KIRAS

KIRAS

Share

“Islamic knowledge, products, and guidance — empowering your faith step by step.”

02/09/2026

হাশরের মাঠে শাফাআত করার অধিকার কার থাকবে?

ঈমান সিরিজ: পর্ব ০৮

🍀শাফা'আত (الشَّفَاعَةُ) অর্থ সুপারিশ করা বা কারো দাবি বা আব্দারকে সমর্থন করা। শব্দটি 'আশ-শাফউ (الشَّفْعُ) থেকে গৃহীত, যার অর্থ জোড়া বা জোড়া বানানো। শাফা'আতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল আসীর (৬০৬ হি) বলেন: “হাদীসে বিভিন্ন স্থানে শাফা'আত শব্দটি এসেছে জাগতিক বা আখিরাতের বিষয়ে। এর অর্থ পাপ বা অপরাধের শাস্তি না দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করা।" (ইবনুল আসীর, আন নিহায়া ২/৪৮৫)

আরবের মুশরিকগণ, খৃস্টানগণ ও অন্যান্য বিভ্রান্ত জাতি ফিরিশতা ও নবী-ওলীগণের শাফা'আতকে তাঁদের অধিকার ও ক্ষমতা বলে বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা মনে করত যে, মহান আল্লাহ তাঁদেরকে শাফা'আত করার জন্য নিঃশর্ত ও উন্মুক্ত অনুমতি, অধিকার বা ক্ষমতা প্রদান করেছেন। কাজেই তাঁরা তাঁদের ইচ্ছামত যে কাউকে সুপারিশ করে জান্নাতে নিতে পারবেন। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা তাঁদের শাফা'আত লাভের আশায় অতিভক্তি বা শিরকে লিপ্ত হতো।

🍀পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মাহর খারিজী, মু'তাযিলা ও অন্যান্য কতিপয় ফিরকা পাপীদের জন্য নবীগণের বা অন্যদের শাফা'আত অস্বীকার করে। এক্ষেত্রে তাদের দলিলগুলি মূলত দু প্রকারের: (১) কুরআন কারীমের শাফা'আত অস্বীকার বিষয়ক আয়াতগুলি এবং (২) তাদের মতবাদ ভিত্তিক যুক্তি। তাদের মতে পাপী মুসলিমের শাস্তি না দেওয়া আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী, কাজেই আল্লাহ নিজের রহমতে বা অন্য কারো শাফা'আতে কোনো পাপীকে ক্ষমা করতে পারেন না। আমরা কুরআন-হাদীসের আলোকে শাফা'আত বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ জানার ও বুঝার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্।

🍁কোরআন কারীমে শাফা'আত

কোরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন কোনো শাফা'আত কবুল করা হবে না, আল্লাহ ছাড়া কেউ শাফা'আতের অধিকার রাখবে না এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শাফা'আতকারীও থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন।

وَٱتَّقُوا۟ يَوْمًا لَّا تَجْزِى نَفْسٌ عَن نَّفْسٍۢ شَيْـًٔا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَٰعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ

"তোমরা সে দিনকে ভয় কর যে দিন কেউ কারো কাজে আসবেনা এবং কারো সুপারিশ স্বীকৃত হবেনা এবং কারো নিকট হতে ক্ষতিপূরণ গৃহীত হবে না এবং তারা কোন প্রকার সাহায্য পাবে না।"
(সূরা বাকারা, আয়াত:৪৮)

তিনি আরো বলেন।

وَٱتَّقُوا۟ يَوْمًا لَّا تَجْزِى نَفْسٌ عَن نَّفْسٍۢ شَيْـًٔا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا تَنفَعُهَا شَفَٰعَةٌ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ

"তোমরা সে দিনকে ভয় কর যে দিন কেউ কারো কোন উপকারে আসবে না এবং কারো নিকট হতে কোন ক্ষতিপূরণ গৃহীত হবে না এবং কোন সুপারিশ কারো পক্ষে লাভজনক হবে না এবং তারা কোন সাহায্য ও পাবে না।"
(সূরা বাকারা, আয়াত:১২৩)

অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছে:

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَنفِقُوا۟ مِمَّا رَزَقْنَـٰكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِىَ يَوْمٌ لَّا بَيْعٌ فِيهِ وَلَا خُلَّةٌ وَلَا شَفَٰعَةٌ ۗ وَٱلْكَـٰفِرُونَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ

"হে মু'মিনগণ, আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি তা হতে তোমরা ব্যয় কর সেই দিন আসার পূর্বে- যে দিন ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না।"
(সূরা বাকারা, আয়াত:২৫৪)

অন্যত্র আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন:

ءَأَتَّخِذُ مِن دُونِهِۦٓ ءَالِهَةً إِن يُرِدْنِ ٱلرَّحْمَـٰنُ بِضُرٍّۢ لَّا تُغْنِ عَنِّى شَفَٰعَتُهُمْ شَيْـًٔا وَلَا يُنقِذُونِ

"আমি কি তাঁর পরিবর্তে অন্য ইলাহ গ্রহণ করব? দয়াময় আল্লাহ আমাকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে চাইলে তাদের সুপারিশ আমার কোন কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে উদ্ধার করতে পারবে না।"
(সূরা ইয়াসিন, আয়াত:২৩)

তিনি আরো বলেন:

وَأَنْذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْ يُحْشَرُوا إِلَى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُمْ مِنْ دُونِهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ

"তুমি এ দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করে দাও যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট সমবেত করা হবে এমন অবস্থায় যে, তিনি ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক থাকবে না এবং কোনো সুপারিশকারীও থাকবে না; হয়ত তারা সাবধান হবে। "
(সূরা আনআম, আয়াত:৫১)

🍀উপরোল্লেখিত আয়াত গুলো থেকে মু'তাযিলা ও অন্যান্য ফিরকা দাবি করে যে, কিয়ামতের দিন কারো শাফা'আতে কোনো পাপীর ক্ষমালাভের ধারণা বাতিল ও ভিত্তিহীন।
বস্তুত এ সকল আয়াতে মূলত শাফা'আত বিষয়ে মুশরিকদের বিশ্বাস খণ্ডন করা হয়েছে। ওহীর জ্ঞানের সাথে কিছু কল্পনা যোগ করে আরবের কাফিরগণ ও অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহর ফিরিশতাগণ, নবীগণ বা প্রিয়পাত্রগণ শাফা'আতের ক্ষমতা ও অধিকার সংরক্ষণ করেন। তারা তাদের ইচ্ছামত যাকে ইচ্ছা সুপারিশ করে মুক্তি দিতে পারবেন। মহান আল্লাহ তাদেরকে এ ধরনের ক্ষমতা ও অধিকার দিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাদের এ ভ্রান্ত বিশ্বাস খণ্ডন করে জানিয়েছেন যে, শাফা'আতের মালিকানা, অধিকার ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। অন্যান্য আয়াতে শাফা'আতের স্বীকৃতি উল্লেখ করা হয়েছে। যিনি শাফা'আত করবেন তিনি যদি শাফা'আত করার জন্য মহান আল্লার অনুমতি গ্রহণ করেন এবং যার জন্য শাফা'আত করবেন তার প্রতি যদি মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন তবে সেক্ষেত্রে শাফা'আত করার সুযোগ আল্লাহ প্রদান করবেন। যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট নন তার জন্য কেউই শাফা'আত করবে না। সর্বাবস্থায় শাফা'আত গ্রহণ করা বা না করা মহান আল্লাহর ইচ্ছা। মহান আল্লাহ বলেন:

مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ

"কে সে যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?"
(সূরা বাকারা, আয়াত:২৫৫)

অন্যত্র তিনি বলেন:

وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُمْ مِنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ.

"তিনি যাদের প্রতি সন্তুষ্ট তাদের ছাড়া আর কারো জন্য তারা সুপারিশ করে না এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।"
(সূরা আম্বিয়া, আয়াত:২৮)

وَكَمْ مِنْ مَلَكِ فِي السَّمَاوَاتِ لا تُغْنِي شَفَاعَتْهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى

"আকাশে কত ফিরিস্তা রয়েছে! তাদের কোনো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।"
(সূরা নাজম, আয়াত:২৬)

উপরের আয়াতগুলি থেকে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি বুঝতে পারি:

☘️শাফা'আতের মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো শাফা'আতের কোনো ক্ষমতা বা অধিকার নেই।

☘️আল্লাহ অনুমতি দিলে কেউ শাফ'আত করতে পারবেন।

☘️যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট শুধু তাকেই অনুমতি প্রদান করবেন।

☘️আল্লাহর অনুমতিক্রমে ফিরিশতাগণ সুপারিশ করবেন বলে কুরআনে স্পষ্টত বলা হয়েছে।

☘️যে ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করা হবে তার জন্যও আল্লাহর অনুমোদন পূর্বশর্ত।

☘️যে ব্যক্তির প্রতি স্বয়ং আল্লাহ সন্তুষ্ট রয়েছেন সে ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো জন্য কেউ সুপারিশ করবেন না।

🍁হাদীস শরীফে শাফা'আত

অগণিত হাদীসে কিয়ামতের দিন নবীগণ ও অন্যান্য মানুষ এবং মানুষের বিভিন্ন আমল শাফা'আত করবে এবং তাদের শাফা'আত কবুল করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল হাদীসের বিস্তারিত আলোচনার জন্য বৃহৎ পরিসরের প্রয়োজন। সংক্ষেপে বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, কিয়ামতের দিন মানুষ বিভিন্ন নবী-রাসূলের নিকট গমন করে ব্যর্থ হয়ে সর্বশেষ মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট গমন করবেন। তিনি সমগ্র মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শাফা'আত করবেন, মানুষদের বিচার শেষ করে দেওয়ার জন্য।

📩📩"শাফা'আত বিষয়ে সুদীর্ঘ হাদীসটি কমেন্টে দেয়া হলো"📩📩

🌱তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফা'আতে মহান আল্লাহ তাঁর উম্মাতের অনেক গোনাহগারকে ক্ষমা করবেন।

🌱রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফা'আতে অনেক পাপী মুসলিম জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে জান্নাতে প্রবেশ করবেন।

🌱উম্মাতে মুহাম্মাদীর অনেক নেককার মানুষ শাফা'আত করবেন।

🌱সন্তানগণ তাদের পিতামাতাদের জন্য শাফা'আত করবে।

🌱কুরআন তার তিলাওয়াতকারী ও অনুসারীদের জন্য শাফা'আত করবে।

🌱সিয়াম ও অন্যান্য ইবাদত শাফা'আত করবে এবং তা কবুল করা হবে।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পরি যে, শাফা'আতের অর্থ এই নয় যে, ফিরিশতাগণ বা অন্য কোনো বান্দা ইচ্ছামত কোনো মানুষকে সুপারিশ করবেন। কেউ যদি কোনো ফিরিশতা বা আল্লাহর কোনো সম্মানিত বান্দার নামে মানত করে, তাঁকে সাজদা করে, তাঁকে ডাকে বা তাকে 'চূড়ান্ত ভক্তি' করে এবং আশা করে যে, এরূপ করাতে উক্ত ফিরিশতা বা সম্মানিত বান্দা তার জন্য সুপারিশ করবেন তবে তার এরূপ আশা কুরআনের আলোতে মরীচিকার পিছে ছোটা ছাড়া কিছুই নয়। এ ব্যক্তির শাফা'আত লাভ তো দূরের কথা তার মানত, সাজদা, ডাক বা চূড়ান্ত বা অলৌকিক ভক্তিতে' যদি কোনো ফিরিশতা বা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা সন্তুষ্টি বোধ করেন তবে তাকেও আল্লাহ জাহান্নামে শাস্তি দিবেন বলে ঘোষণা করেছেন।

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অনুসারীগণ সহীহ হাদীসে প্রমাণিত সকল প্রকারের শাফা'আতেই বিশ্বাস করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, শাফ'আতের মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহরই। তিনি যার উপর সন্তুষ্ট হবেন তার জন্য তিনি দয়া করে শাফা'আতের ব্যবস্থা করে দিবেন। তিনি যার উপর সন্তুষ্ট থাকবেন তার জন্য তাঁর অনুমতিপ্রাপ্ত কেউ শাফা'আত করলে তিনি ইচ্ছা করলে তা কবুল করে গোনাহগার মুমিনকে ক্ষমা করতে পারেন। ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদা ব্যাখ্যা করে বলেন:

"নবীগণের শাফা'আত সত্য। পাপী মুমিনগণ এবং কবীরা গোনাহকারিগণের জন্য, পাপের কারণে যাদের জাহান্নাম পাওনা হয়েছিল তাদের জন্য কিয়ামতের দিন আমাদের নবী (ﷺ)র শাফা'আতও সত্য। "
(মোল্লা আলী কারী, শারহুল ফিকহিল আকবার, পৃ:১৫৯-১৬৪)

📌পোস্টের তথ্যগুলো ইনশাআল্লাহ্ কাজে লাগতে পারে তাই Save করে রাখুন এবং “সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে— দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য আপনার আপনজনের কাছে পৌঁছে দিন।”

🎯 আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কি শাফা'আত করতে পারবে?
কমেন্টে লিখুন

💡➜ আপনাদের জন্য পরবর্তী পর্ব: আপনি কোন গতিতে পুলসিরাত পার হবেন—জানেন?

#শাফা'আত
#কেয়ামতেরদিনেশাফা'আত

31/08/2026

"হাউযে কাওসার" থেকে যাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে—তাদের মধ্যে কি আপনি আছেন?

ঈমান সিরিজ: পর্ব ০৭

☘️মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ

‘‘নিশ্চয় আমি আপনাকে প্রদান করেছি ‘‘কাওসার’’।
(সূরা কাউসার: আয়াত ০১)

☘️আলকাউসার (الكوثر) শব্দের অর্থ ‘প্রচুর পরিমাণ, প্রভূত কল্যাণ’ ইত্যাদি। আরবি ভাষায় কোনো ক্ষেত্রে প্রচুর সংখ্যক এবং অনেক ভালো কিছুর সমষ্টি বোঝাতে কাউসার শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেমন স্তুপীকৃত বস্তু, অনেক সম্পদ, এমনকি দানশীল ব্যক্তিকেও কাউসার বলে।
আবার জান্নাতের একটি বিশেষ নদীর নামও কাউসার, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দান করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

الكَوْثَرُ نَهْرٌ فِي الجَنَّةِ، حَافَّتَاهُ مِنْ ذَهَبٍ، وَمَجْرَاهُ عَلَى الدُّرِّ اليَاقُوتِ، تُرْبَتُهُ أَطْيَبُ مِنَ المِسْكِ، وَمَاؤُهُ أَحْلَى مِنَ العَسَلِ، وَأَبْيَضُ مِنَ الثَّلْجِ

" জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম কাওসার, যার প্রত্যেক তীর সোনার এবং যার পানি মুক্তা ও ইয়াকুতের উপর দিয়ে প্রবাহমান। এর যমীন কস্তুরীর তুলনায় অধিক সুগন্ধসম্পন্ন, এর পানি মধুর তুলনায় অধিক মিষ্ট এবং বরফের তুলনায় অধিক সাদা।"
(জামে তিরমিযী, ৩৩৬১)

🍀হাউয (الحوض) অর্থ চৌবাচ্চা, পুকুর বা জলাশয়। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে একটি পবিত্র 'হাউয' দান করেছেন যেখান থেকে তাঁর উম্মাত কিয়ামতের দিন পানি পান করবে। ত্রিশেরও অধিক সাহাবী থেকে মুতাওয়াতির পর্যায়ে এ বিষয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এখানে এটা জানা আবশ্যক যে, কাউসার ও হাউয একই বস্তু নয়। হাউযের অবস্থান হাশরের মাঠে, যার পানি কাউসার থেকে সরবরাহ করা হবে। আর কাউসারের অবস্থান হলো জান্নাতে। হাশরের ময়দানের হাউয সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের কাউসার ঝর্ণাধারা থেকে পানি এনে হাউযে ঢালা হবে।

☘️এক হাদীসে বলা হয়েছে, “জান্নাত থেকে দুটি খাল কেটে এনে তাতে ফেলা হবে এবং এর সাহায্যে সেখান থেকে তাতে পানি সরবরাহ হবে।”
(মুসলিম: ২৩০০, মুসনাদে আহমাদ: ৪/৪২৪, ৫/১৫৯, ২৮০, ২৮১, ২৮২, ২৮৩)

আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন,

بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمِ بَيْنَ أَظْهُرِنَا إِذْ أَغْفَى إِغْفَاءَةً ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ مُنسِمًا فَقُلْنَا مَا أَضْحَكَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أُنْزِلَتْ عَلَيَّ أَئِفًا سُورَةٌ فَقَرَأَ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ (...) ، ثُمَّ قَالَ أَتَدْرُونَ مَا الْكَوْثِرُ؟ فَقُلْنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ : فَإِنَّهُ تَهْرٌ وَعَدَنِيهِ (أعطانيه ) رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ هُوَ حَوْضَ تَرِدُ عَلَيْهِ أُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ آنِيتُهُ عَدَدُ النُّجُومِ فَيُخْتَلَجُ الْعَبْدُ مِنْهُمْ فَأَقُولُ رَبِّ إِنَّهُ مِنْ أُمَّتِي فَيَقُولُ مَا تَدْرِي مَا أَحْدَثَتْ بَعْدَكَ

"একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে ছিলেন। তিনি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হন। এরপর তিনি হাঁসিমুখে মাথা উঠান। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি হাঁসছেন কেন? তিনি বলেন, এখন আমার উপরে একটি সূরা নাযিল করা হলো। অতঃপর তিনি সূরা কাউসার পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেন, তোমরা কি জানো কাউসার কী? আমরা বললাম: আল্লাহ এবং তার রাসূলই অধিক অবগত। তিনি বলেন: কাউসার হলো একটি নদী যা মহান আল্লাহ আমাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন (অন্য বর্ণনায়: যা তিনি আমাকে প্রদান করেছেন)। তাতে রয়েছে অনেক কল্যাণ। এ হলো হাউয, যেখানে আমার উম্মাত কিয়ামতের দিন আমার নিকট আগমন করবে। তার পানপাত্রগুলি তারকারাজির ন্যায়। কোনো কোনো বান্দাকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক, এ তো আমার উম্মাতের একজন। তখন তিনি বলবেন, আপনি জানেন না, আপনার পরে এরা কি নব-উদ্ভাবন করেছিল। "
(মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩০০)

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ حَوْصَى أَبْعَدُ مِنْ أَيْلَةَ مِنْ عَدِنٍ لَهُوَ أَشَدُّ بَيَاضًا من الثلج وأحلى من من عدد النجوم وإني لأصدُّ النَّاسِ عنه كما يصد الرجل إبل النَّاسِ عَنْ حَوْضِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَعْرِفْنَا يَوْمَئِذٍ قَالَ نَعَمْ لَكُمْ سِيما العسل باللي ليست لأحد من الأمم تَردُونَ عَلَيَّ غُرَّا مُحَجَّلِينَ مِنْ أَثَرِ الْوُضُوءِ

"আদান (ইয়ামান) থেকে আইলা (ফিলিস্তিন)-এর যে দূরত্ব তার চেয়ে বেশি প্রশস্ততা আমার হাউযের। তার পানি বরফের চেয়েও বেশি শুভ্র এবং মধু মিশ্রিত দুগ্ধের চেয়েও বেশি মিষ্ট। তার পানপাত্রগুলি সংখ্যা আকাশের তারকারাজির চেয়েও বেশি। একজন মানুষ যেমন তার হাউয থেকে অন্য মানুষদের উট ঠেকিয়ে রাখে আমি তেমন ভাবে আমার উম্মাত ছাড়া অন্য মানুষদের ঠেকিয়ে রাখব। সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাদেরকে চিনবেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, তোমদের এমন একটি চিহ্ন রয়েছে যা অন্য কোনো উম্মাতের নেই, তোমরা আমার নিকট যখন আগমন করবে তখন ওযুর কারণে তোমাদের ওযুর অঙ্গগুলি শুভ্রতায় উদ্ভাসিত থাকবে। "
(মুসলিম, আস-সহীহ ১/২১৭, ৪/১৭৯৮-১৭৯৯)

অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ وَزَوَايَاهُ سَوَاءٌ وَمَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنْ الْوَرِقِ (مِنْ اللَّبَنِ) وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَا يَظْمَأُ بَعْدَهُ أَبَدًا

‘‘আমার হাউযের প্রশস্ততা একমাসের পথ। এর সকল কোণ সমান। এর পানি দুধের চেয়েও (অন্য বর্ণনায় রৌপ্যের চেয়েও) শুভ্র এবং মেশকের চেয়েও অধিক সুগন্ধ। তার পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির ন্যায়। যে ব্যক্তি এ থেকে পান করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।’’
(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২৪০৫; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৯৩)

আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ قَدْرَ حَوْضِي كَمَا بَيْنَ أَيْلَةَ وَصَنْعَاءَ مِنْ الْيَمَنِ وَإِنَّ فِيهِ مِنْ الأَبَارِيقِ كَعَدَدِ نُجُومِ السَّمَاءِ

"ফিলিস্তিন থেকে ইয়ামানের সান'আ পর্যন্ত যে দূরত্ব আমার হাউযের পরিমান তদ্রূপ। তথায় পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির ন্যায়। "
(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২৪০৫; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৮০০)

সাহল ইবনু সা'দ, আবু সাইদ খুদরী ও আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الْحَوْضِ مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأُ أَبَدًا لَيرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِقْهُمْ وَيَعْرِفُونِي ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ، فَأَقُولُ: إِنَّهُمْ مِنِّي فَيُقَالُ إِنَّكَ لا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ في رواية: إِنَّكَ لا تَدْرِي مَا عَمِلُوا بَعْدَكَ) فَأَقُولُ سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيْرُ بَعْدِي.

"আমি আগে হাউযে গিয়ে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব। যে আমার কাছে যাবে সে (হাউয) থেকে পান করবে, আর যে পান করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। অনেক মানুষ আমার কাছে (হাউযে পানি পানের জন্য) আসবে, যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে, কিন্তু তাদেরকে আমার কাছে আসতে দেওয়া হবে না, বাধা দেওয়া হবে। আমি বলব: এরা তো আমারই উম্মত। তখন উত্তরে বলা হবে: আপনি জানেন না, এরা আপনার পরে কী-সব নব উদ্ভাবন করেছিল। (দ্বিতীয় বর্ণনায়: আপনার পরে তারা কী আমল করেছে তা আপনি জানেন না।) তখন আমি বলব: যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে তারা দূর হয়ে যাক! তারা দূর হয়ে যাক!!"
(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২৪০৬, ৬/২৫৮৭; মুসলিম, আস-সহীহ ১/২১৮, ৪/১৭৯৩-১৭৯৫)

🤲তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত, নবীজির প্রতিটি সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা এবং বিদআত শিরক থেকে নিজেকে বিরত রাখা। অন্যথায় হাউজে কাওসারের পানি পান করার নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হতে হবে। মহান আল্লাহ সবাইকে বিদআত শিরক থেকে নিজেকে বিরত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

📌পোস্টের তথ্যগুলো ইনশাআল্লাহ্ কাজে লাগতে পারে তাই Save করে রাখুন এবং “সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে— দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য আপনার আপনজনের কাছে পৌঁছে দিন।

🎯 হাউজে কাওসারের পানির স্বাদ কেমন হবে?
কমেন্টে লিখুন।

💡➜ আপনাদের জন্য পরবর্তী পর্ব: “হাশরের মাঠে শাফাআত করার অধিকার কার থাকবে?

#হাউজেকাওসার

28/08/2026

মৃত্যুর পর কি সত্যিই
আরেকটি জীবন আছে?

ঈমান সিরিজঃ পর্ব ০৬

🍀কোরআনে পরকালে বিশ্বাসকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, স্রষ্টায় বিশ্বাস সকল সমাজের সকল মানুষের মধ্যে সার্বজনীন বিশ্বাস, যা মানুষের জন্মগত অনুভূতির অংশ। পরকালের জীবনে বিশ্বাস ছাড়া স্রষ্টার প্রতি এই বিশ্বাস অর্থহীন হয়ে যায়। এই অর্থহীন বিশ্বাস ছিল মক্কার কাফিরদের মধ্যে। মক্কার কাফিরেরা ঈমানের অন্যান্য কিছু বিষয় বিকৃতভাবে বিশ্বাস করলেও তাদের মধ্যে অনেকেই পরকালে বা পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করত না এবং অনেকে অস্পষ্টভাবে কিছু ধারণা পোষণ করত। কোরআন কারীমে কাফিরদের এ বিভ্রান্তি এবং আখিরাতে বিশ্বাসের আবশ্যকতা, যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব বারংবার আলোচনা করা হয়েছে। অনুরূপভাবে আখেরাতের বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে তাদের অবিশ্বাস বিষয়ক যুক্তি-তর্ক খণ্ডন করা হয়েছে এবং সেগুলির অসারতা প্রমাণ করা হয়েছে।
কোরআনের আলোকে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহে বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পরকালীন জীবনে বিশ্বাস করা। কোরআন কারীমে ঈমানের নির্দেশনা জ্ঞাপক আয়াতগুলিতে সর্বদা 'আখিরাত' বা 'শেষ দিবসে' ঈমান আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

🍀পরকাল বা আখিরাতে ঈমানের অর্থ হলো, মৃত্যুর পরে কি ঘটবে সে বিষয়ে পবিত্র কোরআনে এবং সহীহ হাদীসে যা কিছু বর্ণনা আছে তা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করা। যেমন কবরের প্রশ্ন, পুরস্কার ও শাস্তি, কিয়ামতের আলামত বা পূর্বাভাসসমূহ, কিয়ামত বা পূনরূত্থান, শেষ বিচার, আমলনামা প্রদান, আল্লাহর মীযান ও মানুষের কর্ম ওযন করা, রাসূলুল্লাহ -এর হাউয, জাহান্নামের উপর সিরাত, শাফায়াত, জান্নাত, জাহান্নাম, জান্নাতের নিয়ামত, জাহান্নামের শাস্তি, আল্লাহর দর্শন ইত্যাদি। এ সকল বিষয় বিশ্বাস করা ঈমানের অন্যতম রুকন। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বিষয় কয়েক পর্বে আমরা জানার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্।

(১) কবর

☘️কবর মূলতঃ শুধু নির্দিষ্ট গর্তকে বলা হয় না, কবর বলতে আসলে বুঝায় মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে হাশরের ময়দানে পুনর্জীবিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কালীন জগতকে। এ জগতকে কবর জগৎ, আলমে বরযখ বা বরযখের জগৎ বলা হয়। মৃত্যুর পর মানুষের মরদেহ যেখানেই যেভাবে থাকুক না কেন সে কবর জগতের অধিবাসী হয়ে যায় এবং বদকার হলে তার উপর আযাব চলতে থাকে। কবরের এ আযাব মূলতঃ হয় রূহের উপর এবং রূহের সাথে সাথে দেহও সে আযাব উপলব্ধি করে থাকে। তাই দেহ যেখানেই যেভাবে থাকুক না কেন, জ্বলে পুড়ে ছাই বা পঁচে গলে মাটি হয়ে যাক না কেন, তার যে অংশ অবশিষ্ট থাকবে সেটুকু আযাব উপলব্ধি করবে। আর মৌলিক ভাবে আযাব যেহেতু রূহের উপর হবে, তাই কবরের আযাব হওয়ার জন্য এই দেহ অবশিষ্ট থাকাও অপরিহার্য নয়।
কোরআন কারীমে বলা হয়েছে:

حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا ترَكْتُ كَلا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ.

"যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে পুনরায় প্রেরণ কর। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি পূর্বে করি নি। না, এ হওয়ার নয়। এ তো তার একটি উক্তি মাত্র। তাদের সম্মুখে 'বারযাখ' (প্রতিবন্ধক বা পৃথকীকরণ সময়কাল) থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। "
(সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০)

☘️কবরে প্রত্যেক মানুষের সংক্ষেপে কিছু পরীক্ষা হবে। মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার পরে তার 'রূহ' তাকে ফেরত দেওয়া হবে এবং মুনকার ও নাকীর নামক দুজন ফেরেস্তা কবরবাসীকে প্রশ্ন করবে-
তোমার রব কে?
তোমার দ্বীন কি?
তোমার রাসূল কে?
সে নেককার হলে এ প্রশ্নাবলীর উত্তর সঠিক ভাবে দিতে সক্ষম হবে। তখন তার কবরের সাথে এবং জান্নাতের সাথে দুয়ার খুলে যোগাযোগ স্থাপন করে দেয়া হবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে সুখে বসবাস করতে থাকবে। আর নেককার না হলে (অর্থাৎ, কাফের বা মুনাফেক হলে) প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরেই সে বলবে হা-হা লা-আদরী'
(هَاهَا لَا أَدْرِي)
অর্থাৎ, হায় হায় আমি জানি না! তখন জাহান্নামের ও তার কবরের মাঝে দুয়ার খুলে দেয়া হবে এবং বিভিন্ন রকম শাস্তি তাকে দেয়া হবে।

ইমাম আবু হানীফা (রাহ) বলেন:

وسؤال منكر ونكير حق كائن في القبر، وإعادة الروح إلى جسد العبد في قبره حق، وضغطة القبر وعذابه حق كائن للكفار كلهم ولبعض عصاة المؤمنين.

"মুনকার ও নাকীরের প্রশ্ন সত্য, যা কবরের মধ্যে হবে, কবরের মধ্যে বান্দার রূহকে দেহে ফিরিয়ে দেওয়া সত্য। কবরের চাপ এবং কবরের আযাব সত্য, কাফিররা সকলেই এ শাস্তি ভোগ করবে এবং কোনোকোনো পাপী মুমিনও তা ভোগ করবে। "
(শারহুল ফিকহিল আকবার, পৃ: ১৭০-১৭২)

☘️কোরআন-হাদীসে অগণিত স্থানে পৃথিবীর ধ্বংস, পুনরুত্থান ও হাশর বা সমাবেশের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেন:

يَوْمَ تَبَدَّلُ الأرْضُ غَيْرُ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ وَتَرَى الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ مُقَرَّنِينَ فِي الأَصْفَادِ سَرَابِيلُهُمْ مِنْ قَطِرَانٍ وَتَغْشَى وُجُوهَهُمُ النَّارُ لِيَجْزِيَ اللَّهُ كُلَّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

"যে দিন এ পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও; এবং মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহ্ সম্মুখে- যিনি এক, পরাক্রমশালী। সে দিন তুমি অপরাধিগণকে দেখবে শৃঙ্খলিত অবস্থায়। তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং অগ্নি আচ্ছন্ন করবে তাদের মুখমণ্ডল। এ এজন্য যে, আল্লাহ প্রত্যেককে কৃতকর্মের প্রতিফল দিবেন। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।"
(সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৪৮-৫১)

☘️পুনরুত্থানের পরে হিসাব এবং প্রতিফল দানের বিষয়ে কোরআন কারীমের অসংখ্য স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেন:

يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ

"সে দিন আল্লাহ তাদেরকে প্রাপ্য প্রতিফল পুরাপুরি দিবেন এবং তারা জানবে, আল্লাহই সত্য স্পষ্ট প্রকাশক। "
(সূরা নুর, আয়াত:৩৫)

অন্যত্র বলা হয়েছে:

وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا

"প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে পাবে উম্মুক্ত। 'তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্য যথেষ্ট।"
(সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত:১৩-১৪)

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَى رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا وَيَنْقَلِبُ إِلَى أَهْلِهِ مَسْرُورًا وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ فَسَوْفَ يَدْعُو ثُبُورًا وَيَصْلَى سَعِيرًا إِنَّهُ كَانَ فِي أَهْلِهِ مَسْرُورًا إِنَّهُ ظَنَّ أَنْ لَنْ يَحُورَ بَلَى إِنَّ رَبَّهُ كَانَ بِهِ بَصِيرًا

"হে মানুষ তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট পৌছানো পর্যন্ত কঠোর সাধনা করে থাক, পরে তুমি তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করবে। যাকে তার আমলনামা তার দক্ষিণ হস্তে দেওয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেওয়া হবে। এবং সে তাহার স্বজনদিগের নিকট প্রফুলচিত্তে ফিরে যাবে। এবং যাকে তার আমলনামা তার পৃষ্ঠের পশ্চাৎদিক হতে দেওয়া হবে সে অবশ্য তার ধ্বংস আহবান করিবে; এবং জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করবে; সে তার স্বজনদিগের মধ্যে তো আনন্দে ছিল। সে ভাবত যে, সে কখনই ফিরে যাবে না; নিশ্চয় ফিরে যাবে; তার প্রতিপালক তার উপর সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন। "
(সূরা ইনশিকাক, আয়াত: ০৬-১৫)

🤲উপরোল্লেখিত সকল বিষয়ের প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস রাখা আমাদের সকলের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে ঈমানের সকল শাখা - প্রশাখার উপর ঈমান রাখার তওফিক দান করুক।

📌পোস্টের তথ্যগুলো কখনো কাজে লাগতে পারে তাই Save করে রাখুন এবং “সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে— দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য আপনার আপনজনের কাছে পৌঁছে দিন।”

🎯যে মুনাফেকি করে তাকে কি বলা হয়?
কমেন্টে লিখুন

💡➜ আপনাদের জন্য পরবর্তী পর্ব: "হাউযে কাওসার" থেকে যাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে—তাদের মধ্যে কি আপনি আছেন?

25/08/2026

একজন মুসলিম কি শুধু কোরআনেই ঈমান রাখে ?

ঈমান সিরিজ: পর্ব ০৫

🍀ঈমানের অন্যতম রুকন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস করা। কোরআন ও হাদীসে বিভিন্ন স্থানে 'আল্লাহর গ্রন্থসমূহে' বিশ্বাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যারা তাতে বিশ্বাস করে না তাদের ভয়ঙ্কর বিভ্রান্তির কথা বলা হয়েছে।

আল্লাহর কিতাবসমূহে বিশ্বাস করার সাধারণ প্রকাশ এই যে, মুমিন সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলদের নিকট ওহীর মাধ্যমে 'কিতাব' প্রেরণ করেছেন, যেগুলি সন্দেহাতীতভাবে আল্লাহর বাণী, আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য হেদায়াত, মানবজাতির পথনির্দেশত নূর। তবে সেগুলি বিকৃত বা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তাই আল্লাহ সর্বশেষ কিতাব 'আল-কোরআন' নাযিল করেছেন পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের সত্যতা ঘোষণা করতে, সেগুলির স্থান পূরণ করতে এবং পূর্ববর্তী সকল কিতাবকে রহিত করতে। এই সর্বশেষ কিতাব কোরআনের মধ্যেই সকল কিতাবের নির্যাস ও মানব জাতির মুক্তির পথ রয়েছে।

☘️মানব জাতির ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মঙ্গলের পথ প্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ যুগে-যুগে তাঁর নবী রাসূলদের কাছে ওহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে কিতাব নাযিল করেছেন। আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থসমূহে ছিল সংশিষ্ট জাতি বা সমাজের জন্য সত্য ও সৎ পথের দিশা। আমরা তাই সাধারণভাবে বিশ্বাস করি যে, যুগে-যুগে নবী রাসূলগণের কাছে আল্লাহ তাঁর বাণী গ্রন্থ আকারে প্রেরণ করেছেন, যার মধ্যে তিনি তৎকালীন মানব সমাজের জন্য সত্য, সৎ কল্যাণ ও মঙ্গলের পথের নির্দেশনা দান করেছেন। আল্লাহ কতিপয় নবীর (আ) নাম উল্লেখ করে তাঁদের উপর অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:

آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا تُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

"তোমরা বল আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহতে, এবং আমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাঁর বংশধরগণের উপররে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, এবং মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা দেওয়া হয়েছে, সবকিছুর উপরে আমরা বিশ্বাস আনয়ন করেছি। আমরা তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করিনা এবং আমরা তাঁর (আল্লাহ) নিকট আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।
(সূরা বাকারা, আয়াত:১৩৬)

☘️কোরআন ও হাদীসে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের মধ্য থেকে 'তাওরাত', 'যাবুর' ও 'ইনজীল'- এই তিনটি পুস্তকের কথা বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। এ তিনটি গ্রন্থ সম্পর্কে কোরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি জানতে পারি:

প্রথমত: আল্লাহ তিনজন প্রসিদ্ধ নবীকে গ্রন্থত্রয় প্রদান করেছিলেন।

(১) তাওরাত: আল্লাহ তাঁর নবী মূসা (আ)-এর কাছে তাওরাত নামক গ্রন্থ ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করেন। কোরআনে আল্লাহ বলেন:
ثُمَّ أَتينا مُوسَى الْكِتَابَ تَمَامًا عَلَى الَّذِي أَحْسَنَ وَتَفْصِيلا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَعَلَّهُمْ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ

"এবং মূসাকে দিয়েছিলাম কিতাব যা সৎকর্মপরায়ণের জন্য সম্পূর্ণ, যা সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, পথ-নির্দেশ এবং দয়া-স্বরূপ, যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশ্বাস করে।"
(সূরা আন'আম, আয়াত:১৫৪)

(২) যাবুর: মহান আল্লাহ তাঁর নবী দাউদ (আ)-কে যাবুর গ্রন্থ প্রদান করেন। মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ وَأَتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا

"আমি নবীগণকে কারো উপরে কারো অতিরিক্ত মর্যাদা দিয়েছি; এবং দাউদকে আমি যাবুর প্রদান করি।"
(সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত:৫৫)

(৩) ইনজীল: আল্লাহ তাঁর নবী ঈসা (আ)-কে যে গ্রন্থ প্রদান করেন তার নাম ছিল "ইনজীল"। আল্লাহ বলেন:

وَقَفَّيْنَا عَلَى أَثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَأَتَيْنَاهُ الإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ

"মারয়াম-তনয় ঈসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে তাদের পশ্চাতে প্রেরণ করেছিলাম এবং তাকে ইনজীল দিয়েছিলাম তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে এবং মুত্তাকীদের জন্য পথের নির্দেশ ও উপদেশরূপে; তাতে ছিল পথের নির্দেশ ও নূর (আলো)।"
(সূরা মায়েদা, আয়াত:৪৬)

🍀মানবজাতিকে কল্যাণ ও মুক্তির পথে আহবানের জন্য আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ গ্রন্থ আল-কোরআনুল কারীম, যা তিনি তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট নবী মুহাম্মদ ﷺ -এর উপর অবতীর্ণ করেন। পবিত্র কোরআনই আল্লাহর প্রেরিত চূড়ান্ত ও সর্বশেষ গ্রন্থ। কোরআন কারীমে মানবজাতির সকল কল্যাণ, সকল মঙ্গল ও সকল সফলতার উৎস। আল্লাহর এই সর্বশেষ গ্রন্থকে আল্লাহ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা পূর্বের গ্রন্থগুলিকে দেননি।

কোরআন কারীমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর অলৌকিকত্ব। পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণকে মহান আল্লাহ অনেক 'আয়াত' বা মুজিযা প্রদান করেছেন। সেগুলি ছিল তাৎক্ষণিক ও তৎকালীন। তাঁদের সমসাময়িক মানুষেরা সেগুলি প্রত্যক্ষ করেছেন। তবে পরবর্তী মানুষেরা আর তা প্রত্যক্ষ করেন নি। কেবল বর্ণনার মাধ্যমে জেনেছেন। মহানবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে মহান আল্লাহ অন্যান্য অগণিত আয়াত বা মুজিযার পাশাপাশি 'চিরন্তন' মুজিযা হিসেবে আল-কোরআন প্রদান করেন।

☘️কোরআন কারীমের অনন্য আরেকটি অলৌকিক দিক এর সংরক্ষণ। মহান আল্লাহ কোরআনকে অবিকল ও আক্ষরিকভাবে সংরক্ষণ করেছেন। পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের উপর অবতীর্ণ কিতাবগুলি বিলুপ্ত বা বিকৃত হয়েছে। যেহেতু মহাগ্রন্থ আল-কোরআনকে আল্লাহ পরবর্তী সকল যুগের মানুষদের জন্য অবতীর্ণ করেছেন, তাই তিনি নিজে এর সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ বলেন:

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

"নিশ্চয় আমিই কোরআন অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চিতরূপেই আমি তাঁর সংরক্ষক। "
(সূরা হিজর, আয়াত:০৯)

☘️পবিত্র কোরআনই আল্লাহর একমাত্র অবিকৃত ও পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত বাণী, যাকে আল্লাহ সকল যুগের সকল মানুষের মুক্তির জন্য সত্য, কল্যাণ ও মঙ্গলের পথের দিশারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এর অনুসরণই মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ। কল্যাণ, বরকত, সফলতা ও মুক্তির সন্ধান দিয়ে মানুষকে তার কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছাতে পারবে একমাত্র এই গ্রন্থই। আল্লাহ এই মহা গ্রন্থকে প্রেরণ করেছেন তা অনুধাবন করার জন্য এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবন পরিচালনার জন্য। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدْ جَآءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَآءٌ لِّمَا فِى ٱلصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ

"হে মানব জাতি, তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপদেশ এবং তোমাদের অন্তরের মধ্যে যা রয়েছে তার প্রতিকার এবং সঠিক পথের পথনির্দেশ ও রহমত মুমিনদের জন্য।"
(সূরা ইউনূস, আয়াত:৫৭)

🍀এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহর গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস করা ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের অন্যতম অংশ। প্রতিটি বিশ্বাসী মুসলিম আল্লাহর প্রেরিত সকল গ্রন্থে বিশ্বাস করেন। কুরআন কারীমের পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে আমাদের বিশ্বাস মৌলিক সত্যতায় বিশ্বাস ও সম্মান দানে সীমাবদ্ধ, আর কুরআনের প্রতি আমাদের বিশ্বাস কর্মময়। আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ মানবজাতির সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে-যুগে যত গ্রন্থ প্রেরণ করেছেন সবই সত্য এবং সবই আল্লাহ বাণী। তবে যেহেতু পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থ বিলুপ্ত বা বিকৃত হয়েছে, তাই সেসকল গ্রন্থের অনুসরণ বা তদুনুযায়ী জীবন পরিচালনা সম্ভব নয়। কোরআন কারীমকে আল্লাহ সর্বশেষ গ্রন্থ হিসেবে সর্বকালের সকল মানুষের জন্য অবতারিত করেছেন এবং তাঁর বিশুদ্ধতাকে রক্ষা করেছেন। প্রতিটি বিশ্বাসী মুসলিম পবিত্র কোরআনকে আল্লাহর একমাত্র সংরক্ষিত বিশুদ্ধ বাণী বলে বিশ্বাস করেন এবং এর শিক্ষা অনুসারে জীবন পরিচালনা করেন।

📌পোস্টের তথ্যগুলো কখনো কাজে লাগতে পারে তাই Save করে রাখুন এবং “সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে— দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য আপনার
আপনজনের কাছে পৌঁছে দিন।

🎯 আপনি কি পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআন সহীহ শুদ্ধভাবে তেলাওয়াত করতে পারেন?
কমেন্টে লিখুন

💡➜ আপনাদের জন্য পরবর্তী পর্ব: মৃত্যুর পর কি সত্যিই আরেকটি জীবন আছে?

22/08/2026

একজন মুমিন কি পূর্বের কোনো নবীকে অস্বীকার করতে পারেন?

ঈমান সিরিজ : পর্ব ০৪

🌱 জিন ও ইনসানের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ আসমান থেকে যে কিতাব প্রেরণ করেন সেই কিতাবের ধারক বাহক বানিয়ে সেই কিতাব বুঝানো ও ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য তথা আল্লাহর বাণী হবহু পৌঁছে দেয়ার জন্য এবং আমল করে আদর্শ দেখানোর জন্য আল্লাহ নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জিন ও মানব জাতির নিকট তাঁদেরকে প্রেরণ করেছেন। তাঁদেরকে বলা হয় নবী বা পয়গম্বর। এই নবীদের মধ্যে বিশেষ ভাবে যারা নতুন কিতাব প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁদেরকে বলা হয় রাসূল, আর যারা নতুন কিতাব প্রাপ্ত হননি বরং পূর্ববর্তী নবীর কিতাব প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদেরকে শুধু নবী বলা হয়। তবে সাধারণ ভাবে নবী, রাসূল, পয়গম্বর সব শব্দগুলো একই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

☘️ কুরআনের বর্ণনা অনুসারে আমরা জানতে পারি যে, মহান আল্লাহ সকল যুগে সকল সমাজেই নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন।

তিনি বলেন:

وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ

"প্রত্যেক জাতিতেই সর্তককারী প্রেরণ করা হয়েছে। " (১)

অন্য আরেক আয়াতে বলা হয়েছে:

وَرُسُلا قد قصصاهُمْ عَليك من قبل وَرُسُلًا لَمْ تَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ

"অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের কথা ইতোপূর্বে আপনাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের কথা আমি আপনাকে বলি নি। " (২)

☘️ কুরআনে ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে: আদম, ইদরিস, নূহ, হুদ, সালিহ, ইবরাহীম, লুত, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসূফ, আইয়ূব, শুয়াইব, মূসা, হারুন, ইউনূস, দাউদ, সুলাইমান, ইলইয়াস, ইলইয়াসা, যুলকিফল, যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা, মুহাম্মাদ ﷺ । (৩)

🌱 নবী ও রাসূলদের প্রতি ঈমান রাখার অর্থ হল প্রধানতঃ নিম্নোক্ত বিষয়াবলীতে বিশ্বাস রাখা।

১. নবীগণ নিষ্পাপ-তাঁদের দ্বারা কোন পাপ সংঘটিত হয়না।

২. নবীগণ মানুষ, তাঁরা খোদা নন বা খোদার পুত্র নন বা খোদার রূপান্তর (অবতার) নন বরং তাঁরা খোদার প্রতিনিধি ও নায়েব। আল্লাহর বাণী অনুসারে জিন ও মানুষ জাতিকে হেদায়েতের জন্য তাঁরা দুনিয়াতে প্রেরিত হন।

৩. নবীগণ আল্লাহর বাণী হুবহু পৌঁছে দিয়েছেন।

৪. নবীদের ছিলছিলা হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর শেষ হয়েছে।

৫. আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং তিনি খাতামুন্নাবী অর্থাৎ, তাঁর পর আর কোন নবী আসবে না। অন্য কেউ নবী হওয়ার দাবী করলে সে ভন্ড এবং কাফের।

৬. নবীগণ কবরে জীবিত। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কবরে জীবিত আছেন। তাঁর রওযায় সালাম দেয়া হলে তিনি শুনতে পান এবং উত্তর প্রদান করে থাকেন। অন্য কোন স্থানে থেকে নবীর প্রতি দুরূদ সালাম পাঠ করা হলে নির্ধারিত ফেরেশতারা নবী ﷺ-এর নিকট তা পৌঁছে দেন।

৭. হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত যত পয়গম্বর এসেছেন, তাঁদের সকলেই হক ও সত্য পয়গম্বর ছিলেন, সকলের প্রতিই ঈমান রাখতে হবে। তবে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের পর অন্য নবীর শরী'আত রহিত হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরী'আত ও তাঁর আনুগত্যই চলবে।

৮. নবীদের দ্বারা তাঁদের সত্যতা প্রমাণিত করার জন্য অনেক সময় অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। এসব অলৌকিক ঘটনাকে 'মু'জিযা' বলে। মু'জিযায় বিশ্বাস করাও ঈমানের অঙ্গীভূত।

🌱 কুরআন কারীমে উলিখিত নবী-রাসূলগণকে আমরা নির্দিষ্টভাবে আল্লাহর মনোনীত নবী হিসেবে বিশ্বাস করি। এঁদের সবাইকে আমরা ভালবাসি ও শ্রদ্ধা করি। আমরা বিশ্বাস করি যে, তারা সবাই নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী পবিত্র মানুষ ছিলেন। তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁদের প্রতি প্রদত্ত দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন। তাঁরা সবাই আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নবী ছিলেন। এঁদের নবুয়ত বা রিসালত আমরা অস্বীকার করিনা। কেউ যদি এঁদের কারো নবুয়ত বা রিসালাত অস্বীকার করেন, অথবা এঁদের ঘৃনা বা অবমাননা করেন তিনি অবিশ্বাসী বা কাফির বলে গণ্য হবেন।

☘️ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'লা বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ يُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ أُولَئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا

"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণে অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহে ঈমান এবং তাঁর রাসূলগণে ঈমানের মধ্যে তারতম্য করতে চায়, এবং বলে: 'আমরা কতককে বিশ্বাস করি এবং কতককে প্রত্যাখ্যান করি' এবং এর মধ্যবর্তী কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়, তারাই প্রকৃত কাফির, এবং কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণে ঈমান আনে এবং তাদের একের সাথে অপরের পার্থক্য করে না তাদেরকে তিনি পুরস্কার দিবেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। "(৪)

এভাবে আমরা সকল নবীকে সমান সম্মানের সাথে বিশ্বাস করি আরো বিশ্বাস করি যে, তাঁদের মধ্যে কারো মর্যাদা আল্লাহর কাছে অন্যদের চেয়ে বেশি। আর সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

📌পোস্টের তথ্যগুলো কখনো কাজে লাগতে পারে তাই Save করে রাখুন এবং “সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে— দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য আপনার আপনজনের কাছে পৌঁছে দিন।”

🎯 নবীদের বিষয়ে এই বিষয় গুলো কি আপনি জানতেন?
কমেন্টে লিখুন।

💡➜ আপনাদের জন্য পরবর্তী পর্ব: “একজন মুসলিম কি শুধু কোরআনেই ঈমান রাখে?”

📚 রেফারেন্স
(১) সূরা ফাতির, আয়াত: ২৪
(২) সূরা নিসা, আয়াত: ১৬৪
(৩) ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৫৮৬; কুরতুবী, তাফসীর ৩/৩১
(৪)সূরা নিসা, আয়াত: ১৫০-১৫২

Website

Address


Dhaka