MNI Rimi
তুমি বরং গল্প হইয়ো অন্য কারো বইয়ের পাতায়� আমি না হয় খুঁজে নিবো কোন এক বই মেলায়�
01/11/2025
#রক্তে_বাঁধা
#রুবাইয়া_রহিম_রিমি
~পর্ব- ৩২~
প্রাসাদের ভেতরে সবাই গভীর ঘুমিয়ে আছে। রিমি জাভিনের বুকে মাথা রেখে নিশ্চুপ শুয়ে আছে। এর মাঝেই নেপচুনের অদৃশ্য প্রাচীর ভেদ করে ঢুকে পড়লো ছায়াবাহী।
সে এসেছিল একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে। রিমি আর জাভিনকে শেষ করে দেওয়ার জন্য।
তার পায়ের শব্দও শোনা যাচ্ছে না, সে যেন অন্ধকারেরই একটি অংশ।
তাদের কক্ষে ঢুকে তলোয়ার উঁচু করলো ছায়াবাহী।
এক আঘাতেই সে শেষ করতে পারতো সবকিছু।
কিন্তু…
চোখে পড়লো রিমির ঘুমন্ত মুখ। শান্ত, নিষ্পাপ, অথচ অদ্ভুত নেশায় ভরা। সে থেমে গেল। মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত ঝিরিঝিরি হাওয়া খেলা করা শুরু করলো। এটা প্রতিশোধের আগুন নয়,
এটা নেশা। এটা আকর্ষণ। এটা দখল করতে চাওয়ার পাপ। সে কাছে ঝুঁকে রিমির মুখের উপর চোখ রেখে ফিসফিস আওয়াজ করে বলল,
-"এত বছর অন্ধকারে কাটিয়েছি, কিন্তু এমন আলো তো কখনও দেখিনি…"
তার হাত কেঁপে উঠলো। তলোয়ার ও নিচে নামিয়ে নিল সে।
জাভিন পাশে শুয়ে থেকেও কিছু টের পেল না।
ছায়াবাহী নিঃশব্দে রিমির ঘরের প্রতিটি কোণ দেখে নিল। তার দৃষ্টি রিমির ঘুমন্ত জ্বলজ্বলে নীলাভ চোখের পাতা আর ঠোঁটের উপর স্থির হয়ে আছে।
যে মিশন নিয়ে এসেছিল সে তা ভোলেনি, কিন্তু তা আজ করতে পারলো না। হয়তো পারবেও না।
রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ছায়াবাহী।
কিন্তু যাওয়ার আগে নিজের মনকে প্রতিজ্ঞা করল,
-"তাকে শেষ করব না… তাকে আমার করব।"
-----------
ছায়াবাহী প্রথম রাতে রিমিকে দেখেই, ওর অন্তর পরে ফেলেছে সে। ছায়াবাহী বুঝে গেছে, রিমি জাভিনকে ছাড়বে না। তাই সোজাসুজি হত্যা না করে, সে ভাঙবে তাদের ভেতরের সম্পর্ক কে।
সে অন্ধকার জাদুর শক্তি দিয়ে রিমির মনের গভীরে প্রবেশ করলো।
এমন এক অদৃশ্য বাঁধন, যা রিমিকে বদলে দিতে লাগলো ধীরে ধীরে।
সে অজান্তেই ছায়াবাহীর আদেশে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে লাগল।
তার মেজাজ, তার ভালোবাসা সবকিছুতে ছায়াবাহীর প্রভাব ছড়িয়ে গেল।
জাভিন প্রথমে কিছুই বুঝতে পায়নি। কিন্তু কয়েকদিন পর সে দেখলো,
রিমি তার সাথে অকারণে রাগ করছে, অকারণে দূরে সরে যাচ্ছে। যখনই জাভিন সময় দিতে চায়, রিমি অদ্ভুতভাবে তা এড়িয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কিছু দিন আগেই না রিমি বললো,
-"তুমি নাকি আমাকে ভালোবাসো? অথচ আমার সাথে সময়ই কাটাও না। তুমি শুধু রাজা হয়ে ব্যস্ত থাকো।"
জাভিন স্তব্ধ।
কারণ সে জানে রিমির কন্ঠে এখন এসব কথা নেই।
কিন্তু প্রমাণ? প্রমাণ ও নেই।
রিমি নিজেও জানে না কেন সে এমন করছে।
রাতে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে চেনে না।
-"আমি কি সত্যিই এত বদলে গেছি? নাকি জাভিন আমাকে আর চায় না?"
এই সন্দেহ তাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে জাভিন,
দ্বিধা আর হতাশায় ডুবে যাচ্ছে।
রাজা হিসেবে সব সামলানোই কঠিন, তার ওপর রিমির সাথে এই অজানা দূরত্ব। জাভিন রাতে একা প্রাসাদের বারান্দায় বসে ছিলো।
আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বললো,
-"আমি তাকে হারাতে পারব না… কিন্তু কিভাবে তাকে আগের রিমিতে ফেরত আনবো? তার এতো পরিবর্তন আমাকে ছারখার করে দিচ্ছে।"
এদিকে ছায়াবাহী দূর থেকে সবই দেখছে। সে এক বিকৃত হাসি দিয়ে বলল,
-"ধীরে ধীরে ভাঙ্গন ধরুক… যখন সে ও ভেঙে পড়বে, তখনই আমি তাকে নিজের করে ফেলবো।"
নেপচুনের নীলাভ আকাশে তখন পূর্ণ অন্ধকার। রাজপ্রাসাদের চারপাশে ঘন নীরবতা। যেন সবকিছু নিঃশ্বাসে আটকে আছে। প্রাসাদের ভেতর, রিমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর, ঠোঁটে মৃদু হাসি, যেন কোনও স্বপ্নে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু অন্ধকারের আড়াল ফুঁড়ে যে ছায়া এগিয়ে আসছে, সে কোনও সাধারণ উপস্থিতি নয়। সে ছায়াবাহী। নেপচুনের পুরনো কিংবদন্তির নাম। দানব নয়, আবার মানুষও নয়। আলো আর অন্ধকারের মাঝের এক অদ্ভুত সৃষ্টি। যার একমাত্র আনন্দ হলো অন্যের জীবনশক্তি, স্মৃতি আর আবেগ চুরি করে তা নিজের ভেতরে বন্দি করা।
আজ তার লক্ষ্য, রিমি।
ছায়াবাহী প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করল, কোনও প্রহরী টেরও পেল না। তার চলাফেরা এতটাই নীরব যে বাতাসও যেন কাঁপেনি ভুলেও।
সে রিমির শয়নকক্ষে ঢুকলো।
শীতল বাতাস ঘরটাকে কাঁপিয়ে তুলল। রিমির চুলগুলো মুখে এসে পড়ল, কিন্তু সে নড়ল না।
ছায়াবাহী মৃদুস্বরে ফিসফিস করল—
-“এমন রক্ত… এমন আত্মা… এত সুন্দরী রানী… তোমাকে আমি যেকোন মুল্যে আমার করেই ছাড়বো।”
রিমির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার দৃষ্টি বদলে গেল। হত্যা বা শোষণের ইচ্ছা আবারও মিলিয়ে গিয়ে জন্ম নিলো সেই ভয়ংকর নেশা।
সে রিমির চুলে আঙুল বোলালো। রিমি হালকা নড়েচড়ে উঠলো কিন্তু জেগে গেলো না।
-“তুমি তো জানো না তুমি আমাকে কি করছো… তুমি তো জানো না তুমি কেমন নেশা।”
ছায়াবাহী ধীরে ধীরে তার অদ্ভুত শক্তি ব্যবহার করলো।
একটা কালচে নীল ধোঁয়া রিমির শরীর ঘিরে ধরলো।
রিমির স্বপ্নের জগৎ ও কেঁপে উঠলো।
সে হঠাৎ দেখতে পেল, সে নেপচুনে নেই। সে এক বিশাল অচেনা বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য ফুল ফুটে আছে সেখানে। ফুলের পাপড়িগুলো যেন ফিসফিস করে ডাকছে তাকে,
-“এখানে থাকো… এখানেই থাকো।”
রিমি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-“তোমরা কে?”
একই কণ্ঠ ভেসে এল চারপাশ থেকে—
-“তোমার অন্ধকার… তোমার মুক্তি… আমি তোমার ছায়া।”
রিমি পালাতে চাইলো, কিন্তু তার পা যেন মাটিতে আটকে গেছে। আর এভাবেই ছায়াবাহী ধীরে ধীরে রিমির অবচেতন মনে নিজের শিকড় গেড়ে দিল।
অন্যদিকে, জাভিন প্রাসাদের অন্য প্রান্তে প্রশিক্ষণক্ষেত্রে রাতভর অনুশীলন করছে। নতুন অস্ত্র, নতুন শক্তি আর নেপচুনকে আরও শক্তিশালী করতে সে দিনরাত ব্যস্ত।
কিন্তু আজ অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে পেয়ে বসলো।
হঠাৎ তার মনে হলো, রিমি বিপদে আছে।
তলোয়ার ফেলে দিয়ে সে দৌড়ে গেল রিমির কক্ষে।
কিন্তু দরজা খুলে দেখে, রিমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখ শান্ত।
জাভিন দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
-“সবই আমার মনের ভুল… কিন্তু কেন মনে হচ্ছে কিছু বদলে যাচ্ছে?”
সে এগিয়ে এসে রিমির কপালে চুমু দিল।
-“আমার রানি… আমি আছি তোমার জন্য।”
কিন্তু সে জানত না, অন্ধকার ঠিক তখনই রিমির ভিতরের আরও গভীরে প্রবেশ করছে।
পরদিন থেকেই রিমি অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করলো। জাভিন যতবার তাকে আপন করতে চাইলো, রিমি ততবারই দূরে সরে গেল।
সে অনেক সময় একা বসে থাকে, শূন্য চোখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে।
জাভিন আর না পেরে প্রশ্ন করলো,
-“রিমি, কি হয়েছে তোমার? তুমি এমন করছো কেন?”
রিমি চোখ ঘুরিয়ে বলল,
-“আমার একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে। তুমি আমাকে একটু সময় দাও।”
জাভিনের বুক বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। রিমি এমন স্বরে তার সাথে কখনো কথা বলেনি।
রিমি রাতে ঘুমাতে চায় না। সারারাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো তার চোখ অদ্ভুত নীলচে আলোয় জ্বলে ওঠে। জাভিন বুঝতে পারছে, ভয়ংকর কিছু হতে চলেছে।
-------------
জাভিন রাজকীয় বৈঠকে ব্যস্ত আছে।
ঠিক তখন রিমির ঘরে আবার ঢুকলো ছায়াবাহী।
এইবার রিমি জেগে ছিল।
সে চমকে উঠল,
-“কে তুমি?”
ছায়াবাহী এগিয়ে এল।
-“যে তোমাকে তোমার রাজা থেকেও বেশি বুঝতে পারে… যে তোমাকে তোমার খাঁচা থেকে মুক্ত করতে পারে।”
রিমি পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার দেহ অবশ হয়ে গেল।
ছায়াবাহী তার গালে হাত রাখলো।
-“তুমি জানো তোমার ভেতরের অন্ধকার আমি দেখতে পাই। তুমি সুখী নও। তুমি কেবল তার জন্য বেঁচে আছো। কিন্তু আমি… আমি তোমাকে তোমার জন্য চাই।”
রিমির শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। তার চোখ ভিজে উঠলো। সে জানে না কেন, কিন্তু ছায়াবাহীর স্পর্শ তাকে ভীতও করলো, আবার অদ্ভুতভাবে আকর্ষন ও করলো।
------
জাভিন দিন দিন বুঝতে পারছে রিমি তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। রিমি এখন আর আগের মতো তাকে জড়িয়ে ধরে না। তার চোখে নতুন এক শূন্যতা।
রিমি যখন ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো জাভিন তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-“হানিবান, আমাকে বলো কি হয়েছে তোমার? আমি কি আমার রানিটাকে কষ্ট দিয়েছি?”
রিমি বলল,
-“তুমি আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছো, জাভিন। তুমি সবসময় নেপচুন নিয়ে ব্যস্ত। আমি একা।”
জাভিন অবাক হয়ে বললো,
- তুমি কি বলছো এসব, হানিবান? তুমিই তো দূরে দূরে রাখছো আমাকে!
কিন্তু রিমির কানে যেন কথা পৌঁছাল না। সে বললো,
-"তোমার ছোঁয়া আমার কাছে বিষাক্ত লাগছে। আমি তোমাকে আমার চারপাশে সহ্য করতে পারছি না জাভিন।"
জাভিন কেঁপে উঠলো। তার হৃদয় যেন কোটি কোটি টুকরায় ভাগ হয়ে গেলো। এটা তার রক্ত রানি হতে পারে না। তবে কি কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে? জাভিন দ্রুত ওর গাল ছুঁয়ে বললো,
- "আমি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছি রিমি?"
রিমি দ্রুত ওর হাত সরিয়ে দিয়ে বললো,
-" আমাকে একা থাকতে দেও জাভিন। আমি তোমার ছোঁয়া সহ্য করতে পারছি না।"
জাভিন বিষ্ময়ে সরে দাঁড়ালো। রিমির দিকে কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে বাইরে চলে গেলো সে। কিন্তু রিমি তাকে ডাকলো না। তার দিকে এগিয়ে ও গেল না।
ছায়াবাহীর প্রভাব দিনে দিনে বাড়ছে তার ভিতরে।
সে রিমির স্বপ্নে আসে, তাকে অদ্ভুত অনুভূতি দেয়। রিমি এখন আর বোঝে না, কোনটা বাস্তব, কোনটা স্বপ্ন। সে অদ্ভুত দুনিয়ায় নিজেকে আটকে ফেলেছে।
সে আয়নায় নিজেকে দেখে, চোখে কালচে নীল রঙ, ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি।
সে ভয় পায়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে নিজের নতুন রূপকে পছন্দও করে।
--------
অবশেষে জাভিন বুঝল, রিমি শত্রুর প্রভাবে আছে। আর সে যেকোনও মূল্যেই তার রিমিকে ফিরিয়ে আনবে।
-“যে আমার রানিকে স্পর্শ করেছে, তার হাত আর কিছু ছোঁয়ার জন্য জীবিত থাকবে না।”
সে তার রক্ত রানির চুল স্পর্শ করেছে। জাভিন রাগান্বিত হয়ে গেলো রিমির কক্ষে। রিমি তখন স্বপ্নের ঘোরে মগ্ন। জাভিন নিজের হাতের নখর বের করে রিমির সমস্ত চুল কেটে দিলো। কিন্তু রিমির সেদিকে মনোযোগ নেই। সে এখনও অদ্ভুত ভাবনা নিয়ে ঠোঁট চেপে হাসতেই ব্যস্ত। রিমির এমন বেখেয়ালি অবস্থা দেখে জাভিন কাঁদলো। কিন্তু রিমি তা দেখলো না।
জাভিন সেই রাতেই তলোয়ার হাতে বেরিয়ে পড়লো ছায়াবাহীর শিকারি হয়ে। এক পরিত্যক্ত অরণ্যে, অদ্ভুত কালচে আভায় ঢাকা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ছায়াবাহী। সে যেন তার অপেক্ষাই করছিলো।
জাভিন গর্জে উঠে বললো,
-“আমার রানিকে ফিরিয়ে দে!”
ছায়াবাহী হাসল।
-“রানী? সে তো এখন আমার। তুমি বুঝতেও পারোনি, কত গভীরে আমি ঢুকে গেছি ওর ভেতরে।”
জাভিনের চোখ লাল হয়ে উঠলো।
-“আমি তোমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবো।”
তলোয়ারে আগুন জ্বলে উঠলো।
অন্যদিকে ছায়াবাহীর হাত থেকে কালো শক্তির শিকল বেরিয়ে এলো।
অন্ধকার আর আগুনের ভয়ংকর সংঘর্ষে কেঁপে উঠলো নেপচুনের অরণ্য।
চলবে,,,,,,,
31/10/2025
#রক্তে_বাঁধা
#রুবাইয়া_রহিম_রিমি
~পর্ব - ৩১~
নেপচুনের অদ্ভুত নীলাভ আকাশের নিচে, এক চুপচাপ সমুদ্রের ঢেউ যেন প্রেমের গোপন সুর বেজে উঠেছে। রিমি আর জাভিন এতটা ঘনিষ্ট ছিলো, যে দূরের অন্ধকার যেন তাদের জন্য তৈরি এক রহস্যময় আবরণ। প্রতিটি ধাপে ধাপে তাদের হৃদয়ের স্পন্দন যেন মিশে যাচ্ছে নেপচুনের গাঢ় রহস্যে।
রিমির চোখের নিচে নীলরঙা ছায়া এখন গভীর হয়ে উঠেছে, তার ভেতর একটা অব্যক্ত ভয় আর অস্থিরতা লুকিয়ে আছে। সে চুপচাপ যাচ্ছে সেই পথে, মনে মনে লড়াই করছে নিজের ভয় আর জাভিনের কাছে প্রকাশ করার মধ্যে। জাভিন তার পাশে সরে এসে, নরম স্বরে বললো,
-“রিমি, আমি তোমার পাশে আছি। তোমার ভয়গুলোকে আমি নিজেই পুড়িয়ে ফেলবো।”
রিমির হাত ধরা জাভিনের স্পর্শে যেন আগুন ছড়িয়ে গেলো। সে জানে, জাভিন শুধু তার রক্ষা করছে না, তার ভেতরের অন্ধকারকেও আলোর পথে নিয়ে যাচ্ছে।
-“আমি ভয় পাচ্ছি, জাভিন… এই রক্তের দায়, এই শক্তির ভার আমাকে জড়িয়ে রাখছে। কখনো কখনো মনে হয় আমি নিজেই এই অন্ধকারের অন্তঃপুর।”
তার কণ্ঠস্বর ছিল সেদিক থেকে ভঙ্গুর, যেন একটা অন্তরের কষ্ট।
জাভিন নরম হাসি দিয়ে বললো,
-“এই অন্ধকারই তোমাকে শক্তিশালী করেছে। আর তোমার সেই রক্তের মাঝে লুকিয়ে আছে আমাদের নতুন পৃথিবী তৈরির শক্তি। আমি তোমার হাত ছাড়বো না, যতই অন্ধকার গভীর হোক।”
তারা দুজন একসাথে আকাশের দিকে তাকালো, যেখানে দূরের নীল মেঘগুলো যেন তাদের প্রণয়ের সাক্ষী। জাভিন বললো,
-“এই রাতের পর, আমরা একসাথেই অন্ধকারের সাথে যুদ্ধ করব, নতুন আলো জ্বালাব।”
রিমি তার নিঃশ্বাস আটকে বললো বলল,
-“আমার জীবনে তুমি এমন ভাবে আসলে, যেন অন্ধকারও সুন্দর হয়ে উঠলো।”
আজ রাত্রির নীরবতায় ও তাদের ভালোবাসার স্পন্দন যেন নেপচুনের গহীন রহস্যকে আরো ঘন করে তুলছে। তারা জাননে সামনে অজস্র ঝড় আসবে, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে, তারা একে অপরের অন্ধকার আর আলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নেপচুনের অন্ধকার রাতে, মেঘের ফাঁকে মৃদু চাঁদের আলো পড়ছে। জাভিন আর রিমি দুজনেই একাকী একটা বড় খোলা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে চলছে তাদের নিঃশ্বাসের সরস শব্দ আর দূরের দূর্দান্ত বাতাসের আওয়াজ।
রিমি, কোমল কন্ঠে বললো,
-“তুমি জানো, এই অন্ধকারের মাঝেও আমি তোমাকে দেখতে পাই। তোমার চোখের আগুনে আমার ভয় সব মিটে যায়।”
জাভিন, ধীরে তার হাত বাড়িয়ে তার ওড়না থেকে একটু আগুনের মতো গরম হাত মুড়ে দিল,
-“ভয়? রিমি, তুমি ভয় পেও না। আমি তোমার জন্য এসেছি, শুধু তোমার। এই অন্ধকারেও আমি তোমাকে হারাতে দেব না।”
রিমির বুক ধুকছে, পায়ের নিচে যেন পৃথিবী হারিয়ে যাচ্ছে। তার গা থেকে এক এক করে সমস্ত ওষ্ঠে ভিজে উঠছে।
-“তুমি যখন কাছে থাকো, তখন আমি আমার সব অন্ধকারকে ছেড়ে দিতে পারি।”
জাভিন তার কপালে আলতো চুমু দিয়ে বলল,
-“আমাদের প্রেম শুধু আগুন নয়, এটা যেন অন্ধকারের মাঝে আলো, যা কখনো নেভে না।”
একটা গভীর চুম্বন বিনিময় করলো তারা, যেখানে সমস্ত রক্ত, যন্ত্রণা আর ভালোবাসার মিশ্রণ গলে গেছে এক বিন্দুতে।
এই রাতে, তাদের ভালোবাসা হয়ে উঠলো একটি অন্ধকার কাব্য হিসেবে। যেখানে শুধু তারা দুজনই ছিল, আর তাদের অনুভূতি ছিল এক অদ্ভুত ও ভয়ানক, এক অম্লান আবেগের জাল।
আসলে, এই অন্ধকারের মাঝে প্রেম যখন হয়, তখন তার গভীরতা আর তীব্রতা অন্যরকম হয়ে ওঠে। রিমি আর জাভিনের ভালোবাসা যেন এক ঝাঁক উজ্জ্বল আগুন, যা অন্ধকারকে ছিঁড়ে দিয়ে আলো ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু সেই আগুনের ভেতর লুকানো থাকে আগুনের মতোই তীব্র যন্ত্রণাও।
এই রাত যেন এক অদ্ভুত জাদু, যেখানে স্পর্শ, নিঃশ্বাস আর চোখের আলো একসাথে মিলেমিশে এক মায়াবী গল্প বুনে ফেলে। গল্প, যা পড়লে হৃদয় শিহরিত হয়, আর রাতের নিস্তব্ধতা যেন তাদের ভালোবাসার সাক্ষী।
এই রাত্রিতে, রিমির ভয় আর জাভিনের সাহস একাকার হয়ে গেলো, আর দুজনের মধ্যকার দূরত্ব হোক বা সময়ের বাধা, তা সব কিছু ভেঙে ফেলে দেয় এই ভয়ানক প্রেমের আগুন।
নেপচুনের চাঁদের ঠাণ্ডা আলোয় ঝলমল করছে দূর আকাশ। তার গা ছুঁয়ে যাচ্ছে কাঁপুনি, যেন কাঁপছে এই গ্রহের নিজস্ব আত্মাও। আর সেই অন্ধকার রাতের মধ্যে, রিমি আর তার কিং জেকে একান্তে বসে আছে একটি পরিত্যক্ত গুহায়। চারপাশে নীরবতা, শুধু তাদের নিঃশ্বাস আর হৃদয়ের গর্জনের শব্দ।
রিমি কোমল কন্ঠে জিজ্ঞেসা করলো,
-"আজ কি আমার প্রশ্নের জবাব দিবে তুমি?"
-" কি জানতে চাও বলো?"
-"নাইনা কি করে তোমার হাজার বছরের অতীত? আর যদি তাই হবে তুমি এখন ও এতো যুবক কিভাবে? নাকি এটা তোমার নতুন জন্ম? আর লিয়ানা তো মারা গিয়েছিল তাহলে ও নাইনা হলো কিভাবে?"
-"এতটুকু মাথায় এতো চিন্তা কে করতে বলেছে তোমায়?"
-"আমি শুধু তোমার কাছে উত্তর চাইছি জাভিন।"
-" তুমি জানো আমি স্বাভাবিক ভাবে জন্ম নেয়নি। আমাকে বানানো হয়েছিলো। আর ক্রিলসন অর্ডার আমাকে বহু বছর আগে তৈরি করেছিলো। আমার মা ছিলো নেপচুনের। কিন্তু বাবা ছিলো পৃথিবীর। ঠিক তোমাকে দূর্বল করতে যেমন ওরা তোমার থেকে সবাইকে কেড়ে নিয়েছিলো ঠিক সেভাবে আমাকেও দূর্বল করেছিলো আমার বাবা মা কে মেরে। লিয়ানা শুধুমাত্র আমার মোহ ছিল। আর আমার বা তোমার কোন আয়ু হয়না। আমরা যতদিন যুদ্ধে টিকে থাকবো ততদিনই বাঁচতে পারবো। আর আমরা আমাদের বয়স বেঁধে রাখতে পারি। বুঝেছো এবার?"
-"তাহলে তোমার বয়স কত?"
-"এক হাজার একশত এগারো বছর।"
-" কিহ্ তারমানে তুমি আমার দাদুর দাদু তার দাদুআর তার দাদুর ও দাদুর বয়সি।"
-" কি বলছো? আমি মোটেও বুড়ো নই। আমি অনেক handsume."
-"যাহ্! মিথ্যা কথা।"
-"কিহ্ মিথ্যা। ওকে দেখাচ্ছি তোমায় বুড়ার মজা।"
রিমির জোরে হেসে উঠলো, কিন্তু তার মনের গভীরে লুকানো ভয় আর আকাঙ্ক্ষা যেন আগুনের মত জ্বলছে। সে কণ্ঠস্থবির হয়ে বললো,
-“আমার ভেতর একটা অজানা ভয় বসে আছে। এই রক্তের শক্তি, এই অন্ধকারের কাছে আমি একান্তই ভয় পাই। তুমি কী বুঝতে পারো?”
জাভিন তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
- “রিমি, ভয় না পাওয়াই তো অদ্ভুত ব্যাপার। তোমার ভয়টাই তোমার শক্তি। তোমার রক্তের প্রতিটি ফোটা তোমার জীবনের গল্প বলছে। আমি তোমাকে সেই ভয় থেকে মুক্ত করে দেবো, তোমাকে নিয়ে যাব সেই জায়গায় যেখানে অন্ধকার আর আলো মিলেমিশে একাকার হয়।”
তার চোখের গাঢ় ভাবনায় রিমি নিজেকে হারিয়ে ফেললো। তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন যেন নেপচুনের ঝড়ের সাথে মিশে যাচ্ছিলো। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন একটি নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দিচ্ছিলো।
জাভিন তার কপালে চুম্বন দিয়ে বললো,
- “আজ রাতে, আমাদের ভালোবাসার স্বপ্নগুলোকে মুক্তি দিব। কেউ আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।”
তারা ধীরে ধীরে কাছাকাছি এলো, রিমির শিহরিত গায়ে জাভিনের হাতের স্পর্শ সঞ্চার করল এক অদ্ভুত তাপ। চোখের চোখে কথা বলার মধুর মুহূর্তে, তারা যেন এক অন্ধকার রাজ্যের রাজা ও রানী, যাদের প্রেমই এই মহাকাশকে আলোকিত করে।
রিমির হৃদয়ের গভীরে বেজে উঠল এক অজানা সুর, এক গোপন সঙ্গীত, যা শুধু জাভিনই বুঝতে পারলো। আর সেই রাতটি হয়ে উঠল তাদের জীবনের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে পাগলামীপূর্ণ ভালোবাসার রাত। যেখানে অন্ধকার ও আলো মিলেমিশে এক অবিস্মরণীয় ছন্দ তৈরি করেছে।
রিমি আর জাভিনের প্রেমের সেই রাত কেবল স্বপ্নের মতো ছিল না; এর পরেই নেপচুনের অন্ধকারে একটি নতুন ছায়া তাদের ওপর নেমে এলো। গেবসোকারের মৃত্যুর পরেও, নেপচুনের গভীরে লুকিয়ে আছে একটি ভয়াবহ গোপন রহস্য—ক্রায়েলের এক অনুগত অনুসারী, যিনি নিজের নাম রেখেছে “ছায়াবাহী”।
ছায়াবাহী শুধু একজন সাধারণ যোদ্ধা নয়, সে এক প্রেতাত্মার মতো শক্তিশালী। সে অদৃশ্য হয়ে আঘাত করে, আর চোখের পলকে মৃত্যুর ছায়া ফেলে দেয়। সে মস্তিষ্কের সাথে হৃদয় ও বশ করতে পারে। তার অস্ত্র? নেপচুনের সেই হারানো কুসুম রক্ত, যা রিমির রক্তের শক্তির সমান। অথবা তার থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর।
-----------------
রিমি জাভিনের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, হঠাৎ তাদের আশেপাশের বাতাস টুকটুক করে কাঁপতে লাগলো। ছায়াবাহী নিঃশব্দে তাদের কাছে আসলো, এবং সে একবার আঘাত করলো। রিমির শক্তি দুর্বল করে দেওয়ার জন্য রক্তের এক বিষাক্ত শিখা ছুড়ে মারলো।
রিমি কাঁপতে লাগল, তার শরীর ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে যেতে শুরু করলো। জাভিন ও বুঝতে পারল, এই লড়াই শুধু বাহ্যিক হবে না, অন্তরেরও হবে।
চলবে,,,,,
31/10/2025
🚫১৮+ এলার্ট🚫
#রক্তে_বাঁধা
#রুবাইয়া_রহিম_রিমি
~পর্ব-৩০~
এক ভয়ংকর নীরবতা চারপাশে। যেন ঝড়ের আগে স্থিরতাই নির্দেশ দিচ্ছে। কিং JK—দাঁড়িয়ে আছে সিংহাসন কক্ষে। তার শরীরের প্রতিটি শিরা যেন নতুন শক্তিতে জ্বলছে। দানব আর মানবের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত রূপ। ধূসর চামড়ার নিচে রক্তিম আলোর খেলা। তার লম্বা রূপালী চুল যা নেমে এসেছে তার চোখ পর্যন্ত। চোখের মণি—একসময় যা ছিল মানুষের মতো, এখন গভীর লাল, যেন আগুনে পুড়ছে।
কিন্তু এই রূপের পেছনে কি আছে?
ভালোবাসা? না প্রতিশোধ?
জাভিন তা জানে না।
কেটে গেলো মাঝে কয়েক সপ্তাহ। সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিমি। তার গায়ে কালো রাজকীয় পোশাক, কিন্তু মুখে ক্লান্তির ছাপ। তার রক্তের অদ্ভুত ক্ষমতা যেন ধীরে ধীরে তাকে খেয়ে নিচ্ছে। চোখের মণি নীলচে, চুলের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে অস্বাভাবিক রঙ।
হঠাৎ রাজকীয় প্রহরীরা দৌড়ে এলো।
-"কিং জেকে! ক্রিমসন অর্ডার এসেছে!"
জাভিনের মুখের পেশি শক্ত হয়ে গেল।
-"তাদের আসতে দেও।"
-"প্রভু, তারা বলছে, নেপচুনের নতুন রাজার রক্ত চাই।"
রিমির যেন শ্বাস আটকে গেল।
-"তোমার রক্ত?"
জাভিন মাথা নেড়ে বললো,
-"না। ওরা চায় তোমার রক্ত।"
-"তোমার আর আমার জন্ম নিয়ে এখনও অনেক কিছু জানা বাকি আছে আমার, বিশেষ করে যা তুমি লুকাচ্ছো।"
জাভিন কোন জবাব দিলো না। রিমি আবার বললো,
-"তারা পৃথিবী থেকেই আমাদের পিছু পরে আছে জাভিন। আমি কিছু বলছি তোমায়।"
-"হুম কারন তোমাকে তারা তৈরি করেছে।"
-"আমি জানি এর থেকেও ভয়ংকর কিছু অজানা থেকে যাচ্ছে আমার। তুমিই তা লুকাচ্ছো তাই না?"
-"হ্যাঁ লুকাচ্ছি কারন আমি ভয় পাই তোমার পরিবর্তনের।"
রিমি চুপ হয়ে গেলো মুহূর্তেই।
ক্রিমসন অর্ডার মহাবিশ্বের প্রাচীনতম হত্যাকারী গোষ্ঠী। তার অমর দেহ, রক্ত-শোষক অস্ত্র, আর অদ্ভুত এক শক্তি যা পুরো গ্রহ ধ্বংস করতে পারে।
তাদের নেতৃত্বে আছে লর্ড ভ্রায়েল, যে একসময় নেপচুনের রাজাকে হত্যা করেছিল।
-----------
রাতে রিমি আর জাভিন একা ছিল। জাভিন জানে কালকের যুদ্ধ হয়তো শেষ যুদ্ধ হবে। আর রিমির ভেতরে জমে থাকা ভয়, রাগ আর আকর্ষণ বিস্ফোরিত হবে।
রিমি আতঙ্কিত হয়ে বলল,
-"যদি কাল আমরা না বাঁচি?"
জাভিন এগিয়ে এসে তার মুখ ছুঁয়ে বললো,
-"আজকের রাত আমাদের শেষ রাত হবে না। এটা হবে আমাদের প্রথম রাত। হয়তো যুদ্ধ শেষে নেপচুনে অথবা মৃত্যু পুরিতে।"
রিমির দম আটকে গেল। যেন পুরো গ্রহ আটকে গেছে তার গলায়। তার ঠোঁট শুকনো, কিন্তু যখন জাভিন তার ঠোঁটে চুমু খেল, এক ঝলক বিদ্যুৎ ছুটে গেলো সারা শরীর জুড়ে।
রিমি অনুভব করল সে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু এই ভয়ই তাকে টেনে নিচ্ছে আরও গভীরে।
জাভিন বলল,
-"তুমি আমার রানি। শুধু সিংহাসনে নয়, রক্তে, শরীরে, আত্মায়।"
তাদের চারপাশের অন্ধকার যেন আরও ঘন হতে লাগলো। নেপচুনের চাঁদ গুলো একসাথে নেমে এলো জানালায়। এটা কোনো সাধারণ প্রেমের মুহূর্ত নয়। এটা ছিল দানব-রাজা আর রক্ত-রানির অন্ধকার মিলন। এক অস্বাভাবিক, ভয়ংকর প্রেম। যেখানে প্রতিটি চুম্বনে ছিল যুদ্ধের শপথ, প্রতিটি স্পর্শে ছিল ক্ষমতার লড়াই।
ভোর হতেই নেপচুনের আকাশ লাল হয়ে গেল।
ক্রিমসন অর্ডারের জাহাজ ভেসে উঠল মেঘের ওপরে। যেন বিশাল অন্ধকার প্রাসাদ, যার পেটে হাজারো সৈন্য।
রিমি যুদ্ধের পোশাক পরলো। এবার সে শুধু রক্তের উৎস নয়—সে যোদ্ধা।
জাভিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আজ যদি আমি হেরে যায়, তাহলে তুমি রাজ্য চালাবে।"
রিমি চিৎকার করে উঠলো,
-"চুপ করো! তুমি হারবে না। কারণ আমি তোমার সাথে আছি।"
ক্রিমসন অর্ডারের দরজা খুললো। বেরিয়ে এলো ভ্রায়েল।
লম্বা, রক্তে রাঙা বর্ম, আগুনে মোড়া চোখ।
-"নেপচুনের নতুন রাজা, তোমার রক্ত দিয়ে আমি আবার মহাবিশ্ব শাসন করবো।"
জাভিন হাসল।
-"এসো। আমার রক্ত চাইলে, আমার তলোয়ারও নিতে হবে।"
ভয়ানক এক যুদ্ধ হলো। শেষে ভ্রায়েলই মাটিতে পড়ে গেলো।
কিন্তু শেষ নিঃশ্বাসে বলে গেলো-
-"তোর রানির রক্ত আমাদের। পৃথিবীতে নেত্রী তারই অপেক্ষায় আছে। তার ডাক তোর রানি এড়াতে পারবে না।"
যুদ্ধ শেষ হলো।
নেপচুন নতুন রক্তে ভিজে গেছে।
জাভিন আর রিমি প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
-" এখন ও কিছুই শেষ হয়নি, রিমি।"
-"আমি জানি," রিমি মৃদু হেসে বলল।
জাভিন তার দিকে তাকালো তারপর তার কন্ঠস্বরের উপর নিজের ঠোঁট স্পর্শ করালো। তাদের নিঃশ্বাস মিশে গেল একই ছন্দে।
আর নেপচুনের অন্ধকারে জন্ম নিল নতুন কিংবদন্তি, দানব-রাজা আর রক্ত-রানির।
নেপচুনের গভীরতম প্রাসাদে অন্ধকার রাত নামলো। রিমির কক্ষের দরজাটা ধীরে বন্ধ হলো। বাইরের ঠান্ডা নীল হাওয়া থেমে গেল। ঘরের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতা ভাঙল রিমির বুকের দ্রুত ওঠানামায়।
------------
জাভিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখের লাল আভা অন্ধকার ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। রিমি পেছনে সরে দাঁড়াল—না ভয়ে, না লজ্জায়—বরং এমন এক আকর্ষণে, যেটা থেকে পালানো অসম্ভব।
-"আজ তুমি পালাতে পারবে না, হানিবান।"
রিমি শ্বাস গিলে বললো,
- "আমি… পালাচ্ছি না।"
জাভিন এগিয়ে এসে তার থুতনিটা আঙুল দিয়ে মুখ উঠালো।
-"তাহলে কেন কাঁপছো?"
রিমির গলা শুকিয়ে এলো।
-"কারণ তুমি… এমন, যেটা আমি বোঝাতে পারি না। খুবই ভয়ংকর, তবুও আমার।"
জাভিনের ঠোঁটে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।
-"ভয়ংকর? তুমি জানোই না, আমি তোমার জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারি।"
জাভিন হঠাৎ রিমিকে দেয়ালে ঠেসে ধরলো। তার ঠোঁট ঝড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো রিমির ঠোঁটে। শ্বাস নেওয়ারও ফুরসত নেই তার।
রিমি হাত দিয়ে জাভিনকে ধাক্কা দিতে গেলো। কিন্তু হাতগুলো নিজের ইচ্ছায় থেমে গেল তার বুকের ওপরে। সে আর প্রতিরোধ করতে পারল না বা হয়তো চাই ও না।
-"তুমি শুধুই আমার," – জাভিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল, রিমির ঠোঁট ছাড়েনি এক সেকেন্ডের জন্যও।
-"হুম আমি… তোমারই…" – রিমির গলা ভাঙা কন্ঠে বললো।
--------------
দুই শরীরের তাপ মিশে গিয়ে অন্ধকার ভেদ করে জ্বলতে লাগলো। জাভিন রিমিকে কোলে তুলে নিলো। তারপর নিমিষেই তাকে বিছানার ওপরে ছুঁড়ে ফেললো। তার চোখে এখন শুধু একটাই জ্বলন্ত আগুন, আর সেটা অধিকার।
-"আজ রাতে, তুমি শুধু একটা কথা মনে রাখবে, তুমি কার রানি।"
রিমি চোখ বুজে ফেললো। জাভিনের প্রতিটা ছোঁয়া আগুনের মতো তার শরীর জ্বালিয়ে দিচ্ছিলো। কিন্তু এই জ্বালা থেকে পালানোর কোনো ইচ্ছে নেই তার।
হঠাৎ জাভিন থেমে গেল। তার শ্বাস রিমির ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়লো।
-"রিমি…" – এবার গলাটা নরম, কোমলতা মিশ্রিত।
রিমি চোখ মেলে তাকিয়ে বললো,
- "হুম।"
জাভিন তার কপালে ঠোঁট রাখল।
-"তুমি জানো, আমি তোমাকে ভাঙতে চাই না। আমি শুধু… তোমাকে আমার করতে চাই। পুরোপুরি ভাবে।"
রিমি তাকে আরো জোরে চেপে ধরলো নিজের সাথে।
-"আমি তো অনেক আগে থেকেই তোমার।"
এবার জাভিন ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে ফিরে এলো। তার প্রতিটা চুম্বন কবিতার মতো, প্রতিটা স্পর্শ যেন এক এক করে দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে তাদের দূরত্বের।
রিমি অনুভব করছে, এই মুহূর্তে তাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। নেই নেপচুনের সিংহাসন, নেই রক্তের বোঝা, নেই যুদ্ধ। শুধু তারা দুইজন।
হঠাৎ ঘরের বাতাস পাল্টে গেল।
জাভিনের চোখের আভা লাল থেকে কালো হয়ে গেল।
রিমি এক মুহূর্তের জন্য ভয় পেল।
-"জাভিন…?"
জাভিন হেসে উঠল, একটা দানবীয় হাসির মতো।
-"তুমি জানো, তুমি কি করেছো? তুমি আমাকে পুরোপুরি মুক্ত করে দিয়েছো।"
তার শরীরের দানবীয় রূপ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় রিমি ভয় পেল না। বরং নিজের হাত বাড়িয়ে তার মুখ ছুঁয়ে দিল।
-"তুমি দানব নও। তুমি আমার জাভিন।"
জাভিন তার হাত চেপে ধরলো।
-"আর তুমি… আমার রক্তরানি। আর আজ রাতে, তুমি আমার শক্তির সমান অংশীদার হবে।"
তারপরের ঘটনা আর শব্দে বর্ণনা করা যায় না। এ এক ভয়ংকর কিন্তু অসীম তৃপ্তির খেলা। রক্ত, কামনা আর ভালোবাসার মিশ্রণের তৈরি প্রেম।
---
তারপর সবকিছু থেমে এলে, রিমি ক্লান্ত শরীর নিয়ে জাভিনের বুকে মাথা রেখে বললো
-"আমরা কি… ঠিক আছি?"
জাভিন তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
-"আমরা? আমরা পরিবর্তিত হয়েছি। আজ আমরা আমাদের ভালোবাসার সব সীমা পার করে ফেলেছি। তুমি আমাকে আমার দানব রূপেও গ্রহণ করেছো। তুমিই আমার রক্তরানি।"
রিমি চোখ বন্ধ করলো। বাইরে নেপচুনের আকাশে অদ্ভুত নীল আভা জ্বলছিল। যেন এই রাত তাদের জন্যই বদলে গেছে।
-" জাভিন আজ যদি তোমার কাছে কিছু জানতে চাই উত্তর দিবে?"
-"আমি জানি তুমি কি জানতে চাও।"
-"তাহলে কেন বলছো না। আমি চিন্তিত। "
-"আজ তুমি শুধু আমাকে গ্রহণ করো। আমার ভালোবাসায় নিজের তৃষ্ণা মিটিয়ে ফেলো। আজ কোন অতীত নয় রক্ত রানি।"
চলবে,,,,,
25/10/2025
#রক্তে_বাঁধা
#রুবাইয়া_রহিম_রিমি
~পর্ব-২৯~
নাইনার মৃত্যু তাদের দুজনের মনের গভীর ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিমি দেখে পারছে জাভিনের চোখে এক অসীম শূন্যতা, একেকবার তার মুখের অভিব্যক্তি যেন বদলে যাচ্ছে। জাভিন তার প্রতি একটু দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছে, যেন নিজের ব্যথা নিজের ভেতরেই গুঁজে রাখতে চায়।
কিন্তু রিমি জানে, এভাবে থামা যাবে না। নাইনার মৃত্যুতে তাদের একসাথে লড়াই করার আরো একটা কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিমি যতই দুর্বল হোক, তার ভিতর থেকে একটা অদম্য আগুন জ্বলছে সে জাভিনকে হারাতে চাই না। কিন্তু নাইনার প্রতি জাভিনের এমন দুর্বলতা রিমিকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
রিমি জাভিনকে বললো,
-"নাইনা চলে গেছে, কিন্তু তার স্মৃতিই তোমার শক্তি। আর তুমি—তুমি তার স্মৃতি নিয়েই বাঁচবে জাভিন।”
জাভিন মুখে সামান্য হাসি ফুটিয়ে বলল,
- “তুমি আমাকে শান্তনা দিচ্ছো নাকি নিজেকে ভাঙছো।”
রিমি কেঁপে উঠলো। হঠাৎ জাভিন তাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে শুরু করলো। রিমি তাকে শান্তনা দিতে পারছে না। তার হাত কাঁছে। জাভিনকে সে দু হাতে আগলে নিতে পারছে না। জাভিন রিমির দুই হাত ধরে নিজের পিঠে স্পর্শ করালো। রিমির চোখের কোনে নীল পানির চিহ্ন চিকচিক করে উঠলো। তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হচ্ছে। যেখানে ভেঙে যাওয়া মনগুলো একসাথে মেরামত হচ্ছে হয়তো, আর অন্ধকারের মাঝে আলো খুঁজে পাচ্ছে। জাভিন সেই অবস্থায় গভীর ঘুৃমে তলিয়ে গেলো।
----------------------------
নেপচুনের উপগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় এর প্রতি শত্রুদের আকর্ষণ বেড়ে গেছে। তারা পরিকল্পনা করলো, নেপচুনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেওয়ার জন্য, যাতে গেবসোকার ও ক্রায়েলের মত শত্রুদের ধ্বংস করতে। তাদের এই যাত্রা হবে কঠিন, বেদনাদায়ক, কিন্তু একসাথে তারা অজেয়। নেপচুনের নীলাভ আকাশে যেন অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসছে। ক্রায়েলের মৃত্যুর পর গেবসোকারের শত্রুতা এক ধাপ বাড়লেও, তার দল এখনও সম্পূর্ণ বিনাশ হয়নি। আর তারাই নেপচুনের রাজত্বের জন্য শেষ লড়াইয়ে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রিমি আর জাভিন, দুই দুর্দান্ত শাসক, যদিও নিজেদের মধ্যে নতুন এক দুর্বলতা অনুভব করছে, নাইনার মৃত্যু তাদের হৃদয়ে তীব্র আঘাত দিয়েছে। কিন্তু সেই কষ্ট তাদের একসাথে বেঁধে দিয়েছে আরও শক্তভাবে। রিমির চোখে তখনও কষ্টের ছায়া বিদ্যমান, তবে তার অজানা এক শক্তি জেগে উঠছে। তার রক্তের ভেতর লুকিয়ে থাকা গোপন রহস্যগুলো বুঝতে পারা এখন তার প্রধান লক্ষ্য।
রিমি আর জাভিন তাদের সেল আর যোদ্ধাদের নিয়ে এক গভীর গুহায় বসে পরিকল্পনা করছে।
-“আমাদের আর সময় নেই, গেবসোকার তাদের সঙ্গী জোগাড় করে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা যদি এখনই শক্তিশালী না হই, তবে নেপচুন হারিয়ে যাবে।”
রিমি তার মৃদু কণ্ঠে বলল,
-“আমার রক্ত এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এটা আমাকে দুর্বল করছে, তবে আমি একটা নতুন শক্তি অনুভব করছি। যা আমার শরীরে লুকিয়ে আছে, আমার আত্মার ভেতর। আমি বুঝতে চাইছি, এই শক্তিটা কি।”
জাভিন একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
-“সেই শক্তিটা তুমি একা বুঝতে পারবে না। আমি তোমার পাশে আছি, আমরা একসাথে এই রহস্য উদ্ঘাটন করবো।”
রিমির রক্ত যে অদ্ভুত, সেটা সবাই জানে। তবে এর গভীর রহস্য ছিল শুধু নেপচুনের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থে, যেটা বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছে।
রিমি ও জাভিন সেই গ্রন্থ খুঁজে পেতে এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান শুরু করল, যা নেপচুনের গভীরতম গুহায় লুকানো আছে। গুহার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, রিমি অনুভব করলো তার রক্ত গরম হয়ে উঠছে, যেন আগুনের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
-“আমার রক্ত আমাকে ডাকছে,”
গুহার ভিতরে ঢুকে তারা দেখল, পুরোনো দাগ আর রহস্যময় চিহ্ন দিয়ে লেখা এক গ্রন্থ। জাভিন সেটাকে খুলে দেখল। সেখানে লেখা ছিল—
-“রক্তের শক্তি যদি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তবে সেটি অজেয় হতে পারে। তবে তা না হলে, রক্ত নিজেই এক বিধ্বংসী আগুন হয়ে উঠবে।”
রিমি বুঝতে পারছে, তার রক্ত এক বিশেষ শক্তির বাহক, যেটা তার আবেগ, ভালোবাসা আর যন্ত্রণা থেকে উদ্ভূত। এই শক্তি যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে তা তার জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। যতই রিমি নিজের রক্তের রহস্য জানতে চাচ্ছে, জাভিন ততই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে।
জাভিনের নেতৃত্বে নেপচুনের বৈজ্ঞানিকেরা নতুন নতুন অস্ত্র ও রক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছে। তারা ব্যবহার করছে রিমির রক্ত থেকে সংগৃহীত কিছু শক্তি, যা বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।
তবে জাভিন এক আদেশ দিয়েছে কঠোর ভাবে, রিমির শরীর থেকে আর এক ফোটা রক্তও নেওয়া যাবে না। কারণ সে জানত, রিমির রক্তের এই শক্তি যতদিন তার শরীরে থাকবে, ততদিনই সে এক অনন্য শক্তির উৎস থাকবে।
-“আমাদের রাজত্বের জন্য রিমির রক্ত অমূল্য, তাই তাকে সুস্থ রাখতে হবে, আর তার শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।”
রিমি নিজেও বুঝতে পারছে তার ভেতরে একটা অদ্ভুত যুদ্ধ চলছে। সে ভালোবাসে জাভিনকে, তবে তার ভয়ও আছে, যে তার রক্তের শক্তি তাকে একদিন ধ্বংস করে ফেলবে।
-------------
রাতে, জাভিন যখন ঘুমাচ্ছে, রিমি উঠে তার পাশে বসলো। অস্থির হৃদয় নিয়ে সে বলল,
- “জাভিন, আমি ভয় পাচ্ছি… আমার রক্ত আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। যদি আমি হারিয়ে যাই, তবে তোমার জন্য কী হবে?”
জাভিন হালকা গলায় বলল, “আমি তোমার সঙ্গে আছি, রিমি। আমরা একসাথে এই যুদ্ধটা পার করবো। তুমি আমার জীবনের অর্ধেক, তোমাকে হারানো আমার পক্ষে অসম্ভব।”
রিমি তার হাত ধরে বললো,
-“তুমি জানো, আমার রক্ত দিয়ে তোমাকে আর কখনও সাহায্য করতে পারবো না। আমি তোমাকে দিতে চাই, কিন্তু তুমি সেটা নিতে পারো না।”
জাভিন একটু হাসল,
-“তুমি আমার রানি। তোমার রক্ত আমি চাই না। তুমি শুধু সুস্থ থাকো।”
এরই মধ্যে গেবসোকার তার সাম্রাজ্যের বাকি অংশকে শক্তিশালী করছে। সে জানে রিমি আর জাভিন একসাথে থাকলে তার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
তাই সে নতুন নতুন পরিকল্পনা করছে, যুদ্ধে নেপচুনকে পুরোপুরি দখল করার জন্য।
একদিন গেবসোকারের গুপ্তচরদের মাধ্যমে খবর আসে, রিমি আর জাভিন একটি শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করার পথে।
এবার যুদ্ধ হবে আরও বড়, আরও অন্ধকার, যেখানে ভালবাসা ও ঘৃণা দুই মিলেমিশে এক নতুন অধ্যায় গড়বে।
এক রাতে, নেপচুনের রাজপ্রাসাদের ছাদে জাভিন আর রিমি দাঁড়িয়ে ছিল।
জাভিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা যতই কঠিন হই না কেন, আমি জানি তোমার রক্ত আমার হৃদয়কে শক্তিশালী করবে।”
রিমি হাসল,
- “আমার রক্ত আর আমার ভালোবাসা তোমার জন্যই তৈরি।”
তারা একে অপরের হাত ধরে বলে উঠল,
-“এই নেপচুন হবে আমাদের প্রেমের রাজ্য, যেখানে অন্ধকার থাকবে না।”
নেপচুনের উত্তর প্রান্তে, যেখানে আলো পৌঁছায় না, সেখানেই আছে এক নিষিদ্ধ মন্দির “অগ্নির ক্রন্দন”। কথিত আছে, এখানে রক্ত ও প্রাণ উৎসর্গ করলে যে কোনো অভিশাপ ভেঙে যায়।
জাভিন মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কালো চাদর ঢাকা শরীর, হাতে নেপচুনের প্রাচীন রাজাদের তলোয়ার। রিমি তার পেছনে হাঁটছে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। তার চোখে এখন চেনা নীল নয়, গভীর লালচে আভা।
রিমি ফিসফিস করে বলল,
-“জাভিন… তুমি নিশ্চিত? এই জায়গাটা… ভয়ঙ্কর। মনে হচ্ছে যেন সবকিছু আমাদের গিলে ফেলবে।”
জাভিন তার দিকে তাকাল। চোখে সেই অদম্য দৃঢ়তা, যা রিমি এতদিনে শিখে নিয়েছে।
-“আমি নিশ্চিত। তোমাকে বাঁচাতে হলে এটাই একমাত্র পথ।”
মন্দিরের দরজায় ছিল আগুনে পোড়া অক্ষরে লেখা:
-“শুদ্ধির জন্য চাই দুই আত্মা: এক রক্তে ভেজা, এক মৃত্যুর পথে দাঁড়ানো।”
রিমি লেখাটা পড়ে বললো,
-“মানে… আমার রক্ত আর… তোমার জীবন?”
জাভিন তার মুখে হাত রেখে বলল,
“তোমার রক্ত আমি আর নিতে দেব না। শেষবারের মতো… আর এক ফোঁটাও নয়। যদি কোনো রক্ত দিতে হয়, সেটা আমার।”
রিমির গলা আটকে গেল।
-“না! আমি তোমাকে হারাতে পারব না, জাভিন। তোমার কিছু হলে আমি কীভাবে বাঁচব?”
জাভিন নরম স্বরে বলল,
-“তুমি বাঁচবে, রিমি। তোমার জীবন আমার চেয়ে বড়। তুমি শুধু আমার রানি নও… তুমি আমার অর্ধেক প্রাণ।”
মন্দিরের ভিতরে আগুনের বৃত্ত। চারপাশে দানবীয় ভাস্কর্য, চোখ ফাঁকা, মুখে চিৎকারের ছাপ।
জাভিন রিমিকে আগুনের মাঝখানে বসিয়ে দিল।
-“চোখ বন্ধ করো। যা-ই হোক, চিৎকার করবে না। এই ব্যথা আমাদের মুক্তি।”
সে নিজের হাতে তলোয়ার চালিয়ে বুকের ওপর গভীর ক্ষত করল। কালো রঙের মতো ঘন লাল রক্ত গড়িয়ে মাটিতে পড়তেই আগুন নীলচে হয়ে উঠল।
রিমি কেঁপে উঠে চিৎকার করে বললো,
-“না, জাভিন! থামো!”
জাভিন মন্ত্র পড়তে লাগল, প্রাচীন নেপচুনিয় ভাষায়, যা শুনে মনে হচ্ছিল হাজার মৃত আত্মা একসাথে কাঁদছে।
হঠাৎ আগুনের ভেতর থেকে অদ্ভুত হাত বেরিয়ে এলো, কালো নখরওয়ালা, যা জাভিনের শরীর জাপটে ধরলো।
আচার যত গভীরে যাচ্ছে, জাভিনের দেহ কাঁপছে। তার চোখ লাল হয়ে গেল, দাঁত দানবীয় আকারে বেরিয়ে এলো। রিমি তার দিকে এগোতে চাইলো, কিন্তু অদৃশ্য শক্তি তাকে আটকে রাখলো।
-“জাভিন! আমি তোমাকে মরতে দেব না!”
জাভিন হাসল, তার ঠোঁটে রক্ত।
-“আমাকে মরতে দিচ্ছো না, রিমি। আমাকে বদলাতে দাও।”
আকাশে বজ্রপাত, আগুন কালো ধোঁয়ায় পরিণত হলো। হঠাৎ এক মুহূর্তে জাভিনের শরীর মাটিতে পড়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
রিমি পাগলের মতো চিৎকার করো উঠলো,
-“না… না… জাভিন… আমাকে একা রেখো না…!”
সব শান্ত হঠাৎ আগুনের ভেতর থেকে ভাঙা কণ্ঠস্বর ভেসে উঠলো
-“রিমি…”
জাভিন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে আর আগের জাভিন নয়। চোখে নীল-লাল মিশ্র আভা, ত্বক যেন লোহার মতো শক্ত। পিঠে ছায়ার মতো দুটো ডানা।
সে ধীরে রিমির কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“আমি বেঁচে আছি। আর তুমি… মুক্ত।”
রিমি কাঁপতে কাঁপতে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল।
“তুমি আর আমার জাভিন নেই…”
জাভিন তার মুখ তুলে দিল।
-“না, রিমি। আমি এখনো তোমার। শুধু… এখন আমি এমন জাভিন, যাকে আর কেউ ভাঙতে পারবে না।”
রিমির অভিশাপ কেটে গেছে। তার চোখ আবার স্বাভাবিক নীলচে আলোয় ফিরেছে। কিন্তু জাভিন?
মন্দিরের বাইরে নেপচুনের আকাশে নতুন তারা জ্বলছে।
জাভিন তাকিয়ে বলল,
-“আজ থেকে, নেপচুনে নতুন যুগ শুরু হলো। আর আমি… আমি হব সেই যুগের রাজা। কিন্তু তোমাকে ছাড়া নয়, রিমি।”
রিমি চুপচাপ মাথা রাখল তার বুকে।
অন্ধকার, রক্ত, আর প্রেমের এই নতুন বন্ধন তাদের যাত্রা মাত্র শুরু করল।
চলবে,,,,,
Click here to claim your Sponsored Listing.
Website
Address
95