেখা করতে চায়, তবে যেন এখুনি আসে। ওর নাকি অরন্যের সাথে কীসের কথা আছে?'
অরন্য আগুন গরম দৃষ্টির মধ্যে একগুচ্ছ বিষ্ময় নিয়ে দীবার দিকে তাকালো। তার বোন কী পক্ষ বদল করেছে! প্রিয়ার জন্য তার এত খাতির হলো কবে থেকে! অরন্য এক গাদা বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে, 'না জানি, আমার অনুপস্থিতিতে কত কী হয়ে গেছে এখানে।' তারপর গলা খ্যাঁক করে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলে, 'এখনো তোমার সাথে কীসের কথা থাকতে পারে আমার?'
প্রিয়া থতমত খায়। তার চোখে জল ছাপিয়ে উঠে। অরন্য কতটা বদলে গেছে! তার সাথে আর কিছুই না থাকুক, একটু ভাল ব্যবহার কী করতে পারে না? প্রিয়া নিচু কণ্ঠে বলে, 'আমি তোমার থেকে...' বাকি কথা শেষ করার আগেই জহির ইসলাম চেঁচিয়ে বলেন, 'আমি জানতাম আমার মেয়েকে তুমি উল্টাপাল্টা কথা বলবে। এইজন্যে আমরাও সাথে এসেছি। শোনো ছেলে, তোমার তেজ অনেক দেখেছি, অনেক সহ্য করেছি। যে ভুল তুমি করেছ, সেসব ভুলে গিয়ে এখন শান্ত আছি। তার মানে এই না যে আমার মেয়ের সাথে তুমি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে কথা বলবে!!'
অরন্য এক কদম সামনে এগিয়ে কাটাকাটা গলায় বলল, 'একশোবার বলব। আমি ওর সাথে কোনো কথা বলতে চাই না। তাহলে কেন আসছে ও? নিজের মেয়েকে লাজ-লজ্জা কী জিনিস, সেটা শেখান নাই? এরকম বেহায়া মেয়ে আমি আমার বাপের জন্মে দেখিনাই!!'
'মুখ ভেঙ্গে ফেলব তোর।' জহির ইসলাম ও এক কদম এগিয়ে আসে অরন্যের দিকে। রফিক সাহেবের শ্বাসকষ্ট ক্রমাগতই বাড়তে থাকে। বুকের ব্যথা টা এবার প্রকট আকার ধারণ করে পেট,মেরুদণ্ডতেও ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। তার চেহারা ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছিল। অতসী তার দিকে একবার তাকিয়ে হন্যপায়ে অরন্যে আর জহির ইসলামের মাঝামাঝি এসে দাঁড়ায়। জহির ইসলাম কে একনজর দেখে নিয়ে অরন্যকে বলে, 'আপনার বাবার শরীর খারাপ করছে। প্লিজ চুপ থাকেন।' বাবার শরীর খারাপ করছে শুনে, শুধু অরন্যই না, ঘরে উপস্থিত সবাই সব ভুলে রফিক সাহেবের দিকে আতংক নিয়ে তাকায়। নার্স ড্রয়িং রুমে ছিল। তাকে রফিক সাহেবই বাহিরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফ্যামিলির আলোচনায় বাহিরের মানুষ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ না। অরন্য গিয়ে তাকে ডেকে আনলো। নার্স এসে অক্সিজেনের পরিমাণ পরিমাপ মতো সেট করে মাস্ক টা রফিক সাহেবের মুখে লাগিয়ে দিলো। তারপর আস্তে আস্তে রফিক সাহেব আবার শান্ত হয়ে যান।শরীরের ব্যথা গুলো ভোঁতা হয়ে আসে তার। অতসী বলে, 'এনার এই অবস্থা আর আপনারা সবাই ঝগড়া নিয়ে আছেন। আজব!'
অরন্যের কী যে হলো। সে তেড়ে আসে অতসীর দিকে। আচমকা অতসীর গলা চেপে ধরে তাকে ধাক্কা মেরে দেয়ালে নিয়ে ঠেসে ধরে। আগুন গরম চোখ তাক করে, বজ্র্য কণ্ঠে বলে, 'তোমার জন্য আজকে এই দিন দেখতে হচ্ছে। তুমি কে অতসী? কে তুমি? কেন আমার জীবনে আসছো? কী জাদু করছো আমাকে। বলো... কেন আজকে আমার এতসব সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে বলো। কেন? কেন তোমাকে খুব অচেনা অজানা লাগে বলো। তোমার ভেতর এত রহস্য কেন? বলো...'
একদমে বলে অরন্য থামে। দম নেয় অতসীর দিকে আগুন দৃষ্টিতে তাকায়। যদি অরন্যের চোখ দিয়ে আগুন বের হওয়ার রাস্তা থাকতো, তবে এতক্ষণে অতসী ঠিক ঝলসে যেতো।
অতসীর চোখ জোড়া সজল হয়ে উঠে। তবুও ঠোঁটের কোণায় তার ধারালো হাসিটা অক্ষুণ্ণ রেখে বলে, 'আমি? আমি কে?' ঠিক তখনি, রুমের দরজা থেকে একটা অচেনা কণ্ঠ শোনা যায়। সে যেন বলছে, 'ও আমার মেয়ে। লিলির মেয়ে।'
সবাই দরজার দিকে দ্রুততার সঙ্গে তাকায়। অরন্য অতসীকে ছেড়ে দিয়ে হা করে তাকিয়ে থাকে। এই মহিলাটা কে? একটু মোটা, বেঁটে গোছের কিন্তু অপূর্ব রূপের অধিকারী। যৌবনের সময় এই মহিলা যে আগুন সুন্দরী ছিল, সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সবচে বেশি অবাক হন জহির ইসলাম। তার চোখ দুটো যেকোনো সময় কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে। তিনি অস্ফুটস্বরে বিড়বিড়ায়, 'লিলি!'
সবার মাঝে যখন প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা, তখন অতসী পায়ে পায়ে হেটে লিলির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দু'চোখের ট্যাপ ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষণে। ঝরঝর করে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে তার গাল বেয়ে। লিলি দু'হাত দিয়ে শক্ত করে অতসীকে জড়িয়ে ধরে। সময় নিয়ে অতসীর কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলে, 'আমার সাহসী বাচ্চা।'
অতসী হামলে পড়ে মায়ের বুকে। এত বছরের জমানো কান্না, ঝর্ণার স্রোতের মতো বইতে শুরু করে। লিলির চোখজোড়াও অশ্রুজলে ভরে উঠতে থাকে। সে সামান্য হেসে অতসীর পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, 'একটু আগেই বললাম সাহসী বাচ্চা। আর এই কীনা সাহসী বাচ্চার নমুনা? এত কাঁদে কেউ? হইছে হইছে। এবার মুখ তোল দেখি। চোখ মুছ...' লিলি নিজেই হাতের আঁজলায় ভরে অতসীর মুখটা তুলে ধরে। তার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে অতসীর কপালে আবার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলে, 'আর কষ্ট নেই মা। আর কষ্ট নেই। আর কেউ তোকে আমাকে আলাদা করতে পারবে না। তোর যে শৈশব টা নষ্ট হয়ে গেছে, সেটা তো আর ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু শৈশবের পাওনা আদর টুকু নিংড়ে নিংড়ে দিবো তোকে। ওয়াদা করছি...'
অতসীর চোখ দিয়ে তখনো পানি গড়িয়ে চিবুক স্পর্শ করে। সেই অবস্থাতেই অতসী মাথা নাড়ে। লিলি আর থামান না। কাঁদুক মেয়েটা...
অতসীকে পাশে রেখে লিলি কয়েক কদম সামনে এগিয়ে একবার প্রিয়ার মায়ের দিকে তাকায়। তারপর জহির ইসলামের দিকে তাকিয়ে বলে, 'কেমন আছ?'
জহির ইসলাম যেনো একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। তিনি এখনো বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে তার সামনে লিলি দাঁড়িয়ে আছে। সেই লিলি, যাকে সে স্বপ্ন দেখিয়ে তার বড়লোক বাবার বাড়ি থেকে পালিয়ে নিয়ে এসেছিল। জহির ইসলাম ঘোরগ্রস্ত গলায় জবাব দেয়, 'ভ..ভালো।'
হঠাৎ লিলি, বিষাদ মাখা কণ্ঠে বলে, 'একসময় বলতাম, মেয়েরা সব দিতে পারে। কিন্তু স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে পারে না। একসময় বলতাম, তুমি যদি আমাকে রেখে অন্যকারো সাথে কথাও বলো, তাহলে তোমাকে গুলি করে মারবো নয়তো নিজে মরে যাব। কারণ তোমার পাশে অন্যকাউকে আমি সহ্য করতে পারব না। অথচ দেখো, আজকে তোমার পাশে অন্যকেউ। যার সঙ্গে দীর্ঘ বছর যাবত সংসার করে আসছো তুমি।অথচ আমি না তোমাকে মারছি,না নিজে মরছি। ঠিকই সহ্য করে গেছি। নিয়তি,ভাগ্য, জীবন, কত অদ্ভুত তিনটা কথা তাইনা?'
জহির ইসলাম ভাল-মন্দ কিছুই বলতে পারলেন না। হঠাৎ করে একটা তীব্র অপরাধবোধ তাকে আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে ধরলো। প্রিয়ার মা এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার বললেন, 'আগের সব ভুলে যাওয়াই ভাল না?'
লিলি তার দিকে তাকিয়ে নিজের রাগ টা সামলে বললেন, 'সব ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু যারা জীবন নষ্ট করে দেয়, তাদের ভোলা যায় না।'
লিলি এবার হেটে হেটে অরন্যের সামনে এসে দাঁড়ায়। একবার উঁকি দিয়ে রফিক সাহেবকে দেখে জয়ের হাসি হাসেন। রফিক সাহেব তখন থরথর করে কাঁপছে শুধু। লিলি বলতে শুরু করলেন, 'তোমার সব প্রশ্ন গুলো আমি আসতে আসতে শুনেছি। তোমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যই আজকে এখানে এসেছি। শোনো অরন্য, অতসী আমার মেয়ে। আমার আপন মেয়ে। এই যে আমার পেট,এখানেই খুব যতনে ওকে সাড়ে নয়মাস রেখেছিলাম। হাড়ভাঙ্গা যন্ত্রণা সহ্য করে ওকে দুনিয়ার আলো দেখিয়েছিলাম। ওকে নিয়ে আমার স্বপ্ন ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু তোমার বাবার কারণে আমার একটা স্বপ্ন-ও পূরণ হয়নি।'
অরন্য'র সাথে সাথে বেলী বেগম, দীবা, প্রিয়া, প্রিয়ার মায়ের মুখ 'হা' হয়ে যায়। জহির ইসলামের চোখ দুটো আরো বড় হয়। অরন্য প্রচন্ড বিষ্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে, 'আমার বাবার কারণে?'
'হ্যাঁ। তোমার বাবার কারণে। অতসী তখন খুব ছোট। জহির অফিসের ফালতু কিছু ছেলেদের সাথে মিশে খারাপ হয়ে গেছিল অনেকটা। আমাকে মারধোর করতো প্রায় রাতে। আমার বাবার বাড়ি থেকে আমাকে টাকা নিয়ে আসার জন্য বলতো। উঠতে বসতে গালি শুনতে হতো। এমনো দিন গেছে, একদিনে চার-পাঁঁচ বার আমি মাইর খেয়েছি ওর হাতে। আমার বাবা অনেক বড়লোক ছিলেন। জহিরের পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত। আমার বাবা তাই জহির কে মেনে নেননি। তখন জহির আমাকে ভালবাসার স্বপ্ন দেখিয়ে, ঘর ছাড়া করে। আমি পালিয়ে আসি ওর সাথে। বিয়ে করি,সংসার গড়ি। ও বলেছিল, বিয়ের পর আমার পরিবার মেনে নিবেই। কিন্তু আমার বাবা, কেমন মানুষ ছিলেন, বোঝাতে পারব না। বিয়ের পর কী, অতসী হওয়ার পরেও তিনি আমাকে মেনে নেননি। আমাকে ত্যাজ্য করেছিলেন। আমিও সব ভুলে জহিরকে নিয়ে নতুন জীবন গড়তে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু জহিরের বদলে যাওয়াটা আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি অনেক চেষ্টা করেও ওকে ভালোর পথে ফেরাতে পারিনি। ও দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। ওর অত্যাচার গুলো দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছিল। ও শুধু আমাকেই না, অতসীকে পর্যন্ত মেরে ফেলতে চাইছিল। মোট কথা আমার আর অতসীর জীবন তখন রিস্কে ছিল প্রচুর। সেরকম সময়ে আমার সাথে দেখা হয় তোমার বাবার। একটা টেইলার্সের দোকান ছিল। সেখানে যে মহিলাটা বসতো, ও আমার বান্ধুবীর মতো ছিল। ও আমার ব্যাপারে সব জানতো। ওই মহিলার থেকেই তোমার বাবা আমার উইকনেস সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালায় অনেক। আমি বাহিরে বের হলেই আমাকে ফলো করতো। পিছু নিতো। একসময় আমি নিজ থেকে তোমার বাবার কাছে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম কেন সে আমাকে ফলো করে। কী কারণ? তোমার বাবা জানায়, সে আমাকে সাহায্য করতে চায়। জহিরের কাছে থাকলে আমাকে বা আমার মেয়েকে যেকোনো সময়ে ও বড় ক্ষতির মুখে ফেলে দিতে পারে। তাই তোমার বাবা চায় আমাকে এই ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য। আমি বিশ্বাস করি। তোমার বাবা আমাকে একটা হাতের কাজের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দিবে বলে একদিন আমাকে নিয়ে বের হয়। আমি অতসীকে সাথে করে নিয়ে যেতে চাইলে সে মানা করেছিল। বলেছিল, যেখানে যাচ্ছি সেখানে ছোট বাচ্চা নিয়ে গেলে সমস্যা। হয়তো আজ-ই আমাকে ভর্তি নিয়ে ক্লাসে বসিয়ে দিতে পারে। তাই আমি পাশের বাসার একজনের কাছে অতসীর দায়িত্ব দিয়ে সরল মনে তোমার বাবার সাথে রিকশায় উঠি। বিশ্বাস করো বাবা, আমার উদ্দেশ্য ছিল আমার জীবন আর আমার মেয়ের জীবন টা একটু গুছিয়ে নেওয়া। আমাদের জীবনে সুখগুলোকে আবার ধরে আনা। এর বেশি কিচ্ছু না। কিন্তু কে জানতো! ভাগ্য আমাকে এতবড় বিপদের মুখে ফেলে দিবে?'
লিলি থামলেন। দম নিলেন বুক ভরে। তার চোখে একধরণের ঘৃণা ফুঁটে উঠলো। সেই ঘৃণা ভরা চোখে তিনি রফিক সাহেবের দিকে তাকালেন। রফিক সাহেব লজ্জায় মাথা হেট করে বসে আছে। লিলি আবার বলতে শুরু করলেন, 'তোমার বাবা আমাকে কোনো কারিগরি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়নি। একটা ফ্ল্যাট বাসার সাত তলায় নিয়ে যায়। সেখানেই প্রতিষ্ঠান, বলে আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে আটকে ফেলে। তোমার বাবার উদ্দেশ্য ছিল, আমাকে.. আমাকে ভোগ করা। সে সফল হয়। ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেড়ি, আমার উপর তার ঝাপিয়ে পড়তে দেড়ি হয়নি। আমার থেকে আমার ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। আমার হাত-পা-মুখ বেধে ফেলে। আমি অনেক আকুতি করেছিলাম, আমাকে যেতে দেয়ার জন্য। নয়তো আমার মেয়েটাকে ওর বাবা যে মেরে ফেলবে। আমার মেয়েটাকে রক্ষা করার মতো কেউ নেই যে। কিন্তু তোমার বাবা একবারের জন্যেও শোনেনি। দীর্ঘ চারমাস আমি সেই ফ্ল্যাটে বন্দি থাকি। চারটা মাস!! সেই চারমাস আমার জীবনের সবচে ভয়াবহ চারমাস ছিল। আমি সেভেন্টি ওয়ানের পাকিস্তানিদের অত্যাচার দেখেনি। কিন্তু তোমার বাবার পৈশাচিক চেহারা দেখেছি। মানুষরূপী জানোয়ার দেখেছি। চারমাস পর একদিন আমি পালিয়ে যেতে সফল হই। আমি প্রথমেই জহিরের বাসায় যাই। গিয়ে দেখি ও ওখানে নেই। বাসা বদলে অন্যকোথাও গেছে। এরপর অনেক চেষ্টা করেও ওর বাসা খুঁজে পাইনি। ওর যে নাম্বার টা আমার মুখস্থ ছিল, সেটাও বন্ধ ছিল। তারপর বাধ্য হয়ে আমার বাবার সাথে যোগাযোগ করি। সব খুলে বলি। বাবা আমাকে একটা শর্তে ফিরিয়ে নেয়। যদি জহির কে ভুলে, আমি একা হয়ে ফিরে যেতে পারি। এদিকে জহিরকেও পাচ্ছি না, অপরদিকে মানুষের বাসায় কয়দিন থাকা যায়? বাধ্য হয়ে আমি আমার বাবার বাসায় গিয়ে উঠি। বাবা আমাকে অনেক জোর করেন বিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু পারেন নি। আমি বিয়ে করব না দেখেই আমি বিদেশ চলে যাই। আমার মেয়েকে নিয়ে যেসব স্বপ্ন আমি সাজিয়েছিলাম, তার সবটা চুরমার হয়ে গেছিল এভাবেই।' লিলির চেহারা ক্লান্ত দেখায়। মনে হয় তিনি জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত এক নারী।
লিলি থামতেই অতসী বলতে শুরু করে, 'বাবা আমাকে কখনো মায়ের ব্যাপারে বলেনি। সে ভেবেছিল, মা আমাকে ফেলে অন্যকারো হাত ধরে চলে গেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি। কোনো মা কী তার সন্তান কে ফেলে চলে যেতে পারে? বড় হওয়ার পর একদিন দাদীকে সব জিজ্ঞেস করি। দাদী বলবে না বলবে করেও মায়ের ব্যাপারে বলে। মায়ের ছবি দেখায়। সেই প্রথম মা'কে চিনি। এরপর অনেক খুঁজি। অনেক চেষ্টা করি। কিছু একটা তো উপায় থাকবে মায়ের সাথে যোগাযোগ করার! একদিন প্রিয়ার ফোন ঘাটতে গিয়ে ফেসবুকে ঢুকে যাই। ফেসবুকে গিয়ে Li Li নামের একটা আইডি চোখে পড়ে আমার। আমি মায়ের নাম জানতাম। তাই আইডিটায় ঢুকি। ছবি গুলো ঘাটতে গিয়ে একটামাত্র ছবি পাই। সেটা মায়ের। আমি চিনে ফেলি। সেদিন যে কী খুশি ছিলাম আমি! এরপর সুযোগ পেলেই মায়ের সঙ্গে কথা বলতাম। মা বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়েছিল, সেই টাকা দিয়ে বাটন ফোন কিনে নিয়েছিলাম। সেটা দিয়েই কথা বলতাম মায়ের সাথে। মা আমাকে তার কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করছিল। এরই মাঝখানে অরন্যকে দেখি আমি। উনাকে ভাল লেগে যায়। আর এরপর প্রিয়ারও অরন্যের প্রতি আগ্রহ আছে শুনে মা'কে সব শেয়ার করি। মা আমার কাছে অরন্যের ছবি চায়। মা চেয়েছিল সে অরন্যের সাথে কথা বলবে। আমাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিবে। প্রিয়ার ফোন দিয়েই অরন্যের ছবি ফেসবুকে মায়ের কাছে পাঠাই। অরন্যের আইডিটাও পাঠাই। অরন্যের আইডি ঘাটতে গিয়ে একটা ফ্যামিলি ফটো পায় মা। সেখানে রফিক সাহেব কে দেখেই চিনে যান। এরপর মা-ই আমাকে সব বলে দেন কীভাবে কী করতে হবে। আমার কাজ ছিল, অরন্যকে বিয়ে করে তাকে কোনোভাবে বিদেশ নিয়ে আটকে রাখা। আমি সেটাই করি। মাঝদিয়ে বাবা আমাকে মারার জন্য যেসব প্ল্যান করেন, সেগুলো আমার প্ল্যান এগিয়ে নিয়ে যেতে অনেক সাহায্য করেছে!' অতসী হেসে ফেলে এই কথার সময়। তারপর আবার বলল, 'অরন্যকে বিদেশ নিয়ে আটকে রাখি আমি। এর মাঝে মা অরন্যের বাবাকে শাস্তি দেয়ার জন্য তার ফ্যাক্টরিতে হওয়া দুই নম্বরি কাজ গুলো খুঁটে খুঁটে বের করে। এন্ড সেগুলো পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দেয়, উইথ প্রুভ।'
'আমি এসব না করলেও রফিক শাস্তি পেতো। যার যার কর্মফল তাকে তো ভোগ করতেই হবে।' বললেন লিলি।
বেলী বেগম ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন। দীবা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে। অরন্য, প্রিয়া, প্রিয়ার মা, জহির ইসলাম কারো ঠোঁটে ভাষা নেই। রফিক সাহেব পাথরের মতো জমে আছেন খাটে হেলান দিয়ে। তার চোখ দুটো আধবোজা।তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তার অপরাধের জন্য আজ সে অনুতপ্ত।
লিলি হাসলেন, এই হাসি জয়ের হাসি, বললেন, 'আমি অতসীকে নিয়ে কানাডা ফিরে যাব। অরন্য বাবা, যদি তোমার ইচ্ছে করে অতসীর সাথেই সংসার করার। তবে তুমি কানাডা চলে এসো। আর যদি তোমার সম্পর্ক টাকে এখানেই ভাঙ্গতে ইচ্ছে করে, তবে ভেঙ্গে ফেলো।' লিলি অতসীর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলেন, 'চল মা..' অতসী বিনাবাক্য ব্যয়ে একবার শুধু অরন্যের দিকে তাকিয়ে তার মায়ের হাত ধরে। দুই মা-মেয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যেতে থাকে সোনালী ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে। অতসীকে দেখে মনে হয়, একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে, নার্সারীতে পড়ে, স্কুল ছুটির পর মায়ের হাত ধরে বাসায় ফিরে যাচ্ছে।
অরন্য ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তাদের যাওয়ার পথে। এমন সময়ে দীবা চিৎকার করে উঠে, বাবা বলে। অরন্যের হুশ আসে। সে রফিক সাহেবের দিকে এগিয়ে যায়। দেখে, তার বাবা শান্ত হয়ে খাটে হেলান দিয়ে বসেছিল না। তার প্রাণপাখি অনেক আগেই তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে অজানার উদ্দেশ্যে। অরন্য ধকল টা সামলে নেয়। চিৎকার, চেঁচামেচি করে না। হৈচৈ করে না। শান্ত চোখে রফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে দীবা আর বেলী বেগমকে বলে, 'আব্বুর দাফনের পর আমরা সবাই কানাডা চলে যাব। ফরেভার। তৈরি থেকো।'
(সমাপ্ত)
®অলিন্দ্রিয়া_রুহি
লেখিকার কথাঃ দীর্ঘ অনেকদিন নিয়ে আমি আস্তে আস্তে এই গল্পটা লিখে শেষ করলাম। আশা করি আপনাদের ভাল লেগেছে। সবাই মন্তব্য করে জানাবেন যে কেমন লেগেছে। আর "সীমান্ত চক্রবর্তী' নামের যেই লোকটাকে আমি এনেছিলাম, সে একটা রহস্য তৈরির জন্য এসেছিল,।একটা সাইড চরিত্র মাত্র। তাই তাকে নিয়ে আর লিখিনি। লেখার প্রয়োজনই ছিল না। যদি কখনো ইচ্ছে করে, আমি "নারী" গল্পটার সিজন ২ আনবো। আমি "অভিমানের আকাশ তোমার" নামে একটা গল্প শুরু করব। আশা করি, সেই গল্পটা আরো বেশি ভাল লাগবে আপনাদের কাছে। ধন্যবাদ!!
08/06/2023
নারী - ১৫
___________
রফিক সাহেব কঠোর নিয়ম মেনে চলেন। প্রতিদিন রাত দশটার ভেতর বাসায় আসা, সাড়ে দশটার ভেতর খাওয়া সেড়ে ঘুমাতে যাওয়া - তার নিয়মের একটি অংশ। অরন্যের ঝামেলার জন্য মাঝখানে বেশ কিছুদিন তিনি এই নিয়ম মানতে পারেননি। তার ছোট খাটো একটা জুট মিল আছে। সেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ যেতে পারেননি। আর ঘটনা এই দুই সপ্তাহের ভেতরেই ঘটে গেছে। রাত বারোটার দিকে বাড়ি ফিরেন আজকে। বেলী বেগম, দীবা সবাই অবাক। রফিক সাহেব কেমন মাথানিচু করে ক্লান্ত পা টেনে টেনে নিজের রুমে যান। দীবা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, 'বাবার কী হলো মা?'
বেলী বেগম ঠোঁট টিপে বলেন, 'আমি কীভাবে বলব?'
সাড়ে বারোটার দিকেও যখন রফিক সাহেব খেতে আসেন না। দীবা তখন উসখুস করে তার ঘরেই চলে গেলেন। গিয়ে দেখেন কপালের উপর হাত ভাঁজ করে রেখে রফিক সাহেব শুয়ে আছেন। তার চোখ দুটি খোলা। দৃষ্টি অস্থির। দীবা গলা নামিয়ে ডাকে, 'বাবা..'
রফিক সাহেব চমকে উঠলেন। ধড়মড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, 'ক..কে? দীবা নাকি?'
'বাবা আমি।' দীবা কাছে গিয়ে বসে। রফিক সাহেব শান্ত হন। আবার শুয়ে পড়েন। দীবা উদ্বিগ্ন নিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কী হইছে তোমার আব্বু?'
রফিক সাহেব গলায় কাঠিন্য যোগ করে জবাব দেয়, 'কী হবে?'
'ত..তুমি এরকম আচরণ করছো কেন? কী হইছে বলো। কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত?'
'নাহ। আমার কিছু হয়নাই। ওই একটু অফিসিয়াল ঝামেলা...'
'খুব বেশি ঝামেলা?'
রফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়েন। দীবা বলল, 'কী ঝামেলা? আমাকে বলা যাবে? আমি যদি কোনো সমাধান দিতে পারি...'
'না। তেমন কিছু না। এসব বাদ দে।' রফিক সাহেব হঠাৎ অন্যরকম গলায় বললেন, 'অ..অরন্য কোথায় থাকে? জানিস কিছু? অরন্যকে খুব দরকার রে। অফিসে ও থাকলে আমার অনেক সুবিধা হতো।'
দীবার বুক ফুঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে গলা নামিয়ে বলল, 'বাবা। অরন্য এইদেশে নেই। ও বিদেশ...'
রফিক সাহেব চোখ বড় বড় করে অবিশ্বাস্য সুরে বললেন, 'চলে গেছে?'
দীবা মাথা নাড়ায়, 'হুঁ।'
রফিক সাহেব ক্ষণকাল একদম চুপ করে থাকলেন। কথা বলতে পারলেন না। তারপর একদম ভাঙা গলায় বললেন, 'কী কপাল আমার! একটামাত্র ছেলেকে নিয়ে যা যা স্বপ্ন দেখছি, তার একটাও পূরণ হলো না। আচ্ছা ওর কাছে কী আমি বা তুই, বা আমরা কী এতই পর হয়ে গেছি যে ও একটাবার আমাদের জানিয়ে যেতে পারল না। বল তো!'
দীবা কিছুই বলল না। নিরুত্তর থাকল। রফিক সাহেব আবার বললেন, 'এখন ওকে অনেক দরকার ছিল আমার। অনেক দরকার ছিল। কিন্তু ও... থাক। যাদের ছেলে সন্তান নেই তারা কী চলে না? আমিও ভাববো আমার ছেলে সন্তান নেই। আমিও ওভাবেই চলবো। বয়স হয়েছে তো কী হয়েছে? সবকিছু আমিই সামলাবো। সমস্যা নাই কোনো।'
দীবার কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। সে অতি কষ্টে নিজের কান্না সামলে নিয়ে বলল, 'আব্বু, তোমার অফিসে দরকার পড়লে আমি জয়েন করি? আমি বিজনেস সামলাতে হেল্প করি,হুঁ?'
'না। দরকার নেই।'
'তুমি একা এতসব সামলাও। এবার থেকে আমিও থাকব তোমার সাথে। সমস্যা কী বাবা?'
রফিক সাহেব মেকী ধমক লাগালেন, 'বললাম না দরকার নাই। তুই ঘরের মেয়ে, ঘরেই থাক। আমি বেঁচে থাকতে তোদের কারো কষ্ট হোক, আমি চাই না।' দীবার চোখ দিয়ে টুপ করে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সে রফিক সাহেবের বুকে নিজের মাথা চেঁপে ধরে বলল, 'ইউ আর দ্য বেস্ট বাবা...'
রফিক সাহেব মৃদু হাসলেন। কিছুই বললেন না।
_________
অন্যদিনের তুলনায় আজকে পরিবেশ খুব সুন্দর। গত তিনদিন যাবত গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে পথঘাট সব ভেসে একাকার। আকাশ সবসময়ই থম ধরা ভাব নিয়ে ছিল। থেমে থেমে কাঁদছিল বলেই প্রিয়ার ধারণা। আজ তিনদিন পর রোদ উঠেছে। সূয্যিমামা মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে প্রকৃতিতে বলছে, 'এই দেখো, আমি এসেছি..' সঙ্গে ফুরফুরে বাতাস।এত সুন্দর একটা পরিবেশেও প্রিয়ার মন আরো খারাপ হয়ে গেল। মন খারাপের কারণ, অরন্য না। প্রিয়ার বাবা। বারোদিন হতে চললো উনি যেখানে জব করতো, সে জায়গা থেকে উনাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কীজন্য করেছে তা খোলাখুলি ভাবে উল্লেখ করেনি। জহির ইসলাম প্রথম কয়দিন প্রচুর উত্তেজিত ছিলেন। বারবার বলেছেন, 'হ্যান করব, ত্যান করব।' কিন্তু শেষে আর কিছুই করতে পারেন নি। এখন মাথা গোঁজ করে বারান্দায় বসে থাকেন চুপচাপ। প্রিয়া অনেক চেষ্টা করেছে নিজে একটা ভাল চাকরি করার জন্য। কিন্তু মাত্র এইচএসসি সার্টিফিকেট দিয়ে ভাল চাকরি চাইলেই পাওয়া যায় না। যেসব পায়, সেসবে প্রিয়ার পোষাবে না। যাতায়াত করতে করতেই সব ফুরিয়ে যাবে। তবুও প্রিয়া হাল ছেড়ে বসে নেই। চারিদিকে খোঁজ লাগিয়ে দিয়েছে। ভালমানের টিউশনি পেলেই তার বন্ধুরা তাকে জানাবে। কোচিং এর ব্যবসা খোলার পর থেকে টিউশন টিচারদের বারোটা বেজে গেছে।
মাত্র বারোদিন কারো চাকরি চলে যাওয়ায় এতটা কষ্ট হয়না যতটা প্রিয়াদের হচ্ছে। তার বাবা যেখানে চাকরি করতো, বলা হয়েছে, সেখানে নাকি তিনি অনেক অসৎ উপায় অবলম্বন করেছেন। কাজের বিনিময়ে হিউজ পরিমাণ ঘুষ নিয়েছেন। এতদিন সব লুকিয়েচুড়িয়ে রাখলেও শেষ পর্যন্ত বড়কর্তা সব জেনে গেছে।এবং ফলস্বরূপ তাকে বের করে দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে অফিস থেকে তার নামে যে একাউন্ট করা ছিল, সেখানে প্রায় লাখ তের টাকা তিনি জমা করেছিলেন। সেই সব টাকাও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এমনকি তার বাড়িটাকেও নিলামে উঠাবে ; এমনটাই শোনা যাচ্ছে কারো কারো মুখ থেকে।
প্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুদিন আগেও তারা ভাল ছিল। খুব ভাল ছিল। হঠাৎ করে কোথা থেকে কী হয়ে গেল! জহির ইসলাম যদিও বারবার বলছেন, তিনি কোনো ঘুষ টুশ খাননি। সব টাকা তার জমানো টাকা। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে তার কথা? এমনকি প্রিয়া নিজেও বিশ্বাস করে না। তার বাবা কাউকে মারতে পর্যন্ত হায়ার করতে পারে। তার কাছে ঘুষ খাওয়া তো ডালভাত ব্যাপার!
প্রিয়ার বুকচিঁড়ে আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এখন সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে, তারা কতটা পাপ করে এসেছে অতসীর সাথে। ইশ! একবার যদি অতসীকে পেতো। প্রিয়া দরকার পড়লে অতসীর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতো। এই দুঃসময় গুলো তার একদমই সহ্য হচ্ছে না। একদম না...
___________
অনেকদিন পরের ঘটনা, রাত একটার দিকে বেলী বেগম আর দীবা উদ্বিগ্ন নিয়ে পায়চারী করতে থাকে রুমে। দানিশ যদিও এতক্ষণ জেগে ছিল, কিছুক্ষণ আগেই সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের উদ্বেগের কারণ, রফিক সাহেবের কোনো খোঁজপাত্তা নেই। সন্ধ্যার পর পর তিনি অফিস থেকে বেরিয়েছেন। তারপর আর বাসায় আসেননি। এমনকি ফোনটাও বন্ধ। তিনি কোথায় কেউ জানে না। বেলী বেগম একটু পরপর ফোঁপাচ্ছেন। আঁচলে চোখ মুছছেন। তাদের জীবনে একটার পর একটা একি সর্বনাশ আসছে, তারা কেউই বুঝতে পারছে না।
তিনটার দিকে ফোন এলো একটা হাসপাতাল থেকে। রফিক সাহেব সিরিয়াস হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। দীবা, বেলী বেগম ছুটে গেলেন। হাঁপানি রোগীর মতো মুখ খুলে, বড় বড় শ্বাস নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছেন রফিক সাহেব। চেনাই যাচ্ছে না তাকে। মুখটুখ শুকিয়ে কী অবস্থা! চোখের তলা একটুখানির ভেতরেই গর্ত হয়ে গেছে। দীবা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। বেলী বেগম কাঁদলেন না। পাথরের মত জমে ধপ করে বসে পড়ল। রফিক সাহেব ওদেরকে দেখে নিজেও কেঁদে উঠলেন। ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করলেন,
'দুনিয়াতে অক্সিজেনের কম পড়ছে নাকি? এত কষ্ট হচ্ছে মা! তাও দম নিতে পারছি না।'
দীবা পাগলের মত কেঁদে কেঁদে বলল, 'বাবা চুপ থাক। একদম চুপ করে থাক। একটুও কথা বলো না।'
রফিক সাহেব শত কষ্টের মাঝেও কীরকম জানি হাসার চেষ্টা করলেন। বললেন, 'আমার সময় ফুরিয়ে আসছে রে মা। এখন যদি তোদের সব না বলি, তাহলে আর কখনো বলতে পারব না।'
'ক..কী বলবে বাবা?'
'তুই অরন্যকে খুঁজে বের কর মা। ওকে দ্রুত চলে আসতে বল। ও আসলে তারপর আমি সবাইকে বলব৷ একসাথে... এক্ষুনি খুঁজে বের কর মা। এক্ষুনি..'
রফিক সাহেবের আবার হাঁপানির মতো উঠলো। এত খারাপ অবস্থা হলো যে নার্সরা ছুটে এসে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দিয়ে গেলেন।
রফিক সাহেব ঘুমিয়ে পড়ার পর দীবা করিডোরের এককোণায় এসে দাঁড়ায়। রাত অনেক... এত রাতে কাউকে ফোন করা ঠিক না জেনেও সে ফোন করে আমিন কে। ঠিক বেঠিক ভাববার সময় এখন নেই। আমিন জেগেই ছিল। দীবার নাম্বারটা যদিও সেভ করা ছিল না। তবুও তার চিনতে একটুও ভুল হলো না। সে ফোন ধরেই বলল, 'এত রাতে তুমি!'
ওপাশ থেকে দীবার কান্নার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। আমিন আতংকিত গলায় বলল, 'কী হইছে দীবা? কাঁদছ কেন?'
দীবা কান্নার দমক কমিয়ে কোনোরকমে বলল, 'তোমার কাছে অরন্যের সাথে যোগাযোগ করার কোনো নাম্বার আছে? প্লিজ থাকলে দাও... প্লিজ... আব্বু..আব্বু হার্ট অ্যাটাক... ' দীবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে পুরো কথা শেষ করার আগেই। আমিন অস্বস্তি নিয়ে তড়িঘড়ি করে অরন্যের ইমো নাম্বার টা দিয়ে দিল। যদিও অরন্যের সাথে এরপর থেকে আর কখনো আমিন যোগাযোগ করেনি, তবুও সে নাম্বার টাকে সযত্নে রেখেছিল।
____________
অস্ট্রেলিয়ার আকাশে এখন ধবধবে সাদা মেঘ, তুলোর মতো নরম, হালকা, ভেসে বেড়াচ্ছে অবিচ্ছিন্ন ভাবে। অরন্য একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। একটা ছোট্ট রকেটের মতো কী যেন উড়ে যাচ্ছে। অতসী বলল, 'ওটা রকেট না, স্যাটেলাইট।' অরন্য পেছন ঘুরে দেখলো কপালে ব্যস্ততার ভাঁজ ফেলে অতসী হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। অরন্য বলল, 'কিভাবে বুঝলে আমি ওটাকে দেখছিলাম?'
'এটা তো খুব সোজা ব্যাপার। তোমার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করলেই তো বোঝা যায়।'
'ও!'
'হুঁ... এই দেখো। ছাঁই কালার আর সাদা.. কোন টি-শার্ট নিব?'
অরন্য প্রশ্ন বুঝতে না পেরে বলল, 'কোথায় কী নিবা?'
'আরে! প্যাকিং করছি। আমরা যাব না।'
'কই যাব?'
'বাংলাদেশ।'
অরন্যের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে অস্ফুটস্বরে বিড়বিড় করে, 'বাংলাদেশ!'
তারপর কপট রাগ নিয়ে বলে, 'মশকরা করছ?'
'মশকরা করব কেন? আজব! সত্যি আমরা বাংলাদেশ যাচ্ছি।'
'কোন কারণে যাব ওখানে?' - অরন্যের গলা রাগী শোনায়।
অতসী উত্তর দিতে গিয়ে মুচকি হেসে বলে, 'এখন বলব না। একটু পর নিজেই বুঝবা।'
অরন্য হতবাক হয়ে অতসীর দিকে তাকিয়ে রইলো। অতসী তখন মহানন্দে গোছগাছ করতে ব্যস্ত। অতসীর কথা সত্যি সত্যি প্রমাণিত হলো। আধাঘন্টার মাঝে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো দীবার কল এলো। অরন্য অনেক ইতস্তত করে ফোন তুললো। ফোন ধরতেই একশোটা ঝাড়ি, বকা, রাগের সম্মুখীন হতে হবে, এটাই অরন্য আশা করেছিল। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে, দীবা কেঁদেকেটে সব ঘটনা খুলে বলল। আর যতদ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে আসার জন্য অনুরোধ করল। কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের উপর যতই রাগ পুষে রাখুক না কেন, বাবা-মায়ের অসুখের কথা বা মৃত্যুশয্যার কথা শুনলে সে নির্ঘাত সব ভুলে ছুটে যাবে। অরন্যও ছুটে এলো অতসীর কাছে। অতসী আগে থেকে কীভাবে জানলো তাদের বাংলাদেশ যেতে হবে তা নিয়ে মাথা ঘামালো না। কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু ব্যস্ত গলাতে বলল, 'অনলাইনে আজকের মধ্যে ইমারজেন্সি বাংলাদেশ ফ্লাইয়ের টিকিট কী পাব অতসী?'
অতসীর ঠোঁটের কোণায় ধারালো হাসি। সে হাত-পা নাচিয়ে উত্তর দিল, 'আমি টিকিট কেটে ফেলছি। আজ সন্ধ্যা আটটায় আমাদের ফ্লাইট।'
চলবে...
®অলিন্দ্রিয়া_রুহি
~আগামীকাল এই গল্পের শেষ পর্ব হবে। অতসী আসলে কী, কী তার উদ্দেশ্য, সে আগে থেকে সব কেমন করে জানতো, আর কেনোই বা তার মনের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন, আগামীকাল সব খোলাশা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
----কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ করে দিব, কী কারণ তার, আরো লিখি, আরো লম্বা করি, আরো কাহিনী বাড়াই, ইত্যাদি ইত্যাদি রিকোয়েস্ট কেউ করবেন না। একটা লেখা কোথা থেকে শুরু করব, আর কোথায় গিয়ে শেষ করব, তা শুধুমাত্র লেখকই জানে। আপনাদের কাজ গল্প উপভোগ করা। সেটা করুন😊।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
বেশি জানতে চাইয়েন না
Mymensingh