Muntasir Rasel

Muntasir Rasel

Share

কবি, লেখক ও সংগঠক

16/09/2025

আজ থেকে কার্যকর—আমি আমার রাজ্যের নাম ঘোষণা করছি।
রাজধানী: হৃদপিণ্ড।
জাতীয় প্রতীক: একটি আয়না—ফিল্টার ছাড়া।
জাতীয় সঙ্গীত: যে নীরবতা অজুহাত শোনে না।

এই রাজ্যে শাসক একজন—আমি।
কিন্তু ভয় নেই, রাজদণ্ড এখানে দণ্ড নয়, মেরুদণ্ড।
নির্বাচন কমিশন নেই, কারণ ভোট লুট হয় না—
মূলত ভোটই লাগে না, লাগে দায়।

সভাসদ চাইলে থাকবে—শুধু তারাই,
যাদের ছুরি ধারালো, কিন্তু হাত পরিষ্কার;
যারা প্রশংসার বিনিময় করে না,
যারা আয়নার মতো নির্মোহ
এবং আয়নার মতোই নিরপেক্ষ।
তাদের পদবি—সমালোচনা মন্ত্রী, বিবেক সচিব, শোকজ উপদেষ্টা।
তাদের কাজ—মুখে সরাসরি বলা, আড়ালে একটিও শব্দ নয়।

এখন নিষেধাজ্ঞার খসড়া শুনে নাও—
যে আত্মীয় আমাকে অবস্থানের কারণে এড়িয়ে গেছে,
যে বন্ধু ক্যারিয়ারের স্বার্থে সরে দাঁড়িয়েছে,
যে সহযোদ্ধা ঝড় থামতেই দৌড়ে গেছে অন্য ছায়ায়—
তাদের ভিসা স্থায়ীভাবে প্রত্যাখ্যাত।
এই রাজ্যে সুবিধাবাদের কোনো এমার্জেন্সি লেন নেই;
ছোট দরজা নেই, সাইড ডোর নেই,
শুধু সামনের গেট, আর তাতে লেখা—সাহস ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।

আর যারা—
উপকারের নামে প্রতিশ্রুতির চেক লিখে
তারিখের জায়গায় ‘শিগগিরই’ লিখে রেখেছিল,
যারা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সঙ্গে
কথা বদলায় আর কণ্ঠ বদলায়—
তাদের সব পদ বাতিল,
তাদের মাধুর্য এই রাজ্যে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ঘোষিত।

তবুও সাড়া দিয়েছিল কিছু মানুষ—
তারা জানত, আমি ভুল করেছি;
তবু রাতের শেষে দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, “ পাশে আছি।”
তারাই হবে আমার নিমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি—
তাদের জন্য প্রাসাদের আলো জ্বলে থাকবে,
সিংহদ্বারে পাহারা থাকবে কোমল,
আর ভেতরে থাকবে একটি টেবিল—ঢেকে রাখা নয়, খোলা—
যেখানে ঋণ শোধ হয় কৃতজ্ঞতার নীরবতায়।

এই রাজ্যের সংবিধান সংক্ষিপ্ত—
ধারা ১: আলো ছাড়া কোনো নীতি বৈধ নয়।
ধারা ২: আড়ালের ভাষা এখানে সরকারি ভাষা নয়।
ধারা ৩: যে কথা প্রকাশ্যে বলা যায় না,
তা কাগজে লেখা হলেও তার স্থান ডাস্টবিনে।

এটাই আমার রাজ্য: ছোট, তীব্র, আত্মমুখী।
এখানে সিংহাসন কাঠের, কিন্তু দৃঢভাবে স্থাপিত।
এখানে রাজকীয় পোশাক নেই, নেই জৌলুস অথবা চাকচিক্য।
এখানে কর বসে না,
আছে শুধু একটি কর—মিথ্যার ওপর শুল্ক: একশ শতাংশ।

ঘোষণা শেষ। গেজেট জারি।
দরজা খোলা শুধু তাদের জন্য
যারা সত্যকে সামনে থেকে দেখে,
আর ভালবাসাকে পিছন থেকে নয়—
ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে বলে: তোমার ভুল আছে, তবু আমি আছি।

কবিতা: একাকী রাজ্যের গেজেট
—মুনতাসির রাসেল ( Muntasir Rasel)

22/07/2025

ভাইরাল হবার মোহে ব্যক্তিত্ব পেশাদারত্ব হারাচ্ছি কী?
—মুনতাসির রাসেল

কিছু পেশা আছে যেগুলো কেবল জীবিকা নয়, সমাজে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পথ দেখায়। যেমন শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা ধর্মীয় নেতা। তাদের কাজ শুধু পড়ানো, চিকিৎসা দেওয়া, ধর্মীয় উপদেশ প্রদান নয়—তারা নিজের অজান্তেই হয়ে ওঠেন সমাজের বিবেক ।

তাদের হেঁটে চলা, কথা বলা, এমনকি মুখের ভঙ্গিও মানুষ গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে। কারণ, তারা নিজের পরিচয়ের বাইরেও একটি অবস্থান বহন করেন—যেটি আলাদা, গুরুত্বপূর্ণ এবং সমাজের বাকি অংশের জন্য আদর্শের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।

এইজন্যই যখন তারা কনটেন্ট নির্মাতা হয়ে ওঠেন, ক্যামেরার সামনে আসেন, তখন প্রশ্ন আসে— তারা কি শুধুই নিজের কথা বলছেন, নাকি নিজেদের মর্যাদাকেই বিনিময় করে নিচ্ছেন একরাশ লাইক, শেয়ার আর ভাইরালিটির মোহে?
১.
একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না—তিনি একজন জীবন্ত পাঠ্যবই হয়ে ওঠেন। শ্রেণিকক্ষে তাঁর উপস্থিতি, ভাষা, পোশাক, মেজাজ—সবকিছু শিক্ষার্থীর চরিত্র নির্মাণে অদৃশ্য ভূমিকা রাখে।

ছাত্ররা যেভাবে বই পড়ে, ঠিক সেভাবেই দেখে স্যারের মুখ, তাঁর আচরণ। একজন শিক্ষক যেমন বলেন—ভালো মানুষ হও, ছাত্রের মনেও ঠিক তেমনই গেঁথে যায়—স্যার নিজেই কি সেই মানুষটি?

এই মানুষটাই যখন রিল বানাতে গিয়ে নাচেন, হাস্যকর সংলাপে অভিনয় করেন, ছাত্রদের নিয়েই ট্রেন্ডি ভিডিও বানান— তখন শ্রেণিকক্ষ হয়ে যায় কনটেন্ট স্টুডিও। আর শিক্ষক হয়ে ওঠেন ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামা আরেকজন প্রতিযোগী।

ছাত্র-ছাত্রীরা তখন আর তাকে শ্রদ্ধা করতে শেখে না বরং শেখে উপভোগ করতে। এই উপভোগ একধরনের শ্রদ্ধাহীনতা তৈরি করে—যেটা শিক্ষকতা পেশাকে নিঃশব্দে তুচ্ছ করে ফেলে।

তাহলে কি শিক্ষক কনটেন্ট বানাবেন না?

অবশ্যই বানাবেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, বোঝাপড়া—সবকিছু এই সমাজের দরকার। কিন্তু কনটেন্ট যেন হয় তাঁর পেশার শালীনতা ও মর্যাদার আলোয় আলোকিত।

উপস্থাপন হোক শিক্ষামূলক বিষয়ের, পাঠদানের নতুন পদ্ধতির, কিংবা ছাত্রদের অনুপ্রেরণামূলক গল্পের— কিন্তু যেন কোনো অবস্থায় শিক্ষকতা হাসির খোরাকে রূপ না নেয়।

এই দৃষ্টান্তেই দাঁড়িয়ে আছেন মুনজেরীন শহীদ। তিনি আমাদের দেখান—কিভাবে একজন শিক্ষক, আধুনিক মাধ্যম ব্যবহার করেও, নিজের ব্যক্তিত্ব ও পেশার মর্যাদা অটুট রাখতে পারেন। তাঁর কনটেন্ট জ্ঞানভিত্তিক, সৌজন্যময়, এবং এমনভাবে নির্মিত—যা শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষকের গুরুত্ব ও সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করে।

২.
একজন মানুষ যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তাঁর সঙ্গে শুধু অসুস্থ শরীরটা থাকে না; থাকে অজানা আশঙ্কা, ভিতরের একরাশ ভয় আর থাকে একধরনের অব্যক্ত প্রার্থনা—তার কিছু যেন না হয়,থাকে বাঁচার আকুতি।

এই ভয় আর ভরসার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে একজন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন রোগীর চোখে একরকম আশার আলো—যাঁর কণ্ঠে আশ্বাস, চোখে মমতা আর হাতে নির্ভরতার স্পর্শ থাকে।
এই সম্পর্কটা এতটাই স্পর্শকাতর, এতটাই আন্তরিক, যেটা ভেঙে ফেলতে খুব বেশি কিছু লাগে না—শুধু একটা ভুল ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, একটা ভুল উদ্দেশ্যই যথেষ্ট।

কিন্তু আজ আমরা দেখি, কিছু চিকিৎসক হাসপাতালের করিডোরেই রেকর্ড করেন রিল, মুখে মাস্ক ঝুলিয়ে, ক্যামেরায় চোখ রেখে বলেন—“বন্ধুরা, আজকের কনটেন্টে দেখুন…”আর পেছনে হয়তো বসে আছেন একজন রোগী—যাঁর ভয়, যন্ত্রণার কোনো জায়গা নেই ওই ক্যামেরার ফ্রেমে।

এই চিত্রের একেবারে উল্টোপথে হাঁটেন ‍ডা. তাসনিম জারা। তাঁর ভিডিওতে নেই মেকআপে ঢাকা মুখ, নেই বিনোদনের নাটকীয়তা।
তিনি জানেন, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই শুধুই নিজেকে উপস্থাপন করা নয়—তা একধরনের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব থেকে তিনি বলেন, বোঝান, শেখান। স্বাস্থ্যের জটিল বিষয়গুলোকে তিনি এমন সহজ ভাষায় তুলে ধরেন, যেন একজন বড় বোন পাশে বসে আদর করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন—এই জিনিসটা ভয় পাওয়ার কিছু না, আমি আছি।তাঁর চোখে মেকি আলো নেই, কিন্তু আছে মানবিক দীপ্তি। তাঁর কণ্ঠে নেই চিৎকার, কিন্তু আছে ভরসার নিঃশব্দ বলিষ্ঠতা। তিনি দেখিয়ে দেন—ক্যামেরার সামনে থেকেও একজন চিকিৎসক তাঁর শপথ ভুলে যান না।

৩.
ধর্মের কাজ মানুষকে নিছক ভয় দেখানো নয় বরং মানুষকে ভেতর থেকে জাগানো যাতে মানবিক গুণাবলির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। আত্মা যেখানে হাঁপিয়ে ওঠে, মন যেখানে দুর্বল হয়, ধর্ম সেখানে হয় আশ্রয়।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকাল কিছু ধর্মীয় বক্তা ক্যামেরা দেখলেই উত্তেজিত হন। তাঁদের কণ্ঠে উঠে আসে রাগ, আঘাত, অসহিষ্ণুতা, দলীয় বার্তা, রাজনৈতিক মিশ্রণ।
আয়াত-হাদিসের ছায়ায় জন্ম নেয় গুজব, বিভেদ আর গর্জন। এই ওয়াজের মঞ্চগুলো যেন কখনো কখনো হয়ে ওঠে—শান্তির বদলে হট্টগোলের উৎস, আত্মশুদ্ধির বদলে ভিউ-বাণিজ্যের কেন্দ্র।

এই রাস্তায় না গিয়ে, ‍মুফতি ড. মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ হাঁটেন আলোর পথে। তাঁর কথা ধীর, চিন্তাশীল, গভীর। তাঁর কনটেন্টে নেই অহেতুক নাটকীয়তা, নেই অন্যকে হেয় করে নিজেকে বড় দেখানোর কৌশল।
তিনি জানেন—ধর্ম মানে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করা। তাই তাঁর ভিডিওতে ঝড় ওঠে না, তবে মানুষ চুপ করে শোনে।
তিনি ভায়োলেন্স শেখান না, সংযম শেখান। তিনি প্রমাণ করেন— ক্যামেরার সামনে থেকেও একজন মুফতি নিজের ভিতরটাকে অটুট রেখে, মানুষের মধ্যে আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন।

এই সময়টা ভাইরাল হওয়ার সময়। সেই ভাইরালিটি কেউ কেউ কিনে নেন হাস্যকর অভিনয় দিয়ে, কেউ কেউ হাঁটছেন নিজের আত্মমর্যাদা বিসর্জনের পথে।

কিন্তু তার বিপরীতেই আছেন এমন কিছু মানুষ—যাঁরা ভাইরাল হন, কিন্তু কখনোই নিজের পেশা, নৈতিকতা কিংবা ভেতরের বিশ্বাসকে বিসর্জন দেন না। মুনজেরীন শহীদ, ডা. তাসনিম জারা, মুফতি সাইফুল্লাহর মত এমন অনেকেই আছেন—তাঁরা দেখান, আপনি জনপ্রিয় হতেই পারেন, তবে সেটা হতে হবে আপনার শুদ্ধতা দিয়ে—আপনার বিচ্যুতি দিয়ে নয়।

এই সময়টা আমাদের জিজ্ঞাসা করে—আপনি কনটেন্ট বানাচ্ছেন তো, কিন্তু আপনি নিজেকে কোথায় হারিয়ে ফেলছেন কালের গহ্বরে?

আমরা চাই, পেশাজীবীরাও ভার্চুয়াল জগতে আলো ছড়ান, তবে সেটি যেন হয় সত্যিকারের আলো, ক্যামেরার নয়—চরিত্রের, দায়িত্বের, মূল্যবোধের আলো। সত্যিকারের সাফল্য তখনই আসে, যখন আপনি নিজের অবস্থান, পরিচয়, পেশা এবং সম্মান—সব কিছুকে সুরক্ষিত রেখে সামনে এগিয়ে যান।

🔁 এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে বাধা দেওয়া বা হেয় করা নয় বরং আত্মসচেতনতা জাগানো।
আপনার পেশা হোক আপনার শক্তি। আপনার কনটেন্ট হোক সম্মান, মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন।

18/07/2025

ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আজ কার্যত একা। রাষ্ট্রের কোনও গুরুত্বপূর্ণ অর্গান এই সরকারকে সহায়তা করছে না—না পুলিশ, না প্রশাসন, না গোয়েন্দা বাহিনী। এরা কেউই চায় না রাষ্ট্র সংস্কার হোক।

কারণ রাষ্ট্র সংস্কার হলে তাদের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের পথ চিরতরে বন্ধ হবে। রাষ্ট্র সংস্কার হলে সেইসব আমলা-পুলিশ-গোয়েন্দা কর্মকর্তা, যারা গত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট শাসনের ছায়ায় দুর্নীতি আর দমন-পীড়নের রাজত্ব চালিয়েছে, তাদের জবাবদিহি ও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এই ভয়েই তারা সর্বাত্মক ভাবেই চাইছে পুরনো বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে।

গোপালগঞ্জে সংঘর্ষে চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ এই সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। প্রয়োজন ছিল কেবল আগাম প্রস্তুতি, গোয়েন্দা তথ্যের সঠিক ব্যবহার এবং দায়িত্বশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু তা হয়নি। কারণ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে উদাসীন থেকেছে। স্পষ্টত তারা চাইছে এই সরকার যেন ব্যর্থ হয়। দেশে যেন অস্থিরতা থাকে। যাতে পরে আরেকটি গতানুগতিক ‘নির্বাচন’-এর নাটক সাজিয়ে ফ্যাসিবাদেরই নতুন সংস্করণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।

আসলে এই সরকার এখন একপ্রকার রুটিন সরকার হয়ে গেছে। কোনও সংস্থা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশ, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র—সবখানে আগের সরকার আমলে নিয়োগ পাওয়া, সুবিধা পাওয়া, অনুগতদের ছড়াছড়ি। এমনকি দলীয় ম্যান্ডেটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিও আছেন বহাল। এক কথায় পুরো আওয়ামীতন্ত্র এখনও বহাল তবিয়তে টিকে আছে।

ফলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা: সরকার নতুন, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরনো। যাকে বলা যায় “দ্য গভর্নমেন্ট উইথআউট দ্য স্টেট”—সরকার আছে, কিন্তু রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণে নেই। এখন প্রশ্ন একটাই এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র সংস্কার কি সম্ভব ?

রাষ্ট্রকে শুধুই প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে চেনা যায় না। এর পেছনে কাজ করে এক অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়—যাকে আমরা বলি “ডিপ স্টেট”। এরা চায় না জনগণের হাতে ক্ষমতা যাক, চায় না রাষ্ট্র কাঠামো বদলাক। তারা চায় স্থিতাবস্থা—যে ব্যবস্থায় ক্ষমতা থাকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর হাতে।

এই চক্র ভেঙে ফেলা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্পষ্টতা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং সর্বোপরি—জনগণের সচেতন, সংগঠিত অংশগ্রহণ।

এই সরকার যদি সত্যিই রাষ্ট্র সংস্কার করতে চায়, তবে তার জন্য দরকার—
১.রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দেয়া;
২.প্রশাসনিক অসহযোগিতাকে কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করা;
৩.একটি স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন রোডম্যাপ ঘোষণা করা;
৪.বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত গ্রহণ ও খোলামেলা সংলাপ করা। এবং
৫. রাষ্ট্রের অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর মুখোশ উন্মোচন করে সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

অন্যথায়, এই সরকার ফ্যাসিবাদের শিকড় অক্ষত রেখে শুধুই একটা মুখপাত্র হয়ে থাকবে—যার পেছনে কুশীলব অন্য কেউ।

জেন গল্প-২: নদী পার হওয়ার গল্প - মুনতাসির রাসেল এর বাংলা ব্লগ । bangla blog | সামহোয়্যার ইন ব্লগ - বাঁধ ভা 22/06/2025

জেন গল্প-২
নদী পার হওয়ার গল্প

দুই জেন সন্ন্যাসী, তানজান ও একিডো, একসঙ্গে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাচ্ছিলেন। পথে একটি পাহাড়ি নদী পড়ল, যেখানে স্রোত বেশ প্রবল ছিল। নদীর ধারে এক তরুণী দাঁড়িয়ে ছিল, সে একা পার হতে পারছিল না।

তরুণীটি বলল,
“আপনারা কি আমাকে নদীটা পার হতে সাহায্য করবেন?”

প্রথম সন্ন্যাসী একিডো চুপচাপ মুখ ফিরিয়ে নিলেন, সন্ন্যাস ব্রত ভেঙে যাবে বলে।

কিন্তু দ্বিতীয় সন্ন্যাসী, তানজান, বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মেয়েটিকে কাঁধে তুলে নিলেন এবং সতর্কভাবে নদী পার হয়ে তাকে অন্য পারে নামিয়ে দিলেন। তারপর দুই সন্ন্যাসী আবার পথ চলতে লাগলেন।

ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর, প্রথম সন্ন্যাসী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বললেন,
“তুমি তো একজন নারীকে ছুঁয়েছিলে! আমরা তো তা করতে পারি না।”

তানজান হেসে বললেন,
“আমি মেয়েটিকে অনেক আগেই নদীর পাড়ে নামিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তুমি এখনো তাকে বহন করে চলেছো—তোমার মনে।”

শিক্ষা: জীবনে কত কিছু ঘটে যায়—কিন্তু সেগুলো ধরে রাখলে এগোনো যায় না।
আসল মুক্তি আসে তখনই, যখন আমরা মনের ভার নামিয়ে রাখি।

(মূলগল্প: Zen Flesh, Zen Bones: A Collection of Zen and Pre-Zen Writings, সম্পাদনা: Paul Reps ও Nyogen Senzaki, বাংলা ভাষান্তরঃ মুনতাসির রাসেল )

জেন গল্প-২: নদী পার হওয়ার গল্প - মুনতাসির রাসেল এর বাংলা ব্লগ । bangla blog | সামহোয়্যার ইন ব্লগ - বাঁধ ভা দুই জেন সন্ন্যাসী, তানজান ও একিডো, একসঙ্গে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাচ্ছিলেন। পথে একটি পাহাড়ি নদী পড়ল, যেখানে স.....

31/05/2025

অনলাইনে বিস্তারিত পড়তে👇
https://www.prothomalo.com/opinion/column/ihr06upwoc

যে আয়না আর প্রতিচ্ছবি রাখে না - মুনতাসির রাসেল 27/05/2025

আমাদের ভালোবাসা ছিল এক গোপন সন্ধ্যার মতো— জোনাকিরা তখন শব্দহীন কবিতা হয়ে বসত সিঁথির পাশে, হাত ধরলেই হৃদয় জেগে উঠত, বুকের ভেতর গুনগুন করত অনন্ত প্রতিশ্রুতির গান। তুমি তখন আমার দেহে নয়—আমার সত্তার স্পর্শে থেকেছিলে।

সেই ভালোবাসাকে একদিন আমরা ‘অতিরিক্ত’ ভাবলাম, তাকে সময় দিতে গিয়ে মনে হলো, নিজের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছি; তোমার অশ্রু তখন আমার কাছে কৌশলের কুহেলিকা, আর তোমার চুপ করে থাকা, এক নির্মম ষড়যন্ত্র!

হঠাৎ করে, না—আস্তে আস্তে, ভালোবাসার জায়গায় এলো হিসাব— কে কতো ভালোবাসল, কে কতো অবহেলা করল, কে ভুল করল, কে আগে ক্ষমা চাইল! ভালোবাসা তখন অঙ্কের খাতায় পরিণত হলো, যেখানে হৃদয়ের তাপমাত্রা মাপা হলো ‘প্রমাণ’ দিয়ে।

সমঝোতার ভাষা হারিয়ে গেল। বাক্যগুলো হলো দাগা, তীর, ক্ষতবিক্ষত তর্ক। তুমি বললে—‘তোমার মতো আমি নিজেকে বিসর্জন দিতে পারি না’, আমি বললাম—‘তুমি কেবল নিজের কথাই ভাবো’। আমরা তখন একে অপরের আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেদের দোষ দেখতাম।

স্বার্থ এসে দাঁড়াল আমাদের মধ্যখানে, যেন নীরব এক দৈত্য, চোখে সিংহের অহংকার, সে কাড়ল আমাদের ক্লান্ত বিকেল, সে গ্রাস করল গভীর রাতের দীর্ঘ আলাপ। তুমি তখন তোমার ফোনে, আমি তখন আমার নীরবতায়।

বিশ্বাস? সে তো নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল, একটা বিদায়বেলার শব্দও রেখে যায়নি দরজার কাছে। আমরা ব্যস্ত ছিলাম অভিযোগের অঙ্ক কষতে— কে কতোটা ব্যথা দিয়েছে, কে বেশি ভুল করেছে; সে ফাঁকে বিশ্বাস গলে গিয়েছিল আমাদের মাঝখানের শূন্যে।

তারপর এলো অসম্মান— তুমি আমার কথার ওজন বুঝলে না, আমি তোমার কথাকে ব্যাখ্যা করলাম অবজ্ঞা হিসেবে। ভালোবাসার জায়গায় জমে উঠল অহমিকার পাথর, যেখানে তোমার হাসি হয়ে উঠল দায়, আমার নীরবতা একধরনের প্রতিশোধ।

অযত্ন এসে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হলো— তুমি ভুলে গেলে আমার চোখে কালি জমেছে, আমি জানতে চাইলাম না, তুমি সারাদিন কিছু খেয়েছো কিনা। স্নিগ্ধ স্পর্শের বদলে এলো কাঁটাযুক্ত শব্দ, ভালোবাসার খোঁজে হাঁটতে গিয়ে আমরা হাঁপিয়ে উঠলাম অবহেলায়।

তবু, সম্পর্কটা থেকে গেল অবহেলায়— জমে থাকা ধুলোয় ঢাকা আয়নার মতো, যার প্রতিচ্ছবি একসময় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, তবু কেউ সেটি মুছে ফেলার সাহস করে না।

আমরা আছি, একসাথেই আছি, শুধু ভালোবেসে নেই কাছাকাছি। ভেতরটা শূন্যতার হাহাকার, বাইরে আলো-আঁধারির দোলাচল। আমাদের দুটি শরীর যেন দুইটি দ্বীপ, মাঝখানে অতল এক নদী— যার নাম অনুশোচনা।

কবিতা : যে আয়না আর প্রতিচ্ছবি রাখে না
- মুনতাসির রাসেল

যে আয়না আর প্রতিচ্ছবি রাখে না - মুনতাসির রাসেল বাংলা-কবিতা ডটকমে প্রকাশিত মুনতাসির রাসেল-এর কবিতা - যে আয়না আর প্রতিচ্ছবি রাখে না।

ফেকাহ নয়, ফতোয়ার ফাঁদে আবদ্ধ এক জাতির বিলাপ - মুনতাসির রাসেল এর বাংলা ব্লগ । bangla blog | সামহোয়্যার ই 25/05/2025

“বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে,
আমরা তখনও বসে
বিবি-তালাকের ফতোয়া খুঁজছি
ফেকা ও হাদিস চষে!”
— কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলামের এই পঙ্‌ক্তি যেন আজকের মুসলিম সমাজের আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসমালোচনার দর্পণ। একসময় যে জাতি ছিল বিশ্বের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতার পথপ্রদর্শক—আজ সেই জাতিই বিশ্বদরবারে পিছিয়ে পড়েছে প্রযুক্তি, গবেষণা ও চিন্তাশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রে। আমরা হারিয়ে ফেলেছি সেই আত্মবিশ্বাস, উদ্যম ও প্রজ্ঞা, যা আমাদের পূর্বসূরিদের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছিল।

☞যে সময় আমরা নেতৃত্বে ছিলাম:
ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, মুসলিম সভ্যতাই একদিন ছিল মানবজাতির অগ্রগতির আলোকবর্তিকা। আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, ইবনে রুশদদের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল আধুনিক অঙ্কশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দর্শনের ভিত্তি। বাগদাদের ‘হাউস অব উইজডম’ ছিল জ্ঞানচর্চার তীর্থস্থান। কায়রো, কর্ডোভা, নিশাপুর, সামারকন্দ হয়ে উঠেছিল বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু আজ?

☞ধর্মীয় গোড়ামি ও অন্তহীন বিতর্কে বন্দি উম্মাহ:
বর্তমান মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ ব্যস্ত আছে ফতোয়াবাজি, হিজাবের দৈর্ঘ্য, দাড়ির পরিমাণ বা কোন দোয়া কখন পড়লে ‘সওয়াব’ বেশি—এসব বিষয় নিয়ে বিতর্কে। অথচ এই সমাজই প্রায় অনুপস্থিত বিশ্ব গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন বা মৌলিক চিন্তাচর্চার জগতে।
ধর্মচর্চা যে কখন ধর্মান্ধতায় রূপ নিয়েছে, তা বুঝে ওঠার আগেই আমরা এক অন্ধ সুড়ঙ্গে ঢুকে গিয়েছি, যেখানে প্রশ্ন নিষিদ্ধ, অনুসন্ধান গোনাহ্, আর ব্যতিক্রম চিন্তা 'কাফেরি'।

☞ফতোয়া বনাম ফিকহ: দৃষ্টিভঙ্গির সংকট:
ইসলাম চেয়েছিল মুক্ত বুদ্ধির বিকাশ, চেয়েছিল মানবিকতা ও ন্যায়বোধের প্রতিষ্ঠা। ‘ফিকহ’ মানে ছিল প্রজ্ঞাবান সিদ্ধান্ত, প্রাসঙ্গিক চেতনা। কিন্তু আজ তা রূপ নিয়েছে স্থবির ফতোয়ার কারখানায়, যেখানে যুক্তির বদলে চলে অনুকরণ, আর করুণার বদলে ঘৃণা। একদল নিজেদের 'শুদ্ধ মুসলিম' প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যদের কাফের ঘোষণা করছে। বিভেদই যেন একমাত্র ধর্মচর্চার ভাষা হয়ে উঠেছে।

☞প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানচর্চায় শূন্যের কোঠায় মুসলিম বিশ্ব:
বিশ্ব আজ এগিয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জিনতত্ত্ব, মহাকাশ গবেষণা আর ন্যানোপ্রযুক্তির দিকে। অথচ এই যাত্রায় মুসলিমদের অবদান আশঙ্কাজনকভাবে শূন্যপ্রায়। আর যে সব উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করি, সেগুলোর মালিক ও নিয়ন্ত্রক ইহুদি, খ্রিস্টান ও নাস্তিকদেরই প্রভুত্বে।

☞সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হলো—মুসলিমরা যখন কোনো জাতির বিরুদ্ধে পণ্য বর্জনের ডাক দেয়, তখন সেই ডাক আসে ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মে—যেগুলোর উৎপত্তি ও নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই যাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ!
এই আত্মবিরোধিতা আমাদের দৈন্যই প্রকাশ করে, আর কিছু নয়।

☞পথ কী তাহলে?
পথ একটাই—আত্মসচেতনতা, শিক্ষা ও চিন্তার নবজাগরণ।
মুসলিম উম্মাহকে ফিরে যেতে হবে তার প্রকৃত ঐতিহ্যে, যেখানে মুক্ত বুদ্ধি, প্রগতিশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবিক মূল্যবোধ ছিল ইসলামের মুখ্য চেতনা। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষার মর্মার্থ ছিল জ্ঞানচর্চা, ন্যায়বিচার ও দয়ার ঐক্যবদ্ধ রূপ—not blind conformity.

আজকের মুসলিম সমাজ যদি সত্যিকার পরিবর্তন চায়, তাহলে ফতোয়ার গহ্বরে আটকে না থেকে প্রশ্ন করতে শিখতে হবে, নতুন করে ভাবতে হবে, এবং বৈজ্ঞানিক ও মানবিক চর্চায় নিজেকে জড়াতে হবে। নইলে ইতিহাসের পাতায় আমরা রয়ে যাব এক পতিত জাতি হিসেবে, যারা একসময় শিখরে ছিল, কিন্তু পরে নিজেদের সংকীর্ণতায় ডুবে গিয়েছিল।

“আমি মুসলমান, আমি হিন্দু –
তাই নিয়ে রই কহাকাহি,
দুনিয়া আজ দিগ্বিদিক ধাইছে,
আমি বসে আছি তাহি!”
— কাজী নজরুল ইসলাম

আজ যদি আমরা না জাগি, তাহলে কাল আর ইতিহাসও আমাদের নাম উচ্চারণ করবে না।

শুভ জন্মবার্ষিক হে বিশ্ব মানবতার কবি!

"যেখানে প্রশ্ন নিষিদ্ধ, সেখানেই পতনের শুরু"
— মুনতাসির রাসেল

ফেকাহ নয়, ফতোয়ার ফাঁদে আবদ্ধ এক জাতির বিলাপ - মুনতাসির রাসেল এর বাংলা ব্লগ । bangla blog | সামহোয়্যার ই “বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে বিবি-তালাকের ফতোয়া খুঁজছি ফেকা ও হাদিস চষে!” — কাজী নজরুল ইসলামকাজী নজরুল ইস.....

14/05/2025

অনলাইনে পড়তে 👇
https://daily-destiny.com/?p=73436

11/05/2025

বিচার, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক দ্বৈতনীতি:
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের চোখে বর্তমান বাস্তবতা
—মুনতাসির রাসেল



বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এক গভীর সংকট ও দ্বান্দ্বিকতার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। একদিকে, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা একনায়কতান্ত্রিক দমননীতির ফলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে—বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে নিরাপত্তা কাঠামো পর্যন্ত দলীয়করণের করালগ্রাসে আবদ্ধ। অন্যদিকে, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত হলেও কার্যত এই সরকার একটি ছায়া-সরকার মাত্র, যার কাঁধে রয়েছে পূর্বতন শাসনতন্ত্রের নানা অসংগতির কাটিয়ে ওঠার দায় ।

এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধকরণ বা বিচারের আওতায় আনার দাবি যখন ওঠে, তখন তা নানা রাজনৈতিক শক্তির ভিন্নতর অবস্থান ও কৌশলগত বিভ্রান্তির কারণে জটিলতর হয়ে ওঠে। এই জটিলতাকে ছেদ করে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের ভূমিকা হলো একটি সুসংহত, ন্যায়ভিত্তিক, সাংবিধানিক এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা—যা কেবল একটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ নয়, বরং গোটা “আওয়ামীতন্ত্র, জুলুমতন্ত্র, লুটপাটতন্ত্র, পাচারতন্ত্র” নামক শাসনতান্ত্রিক বিকৃতির অবসান চায়।

বিএনপি: ন্যায়ের ভাষায় কৌশলের দোদুল্যমানতা:

বিএনপি বারবার আওয়ামী লীগের ‘বিচার’ চাইলেও, বাস্তবে তারা বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে সেই দলের অস্তিত্বকেও একধরনের বৈধতা দেয়। তারা দলটির নিবন্ধন বাতিল বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট দাবি তোলে না। এমনকি দেখা যায়, তারা একইসাথে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিজেদের দলে টানতেও আগ্রহী। এটি একধরনের আদর্শহীন কৌশলগত দ্বৈতনীতি, যা জনগণের কাছে তাদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে তোলে।

জামায়াত ইসলামি: বিচার নয়, নিষিদ্ধের সুবিধাবাদ:

জামায়াত, যা ২০১৩ সালের পর কার্যত নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ, তারা এখন চায় আওয়ামী লীগকেও একইভাবে নিষিদ্ধ করা হোক—কিন্তু তারা ন্যায়ের শর্তে বিচার দাবি করে না। কারণ তারা জানে, আওয়ামী লীগের ২০২৪ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চাইতে গেলে তাদের নিজেদের ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের দায়ও নতুন করে সামনে চলে আসবে। তাই তারা রাজনৈতিক প্রতিশোধের মোড়কে নিষিদ্ধকরণ চায়, বিচার নয়—যা একধরনের মুখোশধারী সুবিধাবাদ ছাড়া কিছুই নয়।

এনসিপি: ক্রমবিন্যাসহীন আবেগ ও কৌশলগত বিশৃঙ্খলা:

জাতীয় কাঠামোর বাইরের নতুন উদীয়মান শক্তি হিসেবে এনসিপি যেভাবে একদিকে আওয়ামী লীগের অবিলম্বে নিষিদ্ধকরণ দাবি করছে, এবং অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার কথাও বলছে—তা রাজনৈতিক কৌশলে এক ধরনের অনৈক্য ও অপরিণামদর্শী দৃষ্টান্ত। কারণ নিষিদ্ধকরণ কখনোই বিচারের পূর্বশর্ত নয়; বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিষিদ্ধকরণ সাংবিধানিক ভিত্তি পায়। এই ক্রমবিন্যাসহীন দাবিতে এনসিপি তার নীতিগত প্রজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের অবস্থান: কৌশল নয়, কাঠামোগত ন্যায়বিচার:

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মনে করে, একক কোনো দল নয়—পুরো শাসনব্যবস্থাই আজ একধরনের আওয়ামীতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো—ক্ষমতার দখলদারিত্ব, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক লুটপাট, গুম-খুন-নিপীড়নের সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের পরিকল্পিত পাচার। এই “জুলুমতন্ত্র, লুটপাটতন্ত্র ও পাচারতন্ত্র” কেবল আওয়ামী লীগের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং, কেবল দল নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না—সমাধান চাই শাসনতন্ত্রের আমূল সংস্কার।

রাষ্ট্র সংস্কার আনদোলনের দাবি:
◑অবিলম্বে স্বাধীন ও সর্বজনগ্রাহ্য বিচারিক কমিশন গঠন করে ২০০৮–২০২৪ সালের মধ্যে সংঘটিত সব ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হোক;
◑আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্মুক্ত বিচার হোক—যাতে দলীয় নয়, ব্যক্তিভিত্তিক দায় নির্ধারণ সম্ভব হয়;
◑বিচারের পরেই সংবিধানের ৭২, ৯৫ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নিষিদ্ধকরণসহ অন্যান্য সাংবিধানিক ব্যবস্থা কার্যকর হোক।

◑রাষ্ট্রীয় নির্বাহী আদেশে দল নিষিদ্ধ করা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকে না। পাকিস্তানে মোশাররফ, মিশরে মুরসি, তিউনিসিয়ায় বেন আলি বা তুরস্কে এরদোয়ানের উদাহরণ প্রমাণ করে—বিচারহীন নিষিদ্ধকরণ কখনোই টেকসই হয় না।

বাংলাদেশকে যদি সত্যিকারের গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে তার একমাত্র পথ হলো—বিচার, দায় নির্ধারণ ও সাংবিধানিক সংস্কার। দল নিষিদ্ধ হলেও অপরাধীরা দণ্ডিত না হলে, তারা অন্য দলে গিয়ে একই রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালিয়ে যেতে পারে। শিকড় উপড়ে না ফেললে কেবল শাখা কেটে লাভ নেই।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন সেই শিকড় উপড়াতে চায়—যা একনায়কতন্ত্রের নাম বদলে বারবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। সুতরাং, তারা চায় কেবল আওয়ামী লীগ নয়, বরং “আওয়ামীতন্ত্র”—অর্থাৎ লুটপাট, দমন, দখল ও গুম-খুন নির্ভর শাসনব্যবস্থা চিরতরে বিতাড়িত হোক।

আর এই পথেই কেবল বাংলাদেশ মুক্ত হতে পারে বিভ্রান্তিকর রাজনীতি, কৃত্রিম বিরোধিতা ও ক্ষমতার কুশীলবদের হাত থেকে।

daily-destiny.com

07/05/2025

আমি এক অনুপস্থিত মানুষ,
যার উপস্থিতি কেউ টের পায়নি,
যার কণ্ঠস্বর বাতাসের কাছে
এক অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি মাত্র।

৮ই মে,২০২৫

নারী কমিশন বিতর্ক: সংস্কারের ভাষ্যে প্রান্তিকতার অনুপস্থিতি ও বিশ্বাসের সংঘাত 06/05/2025

পড়তে পারেন।

নারী কমিশন বিতর্ক: সংস্কারের ভাষ্যে প্রান্তিকতার অনুপস্থিতি ও বিশ্বাসের সংঘাত মুনতাসির রাসেল: বাংলাদেশে নারী-অধিকার প্রশ্নে বিতর্ক নতুন নয়, তবে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক প্রস্ত....

Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Address

Chilmari
Dhaka