Naim's Creation
আপনি যদি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যে ভালোবাসেন, পড়তে ভালোবাসেন তবে আমার এই পেইজ আপনার জন্যই। স্বাগতম
16/10/2025
আসছে খুব শীঘ্রই....
গল্পের নাম : #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ৷ জুলকার নাঈম
১৯তম অধ্যায়: ঘুমন্ত মানুষ দেখতে নিষ্পাপ (সমাপ্তি)
শেষ বিকেলের আলো পড়ে আছে চরভদ্রাসনের ধূলিমাখা পথে। গ্রামের মানুষজন ফিরে গেছে নিজেদের কাজে, আর কুয়াশা ধীরে ধীরে নামে এক নিঃশব্দ চাদরের মতো।
অমি আবার দাঁড়ায় সেই পুরনো ঘরের সামনে—যেখানে সব শুরু হয়েছিল।
ঘরের দরজা এখন খোলা, ভেতরে হাওয়া ঢুকছে, কিন্তু ভয়ের কোনো গন্ধ নেই। দেয়ালে টানানো পুরনো ছবি যেন নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
একটু থেমে সে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। মেঝেতে সেই জায়গাটা যেখানে একদিন সে অন্ধকার আর প্রতীকের মাঝে ঘোরাফেরা করেছিল—আজ সেখানে সূর্যরশ্মির রেখা এসে পড়েছে।
হঠাৎ, একটানা বাতাস বইতে থাকে। যেন কেউ ফিসফিস করে বলছে,
"শেষ হলো?"
অমি হেসে ফেলে—একটা শান্ত, ক্লান্ত, অথচ পরিপূর্ণ হাসি।
"শেষ না। উত্তরাধিকার শুরু হলো মাত্র।"
সে ঘরের মাঝখানে বসে পড়ে। চোখ বন্ধ করে।
তার মনে পড়ে তাহসিনের চোখ, সানজিদের উদ্বিগ্ন মুখ, মাওলানার শান্ত কণ্ঠ।
তারপর সে নিজেকে ভাবে—একজন দর্শক, যে এসে ছিল কেবল জানার জন্য।
কিন্তু এখন সে এক বর্ণনাকারী, এক জীবন্ত সাক্ষ্য।
বাইরে সন্ধ্যার আজান ভেসে আসে।
ঘরটা নিঃশব্দ।
অমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, দরজার দিকে পা বাড়ায়।
প্রস্থান করার সময় সে একবার পিছন ফিরে দেখে।
ঘরের ভেতরটা আর ভয়ানক নয়।
তাতে এখন কেবল সময় ঘুমিয়ে আছে—
নিষ্পাপ মুখে, কিন্তু ভিতরে অনেক প্রশ্ন লুকিয়ে রেখে।
---
মনে রাখবেন “ঘুমন্ত মানুষ দেখতে নিষ্পাপ”!
-----সমাপ্ত----
#নাঈম #ফেসবুক #গল্প #বাংলা_গল্প #ফেসবুকগল্প
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
১৭তম অধ্যায়: নিঃশব্দ সমাধির কাছে
চরভদ্রাসনের পুরনো কবরস্থান, যেখানে শত বছর ধরে সময় থেমে আছে—অমি আজ সেই নিঃশব্দতার কাছে এসে দাঁড়ায়। চারপাশে কুয়াশা জমে আছে, বাতাস ভারী, আর তার হাতে সেই পাথর, কাঠের ফলক, আর অজানা প্রতীকময় সুতোগুলো—যা সে সেই অভিশপ্ত ঘর থেকে সংগ্রহ করেছিল।
মাওলানা আশরাফুল ইসলাম তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “এই জিনিসগুলো কোনো সাধারণ বস্তু নয়। এদের পেছনে মানুষের পাপ, গোপন ইতিহাস, আর এক অব্যক্ত অভিশাপ আটকে আছে। এদের জায়গা কোনো জাদুঘর বা গবেষণাগারে নয়—এদের জায়গা হলো মাটির নিচে। যাতে মানুষ আবার নিজের মধ্যে ফিরে যেতে পারে, অহংকার না করে।”
অমি কিছু না বলে মাথা নিচু করে কবরের একটি পুরনো খোঁদাই করা অংশের পাশে বসে পড়ে। একে একে সে মাটির গভীরে পাথর, ফলক, আর অন্য জিনিসগুলো পুঁতে দেয়। প্রতিটি মুহূর্তে যেন তার হৃদয় থেকে কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে—ভয়, সন্দেহ, প্রশ্ন।
শেষমেশ মাটি সমান করে সে উঠে দাঁড়ায়। মাওলানা শান্ত গলায় বলে, “এইটা ছিল শেষ রীতির কাজ। এখন, তুমি নিজেও সেই অভিশাপ থেকে বের হতে পারো... যদি তোমার ভিতরের দ্বিধা মাটিতে ফেলে রেখে আসতে পারো।”
কবরস্থানের বাতাসটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এক ধরনের ভারী প্রশান্তি ভেসে আসে চারপাশে।
অমি মনে মনে বলে, “শেষ হলো না... কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে... তাহসিন, সানজিদ—তারা আসলে কে ছিল?”
---
---
১৮তম অধ্যায়: সত্যের মুখোমুখি
পরদিন সকাল। অমি বসে আছে মাওলানা আশরাফুল ইসলামের ঘরে। জানালা দিয়ে আলো আসছে, ধূপের ধোঁয়ায় ঘরটা হালকা ঘোলাটে। এক পাশে খোলা কোরআন শরীফ, দেয়ালের বইয়ের তাকের নিচে রাখা কিছু ধুলোমলিন পাণ্ডুলিপি।
মাওলানা ধীরে ধীরে তার সামনে এসে বসেন। চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন।
"তুমি জানো, তোমাকে এখানে আসতেই হতো," বললেন তিনি শান্ত গলায়।
"কারণ তুমি শুধু এই গল্পের একজন দর্শক ছিলে না… তুমি ছিলে মুক্তির পথ ধরে রাখা একজন নিয়ত ধারক।"
অমির মুখে বিস্ময়।
"তাহসিন আর সানজিদ... তারা কে ছিলো, মাওলানা সাহেব?"
এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন তিনি।
"তারা ছিল এই গ্রামেরই মানুষ। মানুষই। কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষ ছিল সেই প্রথম পাপের অংশীদার, যাদের কারণে এই ঘরে অভিশাপ নেমেছিল। তাহসিন আর সানজিদ জানতো তাদের বংশের অতীত। জানতো, তারা দায়মুক্ত নয়। আর জানতো—তুমি সেই ব্যক্তি, যে সেই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলে, শুরু হবে মুক্তির প্রক্রিয়া।"
"তারা কি জানতো কীভাবে সেটা শেষ করতে হবে?"
"না। এটাই তাদের সীমাবদ্ধতা ছিল। তারা জানতো না পুরো সমাধান। তাই তারা ভেবেছিল, শুধু তোমাকে ঘরে প্রবেশ করালেই অভিশাপ কেটে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। অভিশাপ তখনও জেগে ছিল। আর যেই মুহূর্তে তারা ঘর থেকে বের হয়ে কবরস্থানের সামনে গিয়েছিল… অতৃপ্ত এক আত্মা, যে সেই প্রথম পাপের সাক্ষী ছিল, তাদের হত্যা করে।"
অমির গলা শুকিয়ে যায়। চোখ ভিজে আসে।
"তাহলে… তাহসিন, সানজিদ... তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করলো?"
"তারা ভয় পায়নি। তারা ভুল করেছে—কিন্তু সেটা করেছে মুক্তির আশায়। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি, কারণ সেই পথেই তুমি সত্যের কেন্দ্রে পৌঁছাতে পেরেছো।"
মাওলানা এবার নিচু গলায় বলেন,
"তোমার মনে আছে, তুমি যে চাবি দিয়ে সেই লুকানো দরজাটা খুলেছিলে? ওই দরজার ওপাশেই ছিল পাপের উৎস, আর তোমার সাহসেই সেই ঘরের অভ্যন্তরের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর, তুমি যে রীতি অনুযায়ী প্রতীকগুলো মাটিতে সমাধিস্থ করলে—সেটাই ছিল শেষ ধাপ।"
অমি ধীরে ধীরে বলে,
"সব শেষ হলো তাহলে?"
মাওলানার ঠোঁটে এক শান্ত হাসি।
"তোমার জন্য নয়। কারণ তুমি এখন সেই ঘরের উত্তরাধিকারী—পাপ নয়, বরং দায়িত্বের। এখন এই ঘরের কাজ হবে সত্য প্রকাশ, আর সে সত্য আবার ঘুমিয়ে পড়বে একদিন… যেমন করে ঘুমায় মানুষ, নিষ্পাপ মুখে, কিন্তু বুকের ভেতর অনেক প্রশ্ন লুকিয়ে রেখে।"
অমির চোখে স্থির দৃষ্টি। ভয় নেই, কেবল এক গভীর প্রশান্তি।
---
চলবে.....
#গল্প #বাংলা #নাঈম #অমির #ফেসবুক #ফেসবুকগল্প
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
১৬তম অধ্যায়: আত্মার মুক্তির শর্ত
ভোরের আলো এখনো ঠিকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। হালকা কুয়াশায় মোড়া গ্রামের মেঠো পথ ধরে দ্রুত হেঁটে চলে অমি। পাথরটা এবার তার পকেটে নয়, বুকের কাছাকাছি গেঞ্জির ভিতরে, যেন কোনো লুকানো ব্যথার মতো।
সে পৌঁছায় ইমাম জুবায়ের আহমেদের ঘরে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস গুনে। ভেতর থেকে মৃদু কণ্ঠ ভেসে আসে—
“ঢুকে এসো, তুমি তো আর অচেনা নও।”
অমি ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। ইমাম সাহেব জানালার পাশে বসে আছেন। তাকিয়ে বললেন,
“তোমার চোখে আজ অন্য এক আলো। তুমি কিছু দেখেছো... তাই তো?”
অমি মাথা নিচু করে বলল,
“আমি সেই রাত দেখেছি। সেই মেয়েটাকে দেখেছি... আর বুঝেছি, আমি শুধু সত্য জানতে আসিনি। আমি সেই সত্যেরই অংশ।”
ইমাম সাহেব চোখ বন্ধ করে ধীরে বললেন,
“তাহলে সময় এসেছে, মাওলানা আশরাফুল ইসলামের কাছে আরেকবার যাওয়ার। আজ তিনি তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন—কিন্তু তার আগে জানতে চাইবেন, তুমি কি সত্যি প্রস্তুত?”
অমি দৃঢ় গলায় বলল, “হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত। যত ভয়াবহই হোক, আমি সত্য জানতেই এসেছি।”
দুজন একসাথে রওনা দেয় সেই পুরনো মাদ্রাসার দিকে। রাস্তা যেন আজ আরও নীরব, গাছেরা স্থির হয়ে আছে, যেন সময়ও অপেক্ষা করছে।
মাওলানা আশরাফুল ইসলাম আগেই প্রস্তুত ছিলেন। চোখ দুটো লালচে, গভীর ঘুমহীনতা আর অভিজ্ঞতার ছাপ তার মুখে।
তিনি বললেন,
“তুমি জানো পাপ কীভাবে তৈরি হয়?
পাপ তৈরি হয় যখন কেউ সত্য জানে, কিন্তু চুপ থাকে। আর অভিশাপ জন্মায় যখন সেই চুপ থাকা কোনো প্রাণ কেড়ে নেয়।”
অমি নিঃশব্দে মাথা নোয়ায়।
মাওলানা ধীরে বলেন,
“সেই মেয়েটির নাম ছিল মারুফা। সে এখানে এসেছিল তার চাচার বাড়িতে, ঈদের সময়। আর সেই রাতে... পাঁচজন যুবক তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রামের লোকজন জানত, কিন্তু ভয় আর সামাজিক রীতিতে মুখ বন্ধ করে রাখে।”
তিনি কিছুক্ষণ থেমে বলেন,
“তাদের একজন ছিল তোমার পূর্বপুরুষ—তোমার দাদা। আর এই অভিশাপ রয়ে গেছে রক্তের মধ্যে। কারণ সেই পাঁচজনের কেউই ক্ষমা চায়নি, কেউই শাস্তি পায়নি। মেয়েটির আত্মা আজও ঘুরে বেড়ায় সেই ঘরের আশেপাশে।”
অমি শিউরে ওঠে।
“তাহলে আমি কী করব এখন?” কণ্ঠটা কেঁপে যায়।
মাওলানা বলেন,
“তোমাকে সত্যটা প্রকাশ করতে হবে। শুধু এই গ্রামে নয়, তোমার নিজের আত্মার ভেতরেও।
তোমাকে সেই মেয়েটির আত্মার উদ্দেশ্যে কিছু করতে হবে—যা তার অপূর্ণতা পূর্ণ করে।
একটা নামহীন কবর পড়ে আছে মসজিদের পেছনে। সেখানেই সে শুয়ে আছে।
তুমি সেখানে গিয়ে তওবা করবে, ক্ষমা চাইবে—নিজের হয়ে, তোমার পূর্বপুরুষদের হয়ে।”
তিনি থেমে আবার বলেন,
“এবং... তুমি যদি সত্যিকারের ক্ষমা পাও, তাহলে শুধু তুমি না—এই গোটা গ্রামও মুক্তি পাবে।”
অমির চোখে পানি চলে আসে। সে জানে, তার পথ আর সহজ নয়।
কিন্তু এইবার সে দর্শক নয়।
সে নিজেই হতে চলেছে গল্পের শেষ অধ্যায়ের লেখক।
চলবে---
#বাংলাগল্প #ফেসবুকগল্প #পর্বগল্প
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
১৪তম অধ্যায়: ঘুমের ঘরে প্রবেশ
রাত ঘনিয়ে এসেছে। আকাশজুড়ে কালো মেঘ, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে—এক ধরনের অজানা অশান্তির পূর্বাভাস যেন। গ্রাম নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ আর হাওয়া গায়ের মধ্যে হিমেল কাঁপুনি বইয়ে দেয়।
অমি দাঁড়িয়ে থাকে সেই অভিশপ্ত ঘরের সামনে। সেদিন, যেদিন সে প্রথম এই ঘরের খবর পেয়েছিল, সে জানতো না—একদিন তাকে এই ঘরের ভেতর ঘুমাতে হবে, সত্যকে সামনে থেকে দেখতে হবে।
ইমাম সাহেব আর মাওলানা আশরাফুল ইসলাম দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“সব কিছু ভয়ের মতো মনে হবে, কিন্তু ভয় পেয়ো না,” মাওলানা বলেন। “তুমি যদি ভিতর থেকে দৃঢ় থাকতে পারো, সত্য নিজেই তোমার সামনে খুলে যাবে।”
অমি মাথা নিচু করে ঘরে প্রবেশ করে।
ঘরটি নিঃসঙ্গ, মাটির মেঝে, সাদা রঙের ফাটা দেয়াল আর এক কোণে একটি কাঠের খাট। বাতি নেই, শুধু একটি ছোট্ট কেরোসিন ল্যাম্প।
সে ধীরে ধীরে খাটে বসে। পকেট থেকে পাথরখানি বের করে বালিশের নিচে রাখে। বাতির আলো ম্লান হয়ে আসে। ঘরটি নিঃস্তব্ধ।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুজে আসে অমির।
ঘুম নয়—এ যেন এক প্রবেশদ্বার, এক আলাদা জগতে পদার্পণ।
হঠাৎ সে দেখতে পায়...
পাঁচজন মানুষ, একটি গোল টেবিল ঘিরে বসে আছে। তাদের চোখে আতঙ্ক, কিন্তু মুখে নিঃশব্দতা। একজন কাঁদছে, একজন চোখ বন্ধ করে আছে, একজন দাঁত চেপে ধরে আছে মেঝের দিকে তাকিয়ে। আরেকজন কিছু একটা লিখছে কাগজে, আর শেষজন—সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে:
“আমরা চুপ থাকলে কেউ জানবে না। এই সত্য কেউ জানবে না। ভুলে যাও, এটা কোনোদিন ঘটেনি।”
অমি এই দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠে।
এদের কেউ একজন তার মতোই দেখতে। অথবা... এটা কি তার পূর্বপুরুষ? তার ভিতরের রক্তের স্মৃতি?
সে এক পা এগিয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ, চারপাশে দেয়াল গলে যেতে শুরু করে। টেবিল, লোকগুলো, সবকিছু কুয়াশায় মিলিয়ে যায়।
তারপর—এক কণ্ঠ ভেসে আসে...
“তুমি দেখছো, কারণ তুমি প্রস্তুত। কিন্তু এখনো সময় হয়নি প্রশ্ন করার। ঘুমের শেষেই শুরু হবে জাগরণ।”
অমি ধাক্কা খেয়ে উঠে বসে পড়ে। ঘরে তখনও অন্ধকার, বাতি নিভে গেছে।
তার হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছে। সে জানে—এটা ছিল শুধুই শুরু।
এই ঘুম... এই ঘর... এবং এই পাপ—সব কিছু এখনো তার সামনে একে একে উন্মোচিত হবে।
---
১৫তম অধ্যায়: পাপের ঘুম
রাত গভীর হয়ে এসেছে। প্রথম ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর অমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। হৃদয়ের মধ্যে এক অজানা চাপা কান্না, মাথার ভেতর কুয়াশার মতো একটা স্মৃতি ঘুরপাক খায়। সে জানে—এই ঘর তাকে কিছু দেখাতে চায়, কিছু মনে করিয়ে দিতে চায়।
কিন্তু সে কেন?
সে আবার খাটে শুয়ে পড়ে। পাথরটা এইবার বুকের ওপর রাখে, যেন এটা তাকে রক্ষা করবে। চোখ দুটো ধীরে ধীরে আবার বন্ধ হয়ে আসে... যেন ঘুম নয়, কোনো চেনা সময়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া।
এইবার... দৃশ্যটা আলাদা।
সে একটি পুরনো ঘরের মধ্যে বসে আছে। ঘরটি খুব চেনা। কিন্তু এইবার সে আর "অমি" নয়—সে কারো আরেকজনের দেহে প্রবেশ করেছে। আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখে চমকে ওঠে। বয়স অনেক কম, মুখে এক ধরনের অপরাধের ছাপ।
ঘরের মধ্যে আর চারজন দাঁড়িয়ে আছে। তারা কেউ চিৎকার করছে, কেউ দরজার দিকে তাকিয়ে আছে আতঙ্কে, কেউ আবার কাঁদছে।
“আমরা ওকে এখানে ফেলে রাখব?” একজন বলে ওঠে। কণ্ঠ কাঁপছে।
“অন্য উপায় নেই,” আরেকজন সাড়া দেয়। “যদি আজ বলি, আমরা সবাই শেষ।”
হঠাৎ একজন মেয়ের কান্নার আওয়াজ শোনা যায় ঘরের কোণ থেকে।
একটি কিশোরী—তার মুখ চাপা দিয়ে ধরা হয়েছে। চোখে আতঙ্ক আর অনুরোধ। তার গায়ে একটা সাদা জামা, রক্ত লেগে আছে।
অমির শরীর জমে যায়।
সে দেখতে পায়—তারই হাত কাঁপছে, তার দেহের ভিতর সেই অপরাধের ভার। সে কিছু বলতে চায়, কিছু আটকাতে চায়... কিন্তু সে যেন বন্দি, শুধু দর্শক, শুধু অনুভব করতে পারছে সেই পাপের ভার।
“তুমি ছিলে তাদের একজন...”
একটি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে অন্ধকার থেকে।
“তোমাদের হাতে হয়েছিল সেই পাপ। আর সেই পাপের উত্তরাধিকারী এখন তুমিই।”
অমি চিৎকার করতে চায়, কিন্তু কণ্ঠ আটকে যায়। দৃশ্যটা ভেঙে যেতে শুরু করে—লোকগুলো মিলিয়ে যায়, মেয়েটির কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে। ঘরের দেয়াল গলে অন্ধকারে ডুবে যায়।
অমি চমকে ঘুম ভাঙে।
সে ঘর্মাক্ত, নিঃশ্বাস ভারী। বুকের ওপর রাখা পাথরটা গরম হয়ে আছে।
এইবার আর কোনো সন্দেহ নেই।
সে শুধু রহস্য উন্মোচন করতে আসেনি, সে নিজেই সেই পাপের অংশ। হয় পূর্বজ, নয়তো আত্মার মধ্যকার কোনো ঐতিহাসিক দায়। অভিশাপ তার রক্তের ভেতরে।
সে জানে—এখন তাকে শুধু সত্য খুঁজে বের করতে হবে না... তাকে এই পাপ থেকে মুক্তির পথও খুঁজে বের করতে হবে।
চলবে-----
#বাংলাগল্প #পর্বগল্প #ফেসবুকগল্প
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
১৩তম অধ্যায়: অভিশপ্ত ঘরের ইতিহাস
পথটা ছিল সরু, তবে পরিচিত। পেছনে মসজিদের মিনার হারিয়ে যায় কুয়াশার ধোঁয়ায়, আর সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে এক পুরনো, মাটির দেয়ালের ঘর। ইমাম সাহেব বলেন, “এই ঘরেই থাকেন মাওলানা আশরাফুল ইসলাম। বয়সের ভারে এখন উঠে বসেন কম, কিন্তু স্মৃতির শক্তি এখনও তীক্ষ্ণ।”
অমি দরজার সামনে দাঁড়ায়। ঘরটার চারপাশে সময় থেমে গেছে যেন—মাটি, শ্যাওলা, আর বাতাসের হালকা শব্দ ছাড়া কিছু নেই।
ইমাম দরজায় কড়া নাড়েন।
ভেতর থেকে একটি কাশি আর ক্ষীণ গলায় “আসুন” শব্দটি শোনা যায়।
ভেতরে প্রবেশ করে অমি দেখে, এক বৃদ্ধ লোক কাত হয়ে বসে আছেন, চোখে মোটা চশমা, কপালে ভাঁজ আর দুই চোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। ইনি-ই মাওলানা আশরাফুল ইসলাম।
তিনি ধীরে মাথা তোলে অমির দিকে তাকান। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন—
“তো তুমি সেই ছেলেটা... এতদিন পর, অবশেষে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চলেছে গ্রামটা।”
অমির গলা শুকিয়ে আসে। “আমি কী করতে এসেছি এখানে, আপনি জানেন?”
বৃদ্ধ এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলেন।
“তুমি এসেছো কারণ তুমি পাপ দেখার মতো সাহস রাখো, কিন্তু পাপ করার মতো মানুষ নও। এই অভিশপ্ত ঘরটি—এটা ছিল পাপের আশ্রয়। অনেক বছর আগে এই ঘরেই পাঁচজন মানুষ এক রাতে একত্র হয়েছিল। তারা কেউ অপরাধী ছিল না... তারা ছিল ভয়ানক অপরাধের সাক্ষী। কিন্তু সত্য প্রকাশ করেনি কেউ।”
অমি ধীরে বলে, “তাহলে অভিশাপটা কী?”
মাওলানা একটু নড়ে বসেন।
“পাপ কখনো ঘুমায় না, অমি। ওরা পাঁচজন সত্যকে চাপা দিয়েছিল। কেউ একজন তখন বলেছিল—‘ঘুমন্ত মানুষ দেখতে নিষ্পাপ।’ সেই বাক্য দিয়েই শুরু হয়েছিল সবকিছু। তারা ঘুমিয়ে ছিল, কিন্তু তাদের বিবেক জেগে ছিল। এবং সেই জেগে থাকা পাপই রয়ে গেছে এই ঘরের দেয়ালে।”
“আপনি বললেন, আমি উছিলা। কেন আমি?”
“কারণ তুমি এই গল্পের উত্তরাধিকারী। তোমার রক্তে সেই একজনের ছাপ আছে, যে তখন সাহস করে কিছু বলেছিল, কিন্তু বাকিরা তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। তোমার মধ্যেই আছে সেই ভয়, সেই উপলব্ধি, আর সেই পাপের ছায়া—যা এই ঘর মুক্ত করতে পারবে।”
“কিন্তু কীভাবে?”—অমির গলা কাঁপে।
মাওলানা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।
“তোমাকে ঘুমাতে হবে, অমি। সেই ঘরে। এক রাত, এক নিঃশ্বাস। যদি তোমার মন সত্যকে গ্রহণ করতে পারে, তবে তুমি দেখতে পাবে—তাদের, তাদের কাজ, আর তাদের পরিণাম। তবে মনে রেখো... প্রতিটি সত্যর মূল্য আছে।”
অমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।
তার সামনে খুলে যাচ্ছে অতীতের অন্ধকার, আর তার নিজের ভবিষ্যতের পথ।
চলবে------
#বাংলা_গল্প #ফেসবুকগল্প #পর্বগল্প # #মির্জা_মোঃ_জুলকার_নাঈম
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
১২তম অধ্যায়: পাপের পূর্বাভাস
গ্রামের আকাশে তখনও ভোর হয়নি পুরোপুরি, তবে আলোর রেখা ফুটে উঠছিল ধীরে ধীরে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অমি যেন অনুভব করছিল—এই গ্রামের মাটির প্রতিটা দানা আজ কিছু বলতে চায়। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন ভেতরে কোনো চিৎকার চাপা দিচ্ছে।
অমির হাতে তখনও সেই পাথর আর কাঠের ফলক। সে জানে, এই জিনিসগুলোর অর্থ সে একা বুঝতে পারবে না। এখন তাকে জানতে হবে, এই রহস্যের সূচনা কোথায় হয়েছিল, আর শেষ কোথায়।
সে সোজা চলে যায় গ্রামের পুরনো মসজিদের দিকে। সেই শ্যাওলা-ঢাকা দেয়াল, পুরনো মাটির ঘ্রাণ, আর ফজরের নামাজের পরের নীরবতা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করে। মসজিদের বারান্দায় বসে ছিলেন ইমাম সাহেব, হাফেজ জুবায়ের আহমেদ। হাতে তসবিহ, মুখে দোয়া, কিন্তু চোখ দুটি যেন কেবল অমির আগমনের প্রতীক্ষায় ছিল।
অমি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলে, “আমি অমি।”
ইমাম সাহেব ধীরে ধীরে তার দিকে তাকান। তারপর চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে বলেন,
“অমি... আমরা জানতাম, আপনি আসবেন। এই গ্রাম আপনারই জন্য অপেক্ষা করছিল। আপনার আগমনের মধ্য দিয়েই সেই পাপের রহস্য উন্মোচিত হবে।”
অমি হতচকিত হয়ে পড়ে। “আপনি আগে থেকেই জানতেন আমি আসব?”
ইমাম সাহেব মাথা নাড়েন। “এই গ্রামের ইতিহাসের সাথে আপনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত—যদিও আপনি জানেন না। সেই অভিশপ্ত ঘর, পাঁচজনের গায়েব হয়ে যাওয়া, পাথর আর সেই খোদাই—সবই পূর্বনির্ধারিত ছিল। আপনিই সেই ব্যক্তি, যার উপস্থিতি ছাড়া এই রহস্যের সমাধান সম্ভব নয়।”
কথাগুলো শুনে অমির গলা শুকিয়ে আসে। “তাহলে আমাকে কী করতে হবে?”
ইমাম দাঁড়িয়ে যান। তাঁর চোখে গভীর ক্লান্তি, তবুও অদ্ভুত এক আশার আলো।
“আপনাকে নিয়ে যেতে হবে একজন মানুষের কাছে। তার নাম মাওলানা আশরাফুল ইসলাম। এই গ্রামের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। তিনিই জানেন, অভিশাপটা কীভাবে শুরু হয়েছিল, আর আপনি কেন এখন এর মুখোমুখি।”
“কিন্তু...” অমি একটু থামে, “আপনি বললেন, পাপের রহস্য উন্মোচিত হবে। কী পাপ?”
ইমাম একটু হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে মাটি ছুঁয়ে বলেন,
“ঘুম নয়, মানুষ নিজেকে লুকাতে জানে। এই গ্রামে কিছু লোক এমন পাপ করেছিল, যা প্রকাশ হয়নি কখনো। তারা ঘুমিয়ে থাকলেও, তাদের অন্ধকার জেগে ছিল। আপনি সেই অন্ধকারের সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছেন, অমি। প্রস্তুত থাকুন।”
অমি কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তারপর মাথা নাড়ায়।
“চলুন। আমাকে জানা দরকার।”
পাশের সরু পথ ধরে ইমাম সাহেব হাঁটতে শুরু করেন। মসজিদের পাশে ছায়া পড়তে থাকে। গ্রামের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঘর যেন নিঃশব্দে মাথা নোয়ায়।
অমি জানে, এবার সত্যের দ্বারেই সে পৌঁছাতে চলেছে।
চলবে.......
#থ্রিলার #বাংলা #পর্বগল্প #মির্জা_মোঃ_জুলকার_নাঈম
গল্প: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
এগারোতম অধ্যায়: শেষের শুরুর খোঁজ
অমি একটানা দাঁড়িয়ে থাকে, সিলিংয়ে থাকা বাতিটি শেষবারের মতো ঝিম মেরে নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশে অন্ধকারের ঢেউ উঠে। তবুও, তার মন থেকে সব অন্ধকার দূর হয়ে যায়। সে নিজের কাছে প্রশ্ন করে—"তাহসিন বলেছিল, আমি শুধু একজন দর্শক। কিন্তু কি এই গল্পে আমার আসল ভূমিকা?"
অমি জানে, যে পৃথিবীতে সে দাঁড়িয়ে, তার একাংশ তাকে নিয়ে না। কিন্তু অন্য অংশ তাকে তার পথ খুঁজতে বলছে। সে জানে, তার সামনে কোনো সহজ উত্তর নেই, কিন্তু সত্যের পেছনে যাওয়া তাকে এক নতুন আধ্যাত্মিক বা বুদ্ধিভিত্তিক পথ দেখাতে পারে।
সে পাথরটি হাতে নেয়, যেটি তাহসিন তাকে দেওয়া হয়নি, বরং তার পরিণতির জন্য দেয়া হয়েছিল—এটিই ছিল তার সত্যের প্রথম চিহ্ন। পাথরের খাঁজের মধ্যে তার হাত আরও গভীরে প্রবাহিত হতে থাকে, যেন কিছু অনুভূতি তার মনকে ভরিয়ে দেয়। সেখানে যেন কোনো প্রাচীন শক্তি তাকে সমর্থন জানাচ্ছে। একটি শব্দ—"তুমি প্রস্তুত," যেন অন্ধকারে ভেসে আসে।
অমি মনে মনে স্থির করে। এটা ছিল তার একমাত্র সুযোগ—এখন সে জানে, এই রহস্যের পেছনে যে খেলা ছিল, তা তার জন্য তৈরি হয়নি, কিন্তু সে নিজের গল্প নিজেই লিখতে পারবে। সে জানে, সত্যের সন্ধানে অন্যরা তাকে শুধু একা ছেড়ে যেতে চেয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সে নিজের পথ খুঁজে পাবে।
অমি সিদ্ধান্ত নেয়, সে আরও একবার নিজের সিদ্ধান্ত নেবে। সে সেই দরজা খুলবে যা তাকে কখনো খুলতে দেওয়া হয়নি। সে জানে, যে গোপন কক্ষে সে ঢুকেছে, সেখানে তার জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হয়নি। বরং সেখানে তার নতুন শুরুর সূচনা অপেক্ষা করছে।
তাহসিনের কথা, তার কথাগুলো যে কখনো ভুল ছিল, তা সে জানে—কিন্তু এতদিনের ভুল উপলব্ধি এবং দূরত্বের পর, সে নিজের রাস্তায় চলবে, যেখানেই সেটি তাকে নিয়ে যাক।
অমি দ্রুত প্যানেলটি আবার ঠেলে দেয়, আর একে একে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে। সিঁড়ির মাথায়, যেখানে বাতি আবার জ্বলে ওঠে, সেখানেই সে দাঁড়িয়ে থাকে—এবার তার সামনে ভিন্ন দৃশ্য। তার সামনে নতুন এক দরজা খুলে গেছে, আর সেখানে লেখা ছিল—"এটাই ছিল তোমার গন্তব্য, তোমার পরবর্তী গল্প।"
অমি জানে, এখানেই শেষ হয় না। এই নতুন গল্প শুরু হবে তার নিজের হাতেই, যেখানে সে এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত—এটা তার নিজের অভ্যন্তরীণ যাত্রা, তার পাথেয়।
তারপর অমি বের হয়ে যায় সেই ঘর থেকে আর হাতে সে পাথরটি। অমি ভাবে এই পাথরের একটা রহস্য আছে তাই সে এটাকে হাতছাড়া করতে চায় না।.....
-----------------
চলবে........
゚viralfbreelsfypシ゚viral
#থ্রিলার #বাংলাগল্প #থ্রিলারগল্প
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
---
নবম অধ্যায়: শহরের নীরবতা, গ্রাম্য ছায়া
চরভদ্রাসনের সেই পুরনো বাড়ির ভেতর থেকে যখন অমি বেরিয়ে আসে, তার হাতে তখনও সেই চকচকে সাদা পাথর আর কাঠের ফলক।
সানজিদ তাকে বলে, “এখন তোর যা দরকার, তা হলো বুঝে নেওয়া—এটা সব কী বোঝাতে চায়। তুই শহরে ফিরে যা। তোর একজন বন্ধু আছে না—তাহসিন?”
অমি ঘাড় নাড়ে।
তাহসিন—ঢাকায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। প্রযুক্তি, লিপি বিশ্লেষণ, আর ইতিহাস নিয়ে বরাবরই আগ্রহ তার। অমির বিশ্বাস, সে কিছু একটা বুঝতে পারবে।
---
ঢাকা, তিন দিন পর
তাহসিনের বাসায় বসে টেবিলের ওপর পাথর আর ফলক রেখে অমি বলে, “দেখ, আমি জানি না এগুলা আসলে কী। কিন্তু এই জিনিসটাই ওই পাঁচজন গায়েব হওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে।”
তাহসিন পাথরটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর ফিসফিস করে বলে,
“এই পাথরটা সাধারণ নয়, ভাই। এটাতে মেটালিক ট্রেইস আছে, কিন্তু ধাতু না—খুব সম্ভবত, কৃত্রিমভাবে তৈরি করা।”
অমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “মানে?”
“মানে,” তাহসিন বলে, “এই পাথর সম্ভবত কিছু একটা ‘অ্যাক্টিভেট’ করে। নিচের খাঁজটা দেখেছিস? এটা কোনো একটা লকের অংশ হতে পারে। আর এই খোদাই?”
তাহসিন কাঠের ফলকটার লেখা পড়ে, তারপর তার ল্যাপটপে টাইপ করতে থাকে।
“এটা পুরনো ধরণের ছায়া-ভিত্তিক কোডের মতো,” সে বলে।
“তুই বলছিলি না—‘একজন ঘুমিয়ে পড়লে আরেকজন জেগে ওঠে’? মনে হচ্ছে এটা প্রতীকী কোনো প্রক্রিয়া বা ফেজ শিফটের কথা বলছে।”
অমি বসে বসে ভাবে—তাহলে এটা শুধু ধর্মীয় কোনো রেফারেন্স না, এর পেছনে সম্ভবত বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি লুকানো আছে। একটা খেলা? না কি একটা পরীক্ষা?
তাহসিন একসময় উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“চল, আবার চরভদ্রাসনে যাই। কিন্তু এবার শুধু আবেগ নিয়ে নয়—তথ্য নিয়ে যাবো।”
---
চরভদ্রাসন, পাঁচ দিন পর
দুজনের হাতে ফিল্ড নোট, একাধিক ছবি, স্ক্যান করা পাথরের প্রতিলিপি।
তারা সেই বাড়িতে আবার ফিরে যায়, কিন্তু এবার আর আগের মতো ভয় নেই—এবার তারা জানে, তারা খুঁজছে কী।
“তাহসিন,” অমি নিচু স্বরে বলে, “এই বাড়িটা কোনোভাবে ওই পাথরের সাথে যুক্ত। তুই বলছিলি না, লক?”
তাহসিন দেয়ালের এক পাশে কিছু খোঁজে, তারপর একটা জায়গায় থেমে যায়।
একটা কাঠের খোপ। তার মাঝে ঠিক পাথরের আকারের খাঁজ।
দুজন একে অপরের দিকে তাকায়।
অমির হাত কাঁপে।
সে পাথরটা খাঁজে রাখে।
একটা ক্লিক শব্দ।
আর তখনই দেয়ালের পাশ থেকে একটা প্যানেল ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে।
তার পেছনে অন্ধকার, কিন্তু সেখানে বাতাস ঠাণ্ডা নয়—গরম।
তাহসিন ফিসফিস করে বলে, “দরজা খুলে গেছে, ভাই। এখন দেখতে হবে, ভিতরে কী আছে।”
অমির গলা শুকিয়ে আসে।
এই রহস্যের শেষটা কি তাদের জন্য তৈরি ছিল?
নাকি তারা ভুল দরজা খুলে ফেলল?
------
দশম অধ্যায়: দরজার ওপারে
অমি আর তাহসিন ধীরে ধীরে প্যানেলটা পেছনে ঠেলে ভেতরের গোপন কক্ষে প্রবেশ করে।
এটা ছিল অন্ধকার, তবুও কিছুটা আলোর ঝলক দেখা যাচ্ছিল—এ যেন একটা দীর্ঘ পথ, যার শেষে কিছু নেই। তবে তাতে কোনো ভয়ের আবহ ছিল না; বরং এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি ছিল, যেন একটা অতৃপ্ত সুরভি।
তাহসিন হালকা স্বরে বলে, “এটা কী? কোথায় পৌঁছেছি আমরা?”
অমি সজাগ চোখে চারপাশ পরখ করে, “এটা—এটা কী ছিল আগে? কী গোপন ছিল এখানে?”
এতদিনের অনুসন্ধান, এত রহস্য—এটা এক ধরনের তীব্র উপলব্ধি ছিল। কিন্তু এমন কি কিছু ছিল যা তারা এত দিন পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল? মনের মধ্যে আগের ভয়েস মেসেজের কথাগুলো ভেসে ওঠে—“গল্পটা অমির নয়।”
তাহসিন পেছন ফিরে অমির দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি ভুলে গেছ ভাই... গল্পটা তো তোমার নয়। তুমি শুধুই একজন দর্শক।”
অমি চমকে উঠে তাহসিনের দিকে তাকায়। তাহসিনের চোখে একটা শূন্যতা, যেন সে পুরো গল্পটা জানে, কিন্তু অমি এখনও শুধু অনুসন্ধান করে যাচ্ছে, সেই ভয়াবহ সত্যকে বুঝতে পারছে না।
“তাহসিন, তুমি কী বলছো?” অমি বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করে।
তাহসিন এক ঠান্ডা হাসি হাসে, “তুমি আসলে পুরো ব্যাপারটা ভুল বুঝেছ। আমি তোমার পাশে ছিলাম, কারণ তুমি শুধু গল্পটা জানার জন্য আগ্রহী ছিলে। কিন্তু... তুমি ভুলে গেছ, তুমি শুধুই একজন দর্শক। তোমার নাম আর এই গল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি পুঁজি হয়ে উঠেছ, আর এই রহস্য তোমার জীবনের অন্তিম অধ্যায় হতে চলেছে।”
অমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন তার সবকিছু চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
“তাহসিন, তুমি কী বলছো?”
তাহসিন তখন একটু থেমে গিয়ে বলে, “এই পাথর, এই খোদাই—এগুলোর পেছনে কোন ম্যাজিক ছিল না, ভাই। এটা একটা খেলা ছিল। একটা দীর্ঘ খেলাধুলা, যেখানে তোমাকে শুধু পুতুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।"
অমি তার চোখে জিজ্ঞাসা এবং সন্দেহ নিয়ে তাকায়।
“তাহলে, আমি কেন এখানে আছি? আমি কেন এই সমস্ত কিছু দেখতে পাচ্ছি?”
তাহসিন ঠান্ডা মাথায় বলে, “যতটুকু জানি, তুমি এখানে আছো কারণ তুমি নিজেই কিছু একটা খুঁজছিলে। কিন্তু সেই খোঁজ তোমার জন্য নয়, এই গল্পের জন্য। এটা ছিল তোমার শুরুর পয়েন্ট, আর এখন তোমার গল্প শেষ হয়েছে।”
অমি তার চোখ বন্ধ করে নেয়। সব কিছু যেন এক মুহূর্তে অন্ধকারে ডুবে যায়।
তাহসিন আবার বলে, “তুমি ভুলে গেছ, ভাই। গল্পটা তো তোমার নয়। তুমি শুধুই একজন দর্শক।”
তাহসিন ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছনে চলে যায়, একে একে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়।
অমি দাঁড়িয়ে থাকে, তার চারপাশে সেই অন্ধকার ঘর আর অবশেষে সিলিংয়ে থাকা একমাত্র বাতি ঝিম মেরে নিভে যায়।
---
চলবে.......
#থ্রিলার #বাংলাগল্প #পর্বগল্প #মির্জা_মোঃ_জুলকার_নাঈম #নতুন #গল্প
গল্পের নাম: #গল্পটা_অমির_নয়
লেখক: মির্জা মোঃ জুলকার নাঈম
সপ্তম অধ্যায়: পথের দিকে
অমি সানজিদের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সে বুঝতে পারে, তার সামনে একটা বড় সিদ্ধান্তের মুহূর্ত এসেছে—এই রহস্যের পেছনে কিছু অন্ধকার সত্য রয়েছে, কিন্তু তা জানলেই কি সত্যিই সে এগিয়ে যেতে পারবে?
“তাহলে আমাকে কী করতে হবে?” অমি জিজ্ঞাসা করে, সানজিদের দিকে তাকিয়ে।
“আমাকে কি ওই পাঁচজনের সাথে সম্পর্কিত কিছু খুঁজে বের করতে হবে?”
সানজিদ নিঃশব্দে মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ, তুমি যদি সবকিছু জানার প্রস্তুতি নাও, তবে এসব কিছুই কখনো শেষ হবে না। তোমার পরিবার, তোমার বাবা-মা—তাদের ব্যাপারে কিছু সত্য এখনও অজানা। আর তা জানলেই তুমি বুঝতে পারবে কেন তুমি ফিরে আসলে।”
অমি তার চিন্তায় ডুবে যায়।
তাহলে, তার পরিবার, বিশেষত বাবা-মা—এরা কোথায় গেল? কেন তাদের মৃত্যুর পর কোনো কিছু স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি? কেন তাকে এত বছর পর এই রহস্যের মধ্যে পড়তে হলো?
অমি সানজিদের দিকে ফিরে এসে দৃঢ়স্বরে বলে, “আমি জানি না, সানজিদ, কিন্তু আমি জানব। আমি ফিরব না, যতদিন না সব কিছু পরিষ্কার হয়। যদি আমার পরিবার, যদি আমার বাবা-মায়ের সাথে কিছু লুকানো থাকে, আমি সেটা জানব।”
সানজিদ কিছু না বলে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখে এক ধরনের সন্মান।
“তুমি যদি এগিয়ে যেতে চাও, তবে তোমার প্রথম লক্ষ্য হবে, ‘তাদের’ হারানোর জায়গায় পৌঁছানো। যেখানে ওই পাঁচজন শেষবার দেখা গিয়েছিল—ওই জায়গা যা পুরো গ্রাম জানে, কিন্তু কেউ সেখানে যেতে চায় না।”
অমি বুঝতে পারে, সানজিদ যা বলছে, সেটা একমাত্র পথ।
সেই স্থান—যেখানে সবাই হারিয়ে গিয়েছিল।
অমি ঠিক করে নেয়, সে কখনো পিছনে ফিরে যাবে না, যতই ভয়াবহ হোক না কেন।
তারপর, সানজিদ তাকে নির্দেশ দেয়, “তুমি যদি মনের মধ্যে সংকল্প রাখতে পারো, তবে সেই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। কিন্তু এক কথা মনে রাখো, সেখানে যা ঘটেছিল, সেটা তোমার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।”
অমি মাথা নেড়ে বলে, “আমি প্রস্তুত।”
তারা দুজন চুপচাপ গ্রাম থেকে বের হয়, এক অন্ধকার রাতের দিকে এগিয়ে চলে।
গ্রামের শেষ মাথায়, এক পুরনো, ভেঙে পড়া ভবন—যেখানে পাঁচজন শেষবার দেখা গিয়েছিল।
এটাই ছিল সেই স্থান।
এটাই ছিল সেই জায়গা, যেখানে তাদের গুম হওয়ার রহস্য ছিল।
অমি জানত, এবার তার সামনে কোনো পথ নেই—যেখানে সে যাবে, সেখানে কেবল সত্যই অপেক্ষা করছে।
সত্য, যা তাকে কখনো ভাবতে হয়নি, কিন্তু এখন তাকে সেটি একা অনুসন্ধান করতে হবে।
অষ্টম অধ্যায়: অন্ধকারের মধ্যে আলোকিত এক পাথর
চরভদ্রাসনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায় অমি।
সামনে কুয়াশায় ঢাকা, পরিত্যক্ত একটা বাড়ি। ছাদ ধসে পড়া, দেয়ালে শ্যাওলা, আর ভেতর থেকে ভেসে আসা একটা কর্কশ স্তব্ধতা। এই বাড়ির কথাই সবাই বলত—যেখানে কেউ একবার ঢুকলে আর ফিরে আসে না।
অমি সানজিদের দিকে তাকায়, “তুই কি এখানে এসেছিলি আগে?”
সানজিদ মাথা নাড়ে, “না। শুধু জানি, এখানেই শেষবার দেখা গিয়েছিল ওদের।”
ভেতরে ঢুকতেই অমির পা থমকে যায়।
মেঝেতে মাটি উঠে আছে কিছু জায়গায়, মনে হচ্ছে কেউ খুঁড়েছে। দেয়ালে অর্ধেক পোড়া কিছু কাগজ—যেন কারও লেখা ডায়েরি ছিঁড়ে টুকরো করা হয়েছে। একটা টেবিলের উপর ধুলোমাখা ধাতব বাক্স।
অমি ধীরে ধীরে বাক্সটা খোলে।
ভেতরে একখানা পুরনো, কাঠের ফলক। তাতে খোদাই করা আছে—
“একজন ঘুমিয়ে পড়লে আরেকজন জেগে ওঠে। পাঁচজন ছিল, এখন চারজন… গল্পটা এখনও শেষ হয়নি।”
তার নিচে ছিল একটি ছোট পাথর—সাদা, চকচকে, আর অসম্ভবভাবে ঠাণ্ডা।
পাথরের পাশে ছোট করে খোদাই করা:
"দেখবি আলো, যদি চোখ বন্ধ না করিস।"
অমি পাথরটা হাতে নেয়।
এক মুহূর্তের জন্য, চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন কেঁপে ওঠে। পাথরের তলায় একটা খাঁজ পাওয়া যায়—একটা পুরনো চাবির মতো আকৃতি।
“তুই দেখেছিস?” অমি সানজিদের দিকে পাথরটা বাড়িয়ে ধরে।
সানজিদ তাকিয়ে বলে, “এটা তো… ওদের চিহ্ন। যারা নিখোঁজ হয়েছিল, তাদের মধ্যে একজনের গলায় এমন একটা পাথর দেখা গিয়েছিল শেষবার।”
অমির মনে পড়ে, সেই ভয়েস মেসেজে বলা হয়েছিল,
> "ঘুমন্ত মানুষ দেখতে নিষ্পাপ,
কিন্তু ইবাদাত রাইখা ঘুমানো—পাপ!
আর এই পাপেই গুম হয়ে গেছে পাঁচজন..."
অমির বুকের ভেতর গরম হাওয়া ওঠে—কোনো ধর্মীয় আচারভিত্তিক বিচার?
না কি এটা একটা প্রতীকী খেলা, যেখানে পাপ-গুণ সব কিছুই কোনো উদ্দেশ্য পূরণের অংশ?
সে জানে না, কিন্তু জানে—এই পাথর, এই বাক্স, এই ফলক—সবকিছু তাকে আরও গভীরে টানছে।
সানজিদ পেছন থেকে বলে ওঠে, “তোর এখন যা লাগবে, সেটা হলো সাহস। কারণ ওরা ফিরে আসছে না। তুই-ই এখন ওদের জন্য দাঁড়াবি।”
অমি চুপচাপ বাইরের দিকে তাকায়।
সূর্য তখনও ওঠেনি, কিন্তু পূর্ব আকাশে হালকা লাল আভা।
সত্য উদিত হওয়ার অপেক্ষায়...
চলবে....
#গল্প #থ্রিলার #রহস্যময় #গল্পটা_অমির_নয়
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
Khilgaon
Dhaka
1219