Poet Rokon Sheikh
Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Poet Rokon Sheikh, Writer, Gazipur.
উপন্যাসঃ-
“যে শহরে আমি আলো খুঁজিনি”
রোকন শেখ
পর্ব ৭: অসম প্রেমের শুরু
রোকন কখন প্রেমে পড়ল
সে নিজেও জানে না।
হয়তো সেই দিন,
যেদিন সারা তার খাতার একটা কবিতা পড়েছিল।
সারা বলেছিল—
— “তোমার লেখায় খুব কষ্ট,
কিন্তু কোথাও কোথাও আলো জ্বলে।”
রোকন মাথা নিচু করে বলেছিল—
— “আমি আলো বানাতে পারি না,
শুধু অন্ধকার লিখে ফেলি।”
সারা ধীরে বলেছিল—
— “অন্ধকার ছাড়া আলো বোঝা যায় না।”
এই কথা রোকনের বুকের ভেতরে
অনেকদিন ধরে বাজতে থাকে।
সে ধীরে ধীরে বুঝতে থাকে—
সে আর আগের মতো একা নয়।
কেউ তার চায়ের কাপে ভাগ বসিয়েছে।
তার নীরবতায় শব্দ তুলেছে।
কিন্তু সমস্যা এক জায়গায়।
রোকন দারিদ্র্য ভালোবাসে না,
তবু দারিদ্র্য তাকে ভালোবাসে।
অন্যদিকে সারা—
সে অভাবের ঘর থেকেই এসেছে,
কিন্তু তার চোখে স্বপ্ন আছে, পড়াশোনা আছে,
আগামীকাল আছে।
রোকন ভাবে—
“আমি কি তার আগামীকালের সাথে মানানসই?”
এক সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে সারা বলল—
— “রোকন, আমি বড় কিছু হতে চাই।”
রোকন ক্ষীণ হেসে বলল—
— “আমি বড় কিছু হতে পারি না…
আমি শুধু লিখতে পারি।”
সারা বলেছিল—
— “এই লেখাই একদিন তোমাকে বড় বানাবে।”
এই কথাটা
রোকনের জীবনের সবচেয়ে বড় আশার বাক্য হয়ে রইল।
সে রাতে সে লিখেছিল—
"আমি যদি কিছু না-ও হতে পারি,
তবু কেউ একজন যদি আমার ওপর বিশ্বাস রাখে,
এই বিশ্বাসই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।"
উপন্যাসঃ-
“যে শহরে আমি আলো খুঁজিনি”
রোকন শেখ
পর্ব ৬: ফাইভস্টার বনাম টং দোকান
সারা গ্রাম থেকে শহরে এসেছে পড়তে।
একটা সরকারি কলেজে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ে।
হোস্টেলে থাকে।
শহরের আলোঝলমল তার চোখ ঝলসে দেয়,
কিন্তু সে আলোতে হারায় না—
সে নিজের মতো করেই হাঁটে।
একদিন বিকেলে সে হঠাৎ বলল,
— “রোকন, আজ তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো।”
রোকন একটু অবাক হলো।
সারা তাকে নিয়ে গেল ফাইভস্টারের কাচঘেরা ক্যাফেতে।
এসি’র ঠান্ডা, নীল আলো, মিউজিক—
সবকিছু রোকনের কাছে অচেনা মনে হলো।
মেন্যু হাতে দিয়ে সারা বলল,
— “যা ইচ্ছে অর্ডার করো।”
রোকনের গলা শুকিয়ে গেল।
সে আস্তা আস্তা বলল,
— “এক কাপ… ব্ল্যাক কফি।”
কফি এলো।
সে এক চুমুক দিয়েই কেমন করে কাশি দিল।
সারা হেসে ফেলল।
রোকন তখন খুব নরম গলায় বলল,
— “জানো, আমার চা-টাই ভালো লাগে।”
সারা চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত করে বলল—
— “আমারও।”
দুজন তখন কাচের ভেতর বসে
কাচের বাইরের শহর দেখল।
রোকন বুঝল—
জায়গা আলাদা হলেও, মনটা যদি এক হয়
তাহলে পার্থক্য আর তেমন বড় থাকে না।
ক্যাফে থেকে বের হয়ে
সারা নিজেই বলল—
— “চলো, বাদল কাকার চা খাই।”
সেদিন ফাইভস্টারের চাকচিক্য হেরে গেল
টং দোকানের ধোঁয়ার কাছে।
উপন্যাসঃ-
“যে শহরে আমি আলো খুঁজিনি”
রোকন শেখ
পর্ব ৫: সারার আগমন
সারার সঙ্গে রোকনের প্রথম দেখা
ফাইভস্টারে না—
টং দোকানে।
এক বিকেলে আকাশটা ভারি হয়ে ছিল।
রোকন তখন চায়ের কাপ হাতে বসে আছে,
ডায়েরির পাশে কলম, মাথার ভেতরে আধা একটা কবিতা।
হঠাৎ একটা মেয়ের কণ্ঠ—
— “কাকা, এক কাপ লাল চা।”
রোকন তাকায়।
মেয়েটার চোখে শহরের তাড়াহুড়া নেই।
চুলে বাতাসের আলস্য।
পোশাকে আধুনিকতার ঔদ্ধত্য নেই—
সাধারণ, কিন্তু গভীর।
সে বসে রোকনের পাশের বেঞ্চ থেকেই।
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সারা বলে—
— “আপনি কি কবিতা লেখেন?”
রোকন একটু অবাক হয়।
— “কেন মনে হলো?”
সারা হালকা হেসে বলে—
— “কবিতা যারা লেখে, তারা চায়ের কাপের দিকেও অন্যভাবে তাকায়।”
রোকনের বুকের ভেতরে কিছু একটা কেঁপে ওঠে।
সে বহুদিন পর এমন একজন পায়
যে তাকে বোঝে—
প্রশ্ন না করেই।
বৃষ্টি নামে হঠাৎ।
টিনের চালে টুপটাপ শব্দ।
চা, বৃষ্টি, আর দুটো নীরব মন—
এক অদ্ভুত মূহূর্ত তৈরি হয়।
রোকন জানে না,
এই মুহূর্ত তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় শুরু করছে,
নাকি সবচেয়ে কষ্টের।
কিন্তু সে এটুকু জানে—
এই মেয়েটা আলাদা।
উপন্যাসঃ-
“যে শহরে আমি আলো খুঁজিনি”
রোকন শেখ
পর্ব ৪: লেখালেখির নেশা
রোকন শেখ লেখে কারণ সে কথা গুচাতে পারে।
যা মুখে আসে না, তা কলমে এসে পড়ে।
আর কলমে যা আসে, তা কেউ ঠিকমতো পড়ে না—
তবুও সে থামে না।
তার ঘরটায় যে জানালা।
জানালার পাশে বসা তার নেশা।
বাতাস ঢোকে, সঙ্গে ঢুকে পড়ে শহরের কোলাহল।
রোকন সেই শব্দের ভেতর থেকেও শব্দ খুঁজে নেয়—
কাগজের জন্য।
রাত বাড়লে তার চোখ জ্বলে ওঠে।
শহর ঘুমোতে গেলে সে জেগে ওঠে।
তার ডায়েরিতে লেখা থাকে—
"সবাই যখন বাস্তব খোঁজে,
আমি তখন কল্পনার ভেতর সত্য খুঁজি।"
সে বহু জায়গায় লেখা পাঠিয়েছে।
কেউ উত্তর দেয়নি।
কেউ “দুঃখিত” লেখেনি।
নীরবতার চেয়েও বড় অবহেলা তেমন কিছু নেই।
কিন্তু একদিন, টং দোকানে বসে চা খেতে খেতে
মোবাইলে একটা নোটিফিকেশন আসে—
“আপনার লেখা আমরা প্রকাশ করতে ইচ্ছুক।”
রোকনের হাত কাঁপে।
চায়ের কাপ ঠকঠক করে কেঁপে ওঠে।
সে বিশ্বাস করতে পারে না—
এই শহর কি সত্যি তার শব্দ শুনেছে?
সে রাতেই সে মাকে কল দেয়।
মা বলে—
— “দেখলি! তোর কাগজের ছেলেমানুষিগুলা একদিন মানুষ হবে।”
রোকন অনেকদিন পর হালকা করে হাসে।
উপন্যাসঃ-
“যে শহরে আমি আলো খুঁজিনি”
রোকন শেখ
পর্ব ৩: গ্রাম, মা আর পাঞ্জাবির গন্ধ
রোকনের গ্রাম অনেক দূরে।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে,
ইটের দেয়াল পেরিয়ে,
মোবাইলের টাওয়ার পেরিয়ে,
এক জায়গায় গিয়ে হঠাৎ সব কিছু ধীরে হয়ে যায়—
সেইটাই রোকনের গ্রাম।
গ্রামে গেলে তার মাথার ভেতরের শব্দগুলো কমে আসে।
শিশির ভেজা ঘাস,
পুকুরের জল,
কাদামাখা রাস্তা,
আর মায়ের ডাকা—
সব মিলিয়ে রোকনের বুকের ভেতর জমে থাকা ব্যথা একটু একটু করে নরম হয়।
মা এখনো তার জন্য পাঞ্জাবি সেলাই করে।
রঙ বেছে নেয় নিজে।
কাপড়ে ভাঁজ দেয় নিজের হাতে।
তারপর বলে—
— “শহরের মানুষগুলা পোষাক বদলায়, জীবন বদলায় না।
তুই পোষাক বদলাইস না, কিন্তু মনটা বদলাইস না যেন।”
রোকন কিছু বলে না।
সে শুধু মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এই হাতই তাকে মানুষ বানিয়েছে,
এই হাতই তাকে আবার ভেঙে গেলেও জোড়া লাগাবে।
রাতে গ্রামে ঘুমালে রোকন জানালার পাশে শুয়ে থাকে।
ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনে।
তার মনে হয়—
এই অন্ধকারের ভেতরেও কত শব্দ বেঁচে থাকে।
সে খাতায় লেখে—
"যে শহরে সবাই আলো খোঁজে,
সেই শহরে আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকি,
কারণ আমি জানি—
আলো অন্ধকার থেকেই জন্ম নেয়।"
উপন্যাসঃ-
“যে শহরে আমি আলো খুঁজিনি”
রোকন শেখ
পর্ব ২: টং দোকান, বাদল কাকা আর ধোঁয়া ওঠা চা
সে প্রতিদিন ঠিক একই পথে হাঁটে।
এই শহরে যেখানে সবাই নতুন রাস্তা খোঁজে,
রোকন সেখানে পুরোনো পথটাই আঁকড়ে ধরে।
রাস্তার মাথায় ছোট্ট একটা টিনের চাল।
নীচে কাঠের বেঞ্চ, পাশে কয়লার চুলা,
আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে বাদল কাকা—
গ্রাম থেকে শহরে আসা এক অবাক মানুষ।
রোকন এসে চুপচাপ বসে পড়ে।
বাদল কাকা কোনো প্রশ্ন করে না।
চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়,
একটা ধোঁয়ার মতো উষ্ণতা ভেসে আসে।
রোকন চায়ে চুমুক দেয়।
তার চোখ তখন রাস্তার ভিড়ের দিকে—
লোকজন ছুটছে, কেউ অফিসে, কেউ প্রেমে, কেউ টাকায়, কেউ ক্ষমতায়।
সবাই কোথাও না কোথাও পৌঁছাতে চায়।
কিন্তু রোকন?
সে কোথাও পৌঁছাতে চায় না।
সে শুধু বসে থাকতে চায়—
এই চায়ের দোকানে,
এই ধোঁয়ার ভেতরে,
এই ক্ষণিকের নিস্তব্ধতায়।
বাদল কাকা একদিন জিজ্ঞেস করল,
— “তুই কী করিস রে বাবা?”
রোকন হালকা হেসে বলল,
— “আমি মানুষ জমাই, কাকা। কাগজের ভেতরে।”
বাদল কাকা কিছু বুঝল না, তবু মাথা নেড়ে বলল,
— “ভালা, তুই যা করিস, কর। তবে নিয়মিত চা খাইস।”
এই শহরে রোকনের সবচেয়ে আপন জায়গা এই টং দোকান।
কারণ এখানে কেউ তাকে প্রমাণ করতে বলে না—
সে কে, কী করে, কেন আলাদা।
উপন্যাসঃ-
“যে শহরে আমি আলো খুঁজিনি”
রোকন শেখ
পর্ব ১: অগোছালো শহরের অগোছালো এক ছেলে
শহরটা খুব গোছানো।
লোকজন সময় মেনে হাঁটে, কথা মাপে, পোশাক মাপে, এমনকি অনুভূতিও মেপে ব্যবহার করে।
কিন্তু এই গোছানো শহরের এক বিল্ডিংর ছ'তালায় থাকে এক অগোছালো ছেলে।
তার নাম রোকন শেখ ।
কেন এই নাম রাখা হয়েছিল, সে নিজেও জানে না।
সে শুধু জানে—জীবনটা আদর পায়নি কখনো।
সকালের শুরু হয় তার দেরিতে।
কারণ সে রাত জাগে।
নেটফ্লিক্স দেখে না, গেম খেলে না—
লেখে।
টেবিলের ওপর ছড়ানো থাকে খাতা, কলম, পুরোনো ডায়েরি।
কফির মগে চা জমে থাকে ঠান্ডা হয়ে।
জানালার বাইরে শহরের আলো, ভেতরে তার নিভু নিভু মন।
সে আয়নায় তাকায় না বেশি।
কারণ সে জানে, তাকে দেখে কেউ মুগ্ধ হবে না।
অগোছালো চুল, চোখের নিচে কালচে ছাপ,
আর মুখে সেই চিরচেনা ক্লান্তি।
সে বাইরে বের হয় পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে।
এই শহরে এটা আলাদা করে চোখে পড়ে।
অনেকে তাকিয়ে থাকে, কেউ হাসে, কেউ অবজ্ঞা করে।
সে কারো দৃষ্টিকেই পাত্তা দেয় না।
তার ভেতরে সে এখনো নব্বইয়ের একটা দুপুর বাঁচিয়ে রাখে।
তার গন্তব্য একটাই—
রাস্তার মোড়ের টং দোকান।
ছোটগল্পঃ-বিলাসিনী
রোকন শেখ
রাত নেমেছে ধীরে ধীরে—নরম, ভিজে, নিঃশব্দ এক রাত। কবি অরূপ বসে আছে নিজের ফ্ল্যাটের বারান্দায়, জানালার বাইরে ঝুলে থাকা আলো আর শহরের দূরন্ত শব্দের ফাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে তার মন।
চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। কবিতার খাতাটা খোলা, কিন্তু একটিও শব্দ আসছে না। আজকাল শব্দেরা তার সাথে অভিমান করে আছে—যেন কারো প্রতীক্ষায় তারা আটকে আছে।
অরূপ জানে, সে কাকে খুঁজছে। এক নারী—যাকে সে কখনো দেখেনি, কিন্তু প্রতিদিন অনুভব করে। এক অচেনা মুখ, যার হাসিতে সে নিজের কবিতা গড়তে চায়, যার চোখে ডুবে যেতে চায় ক্লান্ত শহরের সমস্ত আলো নিভিয়ে।
রাত আরও গভীর হয়। হঠাৎই নিচে, রাস্তার পাশে এক মেয়ে থামে—লাল শাল জড়িয়ে। বাতাসে ওড়নার প্রান্তটা উড়ে আসে অরূপের চোখে। মনে হয়, যেন ঠিক তার জন্যই মেয়েটি থেমেছে।
অরূপ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটি মুখ তুলে উপর দিকে চায়—চোখে এক অচেনা দীপ্তি। তারপর হাসে—একবার, মৃদু।
সেই হাসিটা যেন অরূপের বুকের ভেতর আলো জ্বেলে দেয়।
সে জানে, এ শহরে এমন আলো খুব কম জন্মায়।
রাতটা তখন কবিতায় ভরে ওঠে—
সে খাতায় লেখে,
“তুমি হয়তো জানো না,
আমি কতদিন ধরে তোমার পায়ের আওয়াজ খুঁজে ফিরি।
আজ তুমি এসে গেলে,
আমার নিঃসঙ্গতা বিলাসে ভরে উঠল।”
তারপর সে জানালা খুলে দেয়, বাতাস ঢোকে, আর লাল ওড়নাটা এক মুহূর্তের জন্য উড়ে এসে জানালায় ছোঁয়া দেয়।
অরূপ জানে না মেয়েটি আসলেই উঠল কি না, দরজায় কড়া পড়ল কি না।
শুধু জানে—সেদিন রাত থেকেই, তার প্রতিটি কবিতার শুরুতে একটা নাম জেগে ওঠে—
বিলাসিনী।
-ছোটগল্প: স্মৃতির ছায়া-
রোকন শেখ
বিকেলবেলা। আকাশটা ভারি কালো হয়ে আছে। হাওয়া থমকে গেছে, মনে হয় এই বুঝি ঝুম বৃষ্টি নামবে। ফারহান বসে আছে বারান্দায়। সামনে একটা ভাঙা চেয়ার, তাতে হেলান দিয়ে চা খাচ্ছে। চায়ের কাপে একচামচ চিনি, অথচ ফারহান এখন আর চিনি খায় না। ডাক্তার বারণ করছে অনেকদিন। কিন্তু আজ তার ছোটভাই মজা করেই চিনি দিয়ে দিয়েছে। চুমুক দিতেই বিরক্তি এসে ভর করলো মনে।
এই সময়েই তন্ময় এসে হাজির। হাতে দুইটা গরম সিঙ্গারা, চোখেমুখে চেনা হাসি।
– কিরে হে, মুখটা কেমন জানি কাইটা গেছে!
– কিছু না রে। গরমে শরীর জ্বলতাছে, মেজাজও খারাপ লাগতাছে।
– তুই তো ফুরফুরে মানুষ, তোর আবার মন খারাপ ক্যান?
ফারহান চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর আস্তে আস্তে বললো,
– মনে আছে নুপুররে?
তন্ময় হেসে উঠলো।
– মনে আছে বলছিস? নুপুরের নাম শুনলেই তোর চোখ জ্বলে উঠতো। ক্লাসে বসে থাকলেও তুই সবসময় জানলার বাইরে তাকাই থাকতিস, শুধু এই জন্য যে নুপুর হয়তো একবার পাশ দিয়া যাবো।
ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
– হুম... তিন বছর হইছে, তবু মনে হয়, আজও সে কাছেই আছে।
– আরে ভাই, তিন বছর তো অনেক দিন! ভুলে যাওয়া যায় না নাকি?
– দু’একটা মুখ থাকে বুকের মধ্যে সারাজীবন। কিছু হাসির শব্দ, কিছু অঙ্গভঙ্গি, কিছু চোখের দৃষ্টি... সেগুলা ভুলা যায় না। তার হাসিটা এখনও কানে বাজে।
তন্ময় সিগারেট ধরালো। ধোঁয়া উড়তে লাগলো বাতাসে।
– ধরা যাক একদিন আবার হঠাৎ দেখা হইল। তুই কি কিছু বলবি ওরে?
– বলবো। শুধু এইটুকুই...
“একবার আমার দিকে তাকাইতে দে, আমি আবার চিনে নিতে চাই।”
তন্ময় হেসে কাশি চাপলো।
– তুই তো আস্ত কবি হইয়া গেছিস দেখি। চল, কবিতা লিখ। সিগারেটটা ধরাও, আমি শুনি।
ফারহান ধোঁয়ার ভেতরেই হারায়ে গেল। তার চোখ ভিজে উঠলো। তন্ময় মজা করেই পড়তে শুরু করলো—
দেখা হবে অন্যমনস্কতায়,
যদি কথায় ভিজে উঠে পুরনো দিনের ছায়া।
যদি চোখে জমে থাকে নীরব অশ্রু,
দেখা হবে একদিন ভুলে যাওয়া রাস্তায়।
ফারহানের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করলো। মনে হলো, এই মেঘলা বিকেলেই হয়তো নুপুর হেঁটে চলে আসবে রাস্তা ধরে। আবার হাসবে, আবার তাকাবে তার চোখে। অথচ জানে, এ শুধু কল্পনা...
কবিতা: পদ্মপাড়ের কুসুম
শিশিরভেজা হাওয়ায় ওড়ায় শতরঞ্জির রঙিন প্রান্ত,
নুপূরধ্বনিতে বাজে নরম আলপনার ছন্দ,
চুলে গুঁজে রাখা শিউলি ফুলের পাশে বসে
একটা ছোট্ট প্রজাপতি।
পূর্ব দুপুরে ধীরে ধীরে আসে
কমলাক্ষী এক বাউল-বিনিতা।
— "এমন করে কী দেখছেন?"
প্রশ্ন করে সে সান্ধ্য-ধ্বনিতে।
আমি বলি,
"তোমার চোখে যেন ধরা পড়ে কুড়িগ্রামের শীতভোর।"
— "মিথ্যে বলবেন না," হাসে সে,
"আপনার অন্তর আমি খেয়াল করি খুব।"
সে বলে—
“আমাকে বুঝতে হলে
পথের ধুলোয় পা রাখতে হয়,
আত্মা ছুঁতে হয় গীতবিতানের পাতায় পাতায়,
বাউল গান শুনতে হয় একলা সন্ধ্যায়।”
এখন আর কোথাও যাওয়া হয় না—
কুমিল্লার অলস দুপুরে আমায় বেঁধে রাখে স্মৃতির কঞ্চি-ঝোপ।
পালকঢাকা একটা সাদা হাঁসের নিচে লুকিয়ে থাকি,
চেয়ে দেখি যা ছিল না কোনোদিন আমার—
তবু হৃদয়ের খাঁচায় জায়গা করে নেয় নিঃশব্দে।
তুমি আর আমি ঠিক ফাল্গুন আর চৈত্রের মতো—
তোমার শেষে আসে আমার আরম্ভ,
আমি হাঁটি বাউল বেদনার ৩৩৪ ধাপ,
তবুও তুমি চলে যাও—
যেখানে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু ফেরা নয়।
একটা কথা দিও—
দেখবে না কোনো শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা চাঁদ
পড়েছে কারো চোখের পানে— বলবে না “চলো, গোধূলি দেখি।”
এক গুচ্ছ কষ্ট দিও,
তবে আর কারো পাশে তোমাকে দেখার দহন দিও না।
তুমি রয়ে যেও—
যেমন মাটির ভেতর গাঁথা থাকে
পদ্মপাড়ের কুসুম—শিকড়ছাড়া, অথচ অবিচ্ছিন্ন।
—রোকন শেখ
(লোক-সংস্কৃতি ও মনের গাঁথুনি থেকে জন্ম নেওয়া ছায়াপদ্য)
এক কাপ চা ও এক গুচ্ছ আক্ষেপ
— রোকন শেখ
ভূরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম
— মামা, এক কাপ চা দাও, আরেকটা বাড়তি চিনিসহ।
আজ একটু বেশি মিষ্টি দরকার।
— কি কবি, মুখ থমথমে কেন?
— কিছু না মামা। আজ মানুষ দেখতে এসেছি।
— মানুষ? হুঁম! কতো রকমেরই তো আসে যায়। কী এমন দেখলে?
— দেখছি মানুষ কতটা ভালোবাসা পায়।
ঐ দেখো, ছোট পোলাটা মা'কে পেয়ে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলো যেন মায়ের কোলে পৃথিবীর সব শান্তি।
আরেকটু দূরে ঐ প্রেমিক যুগল—মেয়েটা ছেলেটার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, যেন ক্লান্ত মুখে একটু পরশ দিতে চায়।
— আজ তোমার কথা বেশি গভীর শোনাচ্ছে কবি।
— আসলে, মাঝে মাঝে নিজেই নিজের মধ্যে ডুবে যাই।
চেনা মুখগুলোর ভিড়ে একটা অচেনা খোঁজ চলে… এমন কাউকে খুঁজি, যার কাছে বলব,
👉 “আজ মন ভালো না। কিন্তু এই কথা শুধু তোমায় বলতেই ভালো লাগছে।”
— এই তো চাওয়া?
— হ্যাঁ মামা, চাওয়া তেমন কিছু না।
শুধু চাই, কারও কণ্ঠে ক্লান্তির শেষে একটু আদর থাকুক।
কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক, “তুমি খেয়েছো তো?”
এইটুকুই তো।
আমরা কবি বলে কি আমাদের একটু আদর পাওয়ার অধিকার নাই?
আমরা কি পাথর?
আমরাও তো মানুষ, আমাদেরও তো মন খারাপ হয়।
— তাহলে বলেন না কাউকে?
— কাকে বলব মামা?
আমার কথার গভীরতা কেউ বুঝবে?
যাকে বলার সাহস করব, সে হয়তো বলবে,
👉 “তুমি তো সবকিছুর ওপরে, কবি হয়ে গেছো!”
এইখানেই সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—আমরা বলতে পারি না।
ভালোবাসা চাই, কিন্তু মুখ ফুটে চাইতে পারি না।
একদিন কেউ যদি থাকতো পাশে...
তাহলে বলতাম,
👉 "আমার জন্য এক গুচ্ছ ফুল এনো, আর কিছু না।
বিশ্বাস করো, বহুদিন বাগানে যাই না,
কৃষ্ণচূড়া, বকুল, টগর—দেখাও হয়নি ছুঁয়েও।”
— কবি, এত ভাবনা করে লাভ কী?
— যারে চাও, সেও তো অনেক দূরে চলে যায় না?
— হ্যাঁ মামা। মানুষ তেমনই।
যার কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়া সহজ, তাকে উপেক্ষা করে চলে যায়।
আর যাকে পাওয়া যায় না, তার পেছনে অন্ধ দৌড়।
— তুমি বলেছিলে, যত্নের অভাবে মানুষ মরে?
— হ্যাঁ। সত্যি বলছি, যত্নের অভাবেই মানুষ মরতে শেখে।
একাকিত্ব মানুষকে শক্ত করে না, বরং ধীরে ধীরে গলাটিপে মারে।
— তাইলে কবিরাও একা?
— হ্যাঁ। আমাদেরও কাঁধে হাত রাখার কেউ থাকে না।
সবাই ভাবে কবি মানেই ছন্দ, কাব্য, জোছনা—
কিন্তু বাস্তবের কবি বোবা কান্না কাঁদে।
— মা'কে কি মনে পড়ে কবি?
কবি চুপ করে থাকে।
তারপর হালকা হাসে।
চোখে ধরা পড়ে না, তবু বুঝি সে কাঁদছে।
একটা সিগারেট নিভিয়ে কবি উঠে দাঁড়ায়,
যেন কিছু বলতে চেয়েও বলে না।
তার চলে যাওয়া দেখে মনে হয়,
কেউ একজন কত কিছু বলার ছিল,
কিন্তু বলা হয়নি, কারণ কেউ ছিল না শুনবার।
"মানুষ শুধু বেঁচে থাকে না,
অনেকেই আক্ষেপ নিয়ে বাঁচে।"
Click here to claim your Sponsored Listing.